রাজশাহী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:০৯ পিএম
আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৩ ১৬:৩৯ পিএম
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রবা ফটো
নওগাঁ সদরের বলিহারী
ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মামুন হোসেনের ছোট ভাই সাজু সরদার আত্মীয়দের মধ্যে মারামারির ঘটনায় মাথায় গুরুতর আঘাত পান। গত ২ জানুয়ারি তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে
ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসক সাজুকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) পাঠান।
আইসিইউতে চিকিৎসাধীন
অবস্থায় শনিবার (৭ জানুয়ারি) মারা যান সাজু। ভাইয়ের মরদেহ হাসপাতাল থেকে বের করতে কয়েকপর্যায়ে ১০ হাজার টাকার বেশি ঘুষ দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এই ছাত্রলীগ নেতা।
তার কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার তালিকায় রয়েছে হাসপাতালের ডোম ও পুলিশ সদস্যদেরও নাম। মামুনের অভিযোগ,
পুলিশ ও ডোম রীতিমতো লাশ জিম্মি রেখে টাকা আদায় করেছে।
মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি)
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনার পর আমার নিজেকে ছাত্রলীগ পরিচয় দিতেই
লজ্জা লাগছে। কেমন দেশে আমরা বাস করি। পরিচিত পুলিশ, আনসারসহ দলীয় পদ থাকায় আমার কাছ
থেকে তাও কম টাকা নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে আমার চাচার কাছ থেকেও উপরি (ঘুষ) আদায় করা
হয়েছে।’
শুধু মামুন নয়। অভিযোগ
উঠেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত চাঁপাইনবাবগঞ্জের শহীদুল ইসলামের মরদেহ বুঝে নিতে তার ভাই
জহিরুল ইসলামকে ১ জানুয়ারি পুলিশকে টাকা দিতে হয়েছে। বাঘা উপজেলার মো. আলীর মরদেহ ৬ জানুয়ারি বুঝে নিতে তার ভ্যানচালক ভাই শাহজাহানকেও গুনতে হয়েছে টাকা। হাসপাতালে
ভর্তির পর ছাড়পত্র নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হওয়া পর্যন্ত পদে পদে এভাবেই বড় অঙ্কের টাকা
ঘুষ দিতে হচ্ছে মৃতের স্বজনদের।
রামেক হাসপাতালের একটি
সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত গত নয় দিনে মোট ২৬টি
অপমৃত্যুর ঘটনা রয়েছে, যা পুলিশ কেসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অপমৃত্যুর কারণের মধ্যে রয়েছে
সড়ক দুর্ঘটনা, বিষক্রিয়া, গলায় দড়ি, ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুসহ মারপিটের ঘটনায় মৃত্যু।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,
রামেক হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করতে, ছাড়পত্র নিতে, সিরিয়াল দিতে ও অ্যাম্বুলেন্সে করে
মরদেহ নিয়ে যেতে পদে পদে হয়রানি ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে মৃতের পরিবারকে। মরদেহ ও মামলার
ধরনের ওপর এই অর্থের পরিমাণও কমে বা বাড়ে। মরদেহ জিম্মি করে ঘুষ আদায় করছেন রাজপাড়া
থানার কনস্টেবল প্রবীর কুমার, রাইটার পারভেজ এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশ কাটার কাজে নিয়োজিত
ডোম তরুণ, রনি ও তাদের চাচা দীপন।
রোগীর স্বজনদের অভিযোগ,
হাসপাতাল এলাকায় অবস্থিত অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটও রোগী বা মরদেহ বহনে অতিরিক্ত ভাড়া
নেয়। এমনকি তারা বাইরের কোনো অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বা মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে
দেয় না। কেউ চেষ্টা করলে সংঘবদ্ধ হয়ে এসে তার ওপর হামলা চালায়।
মৃত সাজুর ভাই ছাত্রলীগ
নেতা মামুন বলেন, ‘সাজুর মৃত্যুর পর রবিবার সকালে লাশের ছাড়পত্রের
জন্য হাসপাতালের পূর্বে অবস্থিত পোস্ট অফিসের সামনে পুলিশের রাইটারের কাছে যাই। তখন
প্রবীর নামের এক পুলিশ সদস্য রাইটারকে দিতে হবে বলে এক হাজার টাকা নেন। এ সময় তিনি নিজের
জন্যও টাকা দাবি করেন। এরপর মরদেহ আইসিইউ থেকে লাশঘরে ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যেতে নেওয়া
হয় ৪০০ টাকা। ময়নাতদন্ত করতে ডোমেরা নেয় ছয় হাজার টাকা। পরে আবারও আরেকজন ডোম টাকা
দাবি করে। ওই টাকা দেন আমার চাচা।’
তিনি বলেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স আমি নিয়ে আসি। তবে সেখানে লাশ উঠাতে দেয়নি ওখানকার
অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট। তাদের দাবি, সিন্ডিকেটের অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ নিয়ে যেতে হবে। পরে তাদের আমার পরিচয় ও কিছু অর্থ দিয়ে আমার ভাড়া করা অ্যাম্বুলেন্সে করেই লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরি।’
মামুন আরও বলেন, ‘আমি পদে পদে আমার দলীয় পরিচয়, নওগাঁ থানার এক পুলিশ কর্মকর্তার উদ্বৃতি
এবং রামেক হাসপাতালের কয়েকজন আনসার সদস্যকে আমার কাছের লোক হিসেবে পরিচয় দেওয়ায় তারা
দাবির চাইতে কিছু কমিয়ে এই টাকাগুলো হাতিয়ে নিয়েছে। আমি বাধ্য হয়েছি তাদের টাকা দিতে।’
টাকা নেওয়ার বিষয়ে রাইটার
পারভেজকে জিজ্ঞেস করলে তিনি এ বিষয়ে কনস্টেবল প্রবীরের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পারভেজ জানান, তিনি
পুলিশের সদস্য নন। তবে কোনো থানার পুলিশ সদস্যরা ডাকলে তিনি পুলিশের হয়ে মামলা লেখালেখির
কাজ করেন। এর বিনিময়ে ওই পুলিশ সদস্যরা খুশি হয়ে যা দেন তাই তিনি নেন।
অভিযোগের বিষয়ে রাজপাড়া
থানার কনস্টেবল প্রবীর কুমার বলেন, ‘যারা এই অভিযোগ করছেন তারা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলছেন।
এসবের তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) থাকেন। তারা এগুলো দেখাশোনা করেন।’
সাংবাদিক পরিচয় আড়াল
করে রমেকের ফরেনসিক বিভাগে ময়নাতদন্তে সহযোগিতার কাজে নিয়োজিত ডোমদের সঙ্গে কথা হয়।
তারা জানান, ডোমদেরকে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। তারা বাধ্য হয়ে ময়নাতদন্তে আসা মৃতের
স্বজনদের থেকে টাকা নেন।
মৃতের স্বজনদের কাছ
থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা.
শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘লাশের পোস্টমর্টেম পরবর্তী বিষয়গুলো হাসপাতালের
এখতিয়ারের বাইরে। পোস্টমর্টেমের বিষয়টির তদারক করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক)
ফরেনসিক বিভাগ এবং পুলিশ প্রশাসন। বিভিন্ন কায়দায় লাশের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে
নেওয়া হচ্ছে। তবে বিষয়টি হাসপাতালের এখতিয়ারের বাইরে থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না।’
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের
অধ্যক্ষ নওশাদ আলী বলেন, ‘হাসপাতালে অপমৃত্যুর পর রাজপাড়া থানায় মামলা হয়।
এরপর থানা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আসেন। তার দায়িত্বে ময়নাতদন্ত করেন একজন ডাক্তার।
এরপর পুলিশ মৃতের আত্মীয়কে লাশ বুঝিয়ে দেয়।’
মৃতের আত্মীয়ের কাছ
থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ডোমদের
একটা চক্র আছে, তারা রোগীদের থেকে টাকা আদায় করে। এটা দুই-চার হাজার টাকা পর্যন্ত।
এ বিষয়ে আমরা অভিযোগ পেলেই পুলিশে খবর দিই। পুলিশ অনেকবার এদের ধরে নিয়ে গেছে। ডোমদের
সিন্ডিকেটের কাছে মৃতের আত্মীয়ের মতো আমরাও জিম্মি। এসব বিষয় নিয়ে থানা পুলিশ সবাই
অবগত। মাঝেমধ্যে মৃতের স্বজদের সাথে গণ্ডগোলও হয়।’
রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘পুলিশের টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। ময়নাতদন্তের জন্য
কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়া পর্যন্ত পুলিশের কাজ। এর পরের কাজ ফরেনসিক বিভাগের। একেক সময়
একেকজন ডাক্তার লাশের ময়নাতদন্তের দায়িত্ব পান। তাদেরকে ময়নাতদন্তে সহযোগিতা করে তাদেরই
ডোম। লাশ বুঝিয়ে দেওয়া, দেরি করার বিষয়গুলো আমাদের হাতে নেই। এটা সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট
ডাক্তারের কাজ। তারপরও যেহেতু পুলিশের নামও বলা হচ্ছে, সেহেতু বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
ডোমদের বেতন না পাওয়া প্রসঙ্গে রামেক অধ্যক্ষ নওশাদ আলী বলেন, ‘মেডিকেল কলেজের নিজস্ব কোনো ডোম পদ নেই। স্বাধীনতার আগে ডিসি অফিসে ২০ টাকা বেতনে দুজন ডোম কাজ করত। তাদের দিয়েই এখন পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে। এরপরে ডোম পদে আর কোনো নিয়োগ নেই। ওই দুই ডোম মারা যাওয়ার পর তাদের সন্তান ও ভাইদের দিয়েই কাজ চালানো হচ্ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অর্গানোগ্রামে বা জনবল কাঠামোতে ডোমের কোনো পদ নেই। গত আট বছর থেকে দাবি জানিয়ে লিখছি। আমাদের ফাইল মোটা হয়েছে। চারজন ডোম চেয়েছি আমরা। দুজন ছেলে ও দুজন মেয়ে ডোম। কারণ মেয়েদেরও পোস্টমর্টেম করতে হয়। এই পদগুলো সৃষ্টি করা গেলে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হবে।’