প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
হাসপাতালের বিছানায় লোউরি ডেনম্যান। ছবি: বিবিসি
ভারত সফরের তিন বছর পর হঠাৎ একদিন টয়লেটে প্রায় ১ মিটার লম্বা একটি ফিতাকৃমি দেখতে পান ব্রিটিশ নারী লোউরি ডেনম্যান। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি, তার মস্তিষ্কে বাসা বেঁধেছে ৩৮টি পরজীবী।
পরে তীব্র মাথাব্যথা, খিঁচুনি ও মানসিক ভারসাম্যহীনতার পর চিকিৎসকেরা শনাক্ত করেন বিরল রোগ নিউরোসিস্টিসারকোসিস। দীর্ঘ প্রায় এক দশকের কঠিন চিকিৎসা ও মানসিক সংগ্রাম শেষে সুস্থ হয়ে ওঠা লোউরি এখন এই রোগ সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে কাজ করছেন।
বিবিসিতে প্রকাশিত থমাস জার্মেইনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তার এই অবিশ্বাস্য জীবনসংগ্রামের গল্প। ওয়েলসের কারমার্থেনের বাসিন্দা ৪২ বছর বয়সী লোউরি ডেনম্যান ২০০৭ সালে তিন মাসের জন্য ভারত ভ্রমণে যান। খাদ্যে বিষক্রিয়া এড়াতে তিনি সফরের সময় মাংস না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে তার চিকিৎসক, সংক্রামক রোগ ও মাইক্রোবায়োলজি বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রেন্ডান হিলির ধারণা, অজান্তেই তিনি এমন কোনো খাবার খেয়েছিলেন, যাতে শূকরের ফিতাকৃমির অতি ক্ষুদ্র ডিম ছিল।
২০১০ সালে, একটি রেস্তোরাঁর টয়লেটে তিনি ফিতাকৃমিটি দেখতে পান এবং সেটি ফ্লাশ করে দেন। পরে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও মল পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক আসে। তখন তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ থাকায় বিষয়টি আর গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তার প্রচণ্ড মাথাব্যথা শুরু হয়। ২০১১ সালে প্রথমবারের মতো খিঁচুনি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করার পর চিকিৎসকেরা জানান, তার মস্তিষ্কে ৩৮টি পরজীবী রয়েছে।
প্রথমে চিকিৎসকেরা এটিকে টক্সোপ্লাজমোসিস বলে সন্দেহ করলেও আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হন, তিনি নিউরোসিস্টিসারকোসিসে আক্রান্ত। এটি শূকরের ফিতাকৃমির লার্ভা থেকে সৃষ্ট বিরল মস্তিষ্কের সংক্রমণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, কাঁচা বা অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা শূকরের মাংস, ফিতাকৃমির ডিমযুক্ত দূষিত পানি কিংবা অপরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যুক্তরাজ্যে রোগটি অত্যন্ত বিরল এবং সাধারণত যেসব অঞ্চল এ রোগপ্রবণ, সেখান থেকে আসা মানুষের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।
লোউরি জানান, চিকিৎসকের কাছ থেকে রোগের কথা শোনার পর তিনি বুঝতেই পারছিলেন না সামনে কী অপেক্ষা করছে। কোন ওষুধ খেতে হবে, কাজে ফিরতে পারবেন কি না- এসব প্রশ্ন তাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল।
দুই সপ্তাহ হাসপাতালে ভর্তি রেখে তাকে পরজীবীনাশক ওষুধ ও স্টেরয়েড দেওয়া হয়। শুরুতে চিকিৎসায় ভালো ফলও মেলে। পরবর্তী কয়েক বছর তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন। বোনের সঙ্গে নিউজিল্যান্ড ভ্রমণ করেন, ব্রিস্টলে বসবাস শুরু করেন, সার্কাস প্রশিক্ষণ নেন এবং হাফ ম্যারাথনেও অংশ নেন।
কিন্তু কিছুদিন পর কর্মস্থলেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরীক্ষায় দেখা যায়, মস্তিষ্কে থাকা পরজীবীগুলোর চারপাশে ব্যাপক ফোলাভাব তৈরি হয়েছে। এরপর শরীরের বিভিন্ন অংশ অবশ হয়ে আসা, ঝিনঝিন অনুভূতি এবং মানসিক বিভ্রান্তির মতো জটিলতা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তাকে চাকরি ছেড়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে হয়।
স্টেরয়েডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার শারীরিক চেহারায়ও পরিবর্তন আসে। একসময় তিনি গভীর বিষণ্নতা, তীব্র উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক এবং সাইকোসিসে আক্রান্ত হন। ছয় সপ্তাহ তাকে একটি নিউরোসাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
লোউরিকে দেখতে আসা ২০ বছরের বন্ধু নিকোলা ব্রাউন বলেন, “এক মাস পর তাকে দেখে তিনি চিনতেই পারেননি”।
নিকোলার ভাষায়, “সে যেন ছোট শিশুর মতো আচরণ করছিল। মেঝেতে হামাগুড়ি দিচ্ছিল, পর্দার আড়ালে লুকাচ্ছিল, আবার বাবার কোলে বসে পড়ছিল”।
পরে লোউরি তাকে একটি বার্তা পাঠিয়ে লেখেন, “আজ রাতে তুমি আমাকে সংবাদে দেখবে। পুলিশ আমার পিছু নিয়েছে”।
নিকোলা জানান, সেই সময় তার মনে হচ্ছিল, তারা হয়তো আর আগের লোউরিকে কখনো ফিরে পাবেন না। তবে দীর্ঘ সংগ্রামের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন লোউরি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর বাবার সঙ্গে থেকে তিনি একটি আর্ট ফাউন্ডেশন কোর্স সম্পন্ন করেন। পরে ২০১৮ সালে কার্ডিফে ফিরে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০২২ সালে আবার কর্মজীবনে ফেরেন।
চিকিৎসক ডা. ব্রেন্ডান হিলি জানান, তার পুরো কর্মজীবনে এ ধরনের রোগী আর দেখেননি। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞরাও লোউরির ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তার মতে, এ রোগ এতটাই বিরল যে অনেক সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞও সারাজীবনে এমন একটি ঘটনাও দেখবেন না।
বর্তমানে লোউরির মস্তিষ্কে থাকা পরজীবীগুলো ক্যালসিয়াম জমে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়নি। ২০১৭ সালের পর তার আর কোনো খিঁচুনি হয়নি। তবে সারাজীবন তাকে মৃগীরোগের ওষুধ খেতে হবে।
লোউরি বলেন, “আমি চাই, আমার এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা অন্তত মানুষের উপকারে আসুক। আমি এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে চাই”।
তিনি আরও বলেন, “জীবনে সামনে কী অপেক্ষা করছে, কেউ জানে না। আজ আমি বেঁচে আছি, সুস্থ আছি এবং আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছি এ জন্য আমি প্রতিদিন কৃতজ্ঞ”।