হাম মোকাবিলায় এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশব্যাপী জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ করে মাসব্যাপী টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার পাশাপাশি হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য সারা দেশের হাসপাতালগুলো বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার পরও কোনোভাবেই যেন কমছে না হামের প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায়ও (গত রবিবার থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে ও হামের উপসর্গে মারা যাওয়া ১৭ শিশুসহ গত তিন দিনে সারা দেশে ৪৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে গতকাল সোমবার পর্যন্ত ৭২ দিনে ৫৪৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে কর্মজীবী মানুষ ছুটছে গ্রামের বাড়ির পথে। আর ঈদ কেন্দ্র করে মানুষের ব্যাপক চলাচল হাম সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এখনই সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ না নিলে এবং শিশুদের নিয়ে হামের পরিস্থিতি আরও খারাপ এবং দীর্ঘায়িত হতে পারে।
হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকাতে দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় ৫ এপ্রিল থেকে হাম-রুবেলা টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। পরে ১২ এপ্রিল ৪টি সিটি করপোরেশন এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশের সকল জেলা-উপজেলায় একযোগে সর্বাত্মক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে এবং তা শেষ হয় ২০ মে। এখনও সারা দেশে বিশেষ টিকা কর্মসূচি চলমান রয়েছে। ঈদুল আজহার পর আবারও (দ্বিতীয় ধাপে) সারা দেশে টিকা ক্যাম্পেইন শুরু করা হবে। এর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে ভিটামিন 'এ' খাওয়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সোমবার কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, “দেশে হামের টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ১২২ শতাংশে পৌঁছেছে। এখন পর্যন্ত দুই কোটিরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে যে ১৮টি উপজেলায় টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা হয়েছিল, সেখানে হামের সংক্রমণের হার প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে”।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কারণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতেই প্রতিদিন হামে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।
স্বাস্থ্য অধিপ্তরের তথ্য মতে, সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় (রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে ও হামের উপসর্গে আরও ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাম উপসর্গে ১৬ শিশু এবং নিশ্চিত হামে ১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ৭২ দিনে সন্দেহজনক হামে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫৮ জনে এবং নিশ্চিত হামে মৃতের সংখ্যা ৮৭ জন।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে যে ১৬ শিশু মারা গেছে তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৬ জন, সিলেটের ৩ জন, রাজশাহীর ২ জন, চট্টগ্রামের ২ জন, বরিশালের ২ জন এবং ১ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা। আর নিশ্চিত হামে মারা যাওয়া শিশুটি ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামের রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ১২৭ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১ হাজার ২৭ জনকে। একই সময়ে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৯৭ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭২ দিনে সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৯৪০ জন। তাদের মধ্যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৫১ হাজার ৫৮৫ জনকে। আর একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৭১৯ জন। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া ১ হাজার ৪০৫ রোগীসহ এখন পর্যন্ত হামের চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ৪৭হাজার ৬১৯ জন রোগী।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ঈদের ছুটিতে যাতায়াতের কারণে দেশে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। এই যাতায়াতের ফলে ঈদের আনুমানিক ৭ থেকে ১০ দিনের মাথায় হামের প্রকোপ স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
“এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঈদের সময় শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ না করার জন্য ব্যাপকভাবে প্রচার চালানো প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য যারা কর্মস্থল থেকে বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে যান, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি বেশি থাকে। এজন্য ঈদের ছুটিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারি পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার এবং মাঠ পর্যায়ে কঠোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি”।
এ বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. এম মুশতাক হোসেন বলেন, “হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু কমাতে টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সমন্বিত ও সর্বাত্মক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন থাকলে অনেক শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব”।
তিনি বলেন, “শুধু আইসিইউ বাড়ালেই হবে না, বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তিন ধাপে সাজাতে হবে। প্রথম ধাপে কমিউনিটিতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের শনাক্ত করে আলাদা যত্নের আওতায় আনা, দ্বিতীয় ধাপে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের হাই-ফ্লো অক্সিজেন সুবিধা দিয়ে হাসপাতালে চাপ কমানো এবং তৃতীয় ধাপে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের জন্য আইসিইউ সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা দিতে হবে”।
অন্যদিকে, দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমাতে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বে-নজীর আহমেদ।
তিনি বলেন, “হামে মৃতের হার কমাতে কার্যকর সর্বাত্মক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়, বরং বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৩টি শিশু মারা যাচ্ছে। বিষয়টিকে যেন স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক”।
তিনি বলেন, “আমাদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, আমরা যেন হামে মৃত্যু কমাতে চাইছি না। সরকারের উর্ধ্বতন পর্যায় থেকে অনেকেই হামের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আছে বা সংক্রমণ কমে আসছে বলে মন্তব্য করছেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়”।
তার মতে, “হামে মৃতের হার শূন্যে নামিয়ে আনতে হলে পরিস্থিতিকে 'যুদ্ধকালীন অবস্থা' হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। এজন্য দ্রুত আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা বাড়ানো, হাসপাতালে অতিরিক্ত বেড ও বিশেষায়িত ওয়ার্ড চালু করা এবং বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি ছিল। চিকিৎসা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করতে হতো”।
ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, “প্রতিটি মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে একাধিক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে ডেথ অডিট পরিচালনা করতে হবে। কেন মৃত্যু হচ্ছে, কোথায় ব্যর্থতা বা ঘাটতি রয়েছে। এসব নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরতে হবে।' হামকে মহামারি ঘোষণা করার পক্ষেও মত দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তার মতে, মহামারি ঘোষণা করা হলে সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পেত, যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সহায়ক হতো”।