প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৩ ২৩:১০ পিএম
রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা মানবতার সেবায় যা করে তা হৃদয় থেকে আসে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চট্টগ্রাম জেলা ইউনিটের নির্বাহী সদস্য ফখরুল ইসলাম চৌধুরী পরাগ।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের পরিবেশগত কারণে এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন দুর্যোগে মানবিক সাহায্যের অন্যতম নিদর্শন হল রেডক্রস রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন। যে কোনো দুর্যোগে মানুষের এখন প্রধান আস্থা হচ্ছে রেড ক্রিসেন্ট। আর যুব রেড ক্রিসেন্ট চট্টগ্রামের যুব সদস্যদের ত্যাগ ও সেবার মনোভাবের কারণে এ সংগঠনটির কার্যক্রম দেশে ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে অধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত হচ্ছে।
রবিবার (৮ মে) বিশ্ব রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট দিবস উপলক্ষে এক নিবন্ধে তিনি এ কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা জীন হেনরী ডুনান্টের জন্মদিন স্মরণে প্রতিবছর ৮ মে বিশ্বব্যাপী আর্তমানবতার সহায়তার মর্মবাণী ছড়িয়ে দিতে দিবসটি পালিত হয়।
নিবন্ধে ফখরুল ইসলাম চৌধুরী পরাগ বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যুগে যুগে অনেক জ্ঞানীগুণী সমাজসেবক ও মহৎপ্রাণ মানুষ জন্মগ্রহণ করেছেন। মহাত্মা জীন হেনরী ডুনান্ট সেই সব শ্রেষ্ঠ মানব সন্তানের একজন। রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। জন্ম হয়েছিল ১৮২৮ সালের ৮ মে।
১৯১০ সালে তার মৃত্যুর পর থেকে সারা বিশ্ব ৮ মে তার জন্মদিনকে সম্মান দেখিয়ে ‘বিশ্ব রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
জীন হেনরী ছিলেন একজন সমাজসেবক, মানব হিতৈষী ও শ্রেষ্ঠ মানব। সেই জন্যই তিনি শান্তিতে প্রথম নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে কোটি কোটি মানুষ বিপন্ন মানবতার সেবায় নিয়োজিত।
তিনি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষকে এক পতাকাতলে একই কর্মসূচিতে একত্রিত করেছিলেন। সাম্য মৈত্রির বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন মানব সন্তানদের। সেই সংগঠনের নাম রেড ক্রিসেন্ট।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ ১৫টি বিদ্যালয় নিয়ে জুনিয়র রেড ক্রস কার্যক্রম শুরু হয়। পরে মহাবিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ১৯৭৮ সনে যুব রেড ক্রস শাখা গঠন করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে শিক্ষায়তন বহির্ভূত যুব রেড ক্রস দল গঠন করা হয়। যা বর্তমানে যুব রেড ক্রিসেন্ট নামে পরিচিত। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়সহ বাংলাদেশে যুব রেড ক্রিসেন্ট আওতাভুক্ত ১ হাজার ৫০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার। আগামীতে এর আরো প্রসার ঘটবে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসন্টে সোসাইটি
ব্রিটিশ ভারতের ভারতীয় রেড ক্রস সোসাইটি এ্যাক্ট, ১৯২০-এর অধীনে রেড ক্রস সোসাইটি গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার ফলে পাকিস্তানের ভৌগলিক এলাকায় পূর্বের আইনের সামান্য রদবদল করে পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটি গঠিত হয়। পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটির অধীনে পূর্ব পাকিস্তান রেড ক্রস ব্রাঞ্চ হিসেবে গঠিত হয়।
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পাকিস্তান রেড ক্রস সোসাইটির পূর্ব পাকিস্তান ব্রাঞ্চ বাংলাদেশের জাতীয় সোসাইটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি লাভের জন্য আবেদন করে। ৪ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের এক আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি গঠিত হয়। এরপর ৩১ মার্চ ১৯৭৩ সালে
বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি আদেশ, ১৯৭৩ (পিও-২৬ জারি করেন। এই আদেশের বলে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি স্বীকৃত লাভ করে এবং রেড ক্রস সোসাইটি এ্যাক্ট, ১৯২০ বাতিল বলে গণ্য করা হয়।
২০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের তেহরান সম্মেলনে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ৪ এপ্রিল ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রপতি আদেশের সংশোধনী বলে বাংলাদেশ রেড ক্রস সোসাইটির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি করা হয়। সেই সাথে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট প্রতীকের ব্যবহার শুরু হয়।
বাংলাদেশের প্রতিটি প্রশাসনিক জেলায় ৬৪টি ও ৪টি সিটি করপোরেশনে ৪টি সর্বমোট ৬৮টি ইউনিট রয়েছে; যার মাধ্যমে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দেশব্যাপী নানাবিধ জনসেবা ও কল্যাণ মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
মানবতার কল্যণে বাংলাদেশে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি স্বাভাবিক সময়ে ও প্রতিটি দুর্যোগে ৬৮টি ইউনিটের স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বিপন্ন মানবতার কল্যাণে গণমানুষের সেবায় সর্বদা নিয়োজিত।
সাতটি মূলনীতি নিয়ে রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট কাজ করে। মূলনীতিগুলো হল- মানবতা, পক্ষপাতহীনতা, নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছামূলক সেবা, একতা, সার্বজনীনতা। স্কুল কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র ছাত্রী বা যুব শ্রেণির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সোসাইটির যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সোসাইটির অধিকাংশ কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রশিক্ষিত যুব স্বেচ্ছাসেবকগণই প্রতিটি দুর্যোগে গণমানুষের সেবায় আস্তরিক ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে।
বাংলাদেশে যুব রেড ক্রিসেন্টের ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জুনিয়র রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৩টি বিদ্যালয়কে প্রাথমিকভাবে জুনিয়র রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে কলেজ পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম শুরু করা হয়।
প্রথম অবস্থায় ২০টি কলেজকে যুব রেড ক্রিসেন্টর আওতায় আনা হয়। পরে এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৮৩ সালে নামের জটিলতা পরিহার করার উদ্দেশ্যে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে নামের সামঞ্জস্য রাখার লক্ষে রেড ক্রিসেন্ট-এর যুব সংগঠনের নাম রাখা হয় যুব রেড ক্রিসেন্ট। জুনিয়র ও যুব রেড ক্রিসেন্ট একত্রিত বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের সকল সদস্যদের সমন্বয়ে এই নাম রাখা হয়।
যুব রেড ক্রিসেন্ট-এর লক্ষ, উদ্দেশ্য, মূলমন্ত্র আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ‘কাজের মাধ্যমে শিক্ষা’ এটাই মূলত যুব রেড ক্রিসেন্ট-এর লক্ষ্য।
১৯৭৫ সালে বেলগ্রেডে রেড ক্রস সন্মেলনে সকলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক যুব রেড ক্রস/ যুব রেড ক্রিসেন্ট-এর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় ৪টি। সেগুলো হল- জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষা, সেবা ও সংহতি, আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব, সমঝোতা ও শান্তির অন্বেষনে শিক্ষা এবং রেড ক্রস/রেড ক্রিসেন্ট মূলনীতি ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিস্তার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐকানতিক প্রচেষ্টায় মহামন্য রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০১০ সালে সরকার যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রমকে সহশিক্ষা হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে সারা দেশে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুব কার্যক্রম চালু রয়েছে এবং এর সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে যুব রেড ক্রিসেন্ট নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিডিআরসিএসের সমন্বয় ও সহযোগিতার মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যুবদের; বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের রেড ক্রিসেন্টের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিডিআরসিএসের ব্রাঞ্চগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করে; একইসঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়ে থাকে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যথাযথ কাঠামো ও নির্দেশিকা মেনে যুব রেড ক্রিসেন্ট কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
ডিজিটার বাংলাদেশ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আজকের যুব সমাজ। যুবকদের মাঝে রয়েছে তারুণ্যের যে উদ্দীপনা, সেটিকে যথাযথ কাজে লাগিয়ে গড়তে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ডিজিটার বাংলাদেশ। সেটির অন্যতম মাধ্যম হতে পারে রেড ক্রিসেন্ট আন্দোলন।