মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশু রাফিনকে দেওয়া হচ্ছে নেবুলাইজার গ্যাস। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশ থেকে একসময় প্রায় নির্মূল হতে চলা হাম রোগ এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, গত আড়াই মাসে নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ নিয়ে দেশে প্রায় ৫০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন আক্রান্তের পাশাপাশি মৃত্যু বাড়ায় চরম উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান নিছক কোনো স্বাস্থ্য সংকট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়Ñ এটি মূলত প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট একটি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি।
হামের এই ভয়াবহ রূপকে শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন গবেষক আকমাল হোসাঈন। সাউথ এশিয়া মনিটরে গতকাল প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, টিকার অভাব নয়, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতাই এই সংকটের মূল কারণ, যা শিশুদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই প্রভাষক তার নিবন্ধে লেখেন, ‘হামের প্রাদুর্ভাব কোনো সামরিক আগ্রাসন নয়, তবে এটি সর্বোচ্চ মাত্রার একটি অ-প্রথাগত নিরাপত্তা হুমকি। এটি একটি জনগোষ্ঠীর মৌলিক সক্ষমতাগুলোকে ক্ষয় করে, সামাজিক সম্প্রীতিকে অস্থিতিশীল করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভঙ্গুরতাকে উন্মোচিত করে। যখন দশটির মধ্যে নয়টি ঘটনাই ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ঘটে, তখন আমরা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখছি না। আমরা গভীর নিরাপত্তা হুমকিসম্পন্ন একটি শাসনতান্ত্রিক ব্যর্থতা দেখছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান গবেষকের এই উদ্বেগেরই বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নিশ্চিত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৯৯ শিশু। এর মধ্যে উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪১৪ জনের এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৮৫ জন শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গতকাল শুক্রবার পাঠানো হাম পরিস্থিতিবিষয়ক বিজ্ঞপ্তির তথ্যমতে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) নিশ্চিত হাম ও উপসর্গে ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে দুজন এবং উপসর্গে মারা গেছে নয় শিশু। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া নয় শিশুর মধ্যে সিলেট বিভাগেরই পাঁচজন। এ ছাড়া রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও রংপুর বিভাগে একজন করে শিশু মারা গেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে সন্দেহজনক হাম বা এর উপসর্গ নিয়ে রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ২৬১ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ১ হাজার ১০৪ জনকে। একই সময়ে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ৫৪ জন। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫১১ জনকে। আর একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৩২৯ জন।
আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তির দিক থেকে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে। গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি সন্দেহজনক হাম রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগেÑ ৪৪৯ জন। এরপর যথাক্রমে চট্টগ্রাম বিভাগে ২২১ জন, বরিশালে ১৩১, খুলনায় ৯৪, রাজশাহীতে ৯১, সিলেটে ৭৪, ময়মনসিংহে ৩৮ এবং রংপুরে ৬ জন। অন্যদিকে, ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ৫৪ রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ৪০ জন, চট্টগ্রামের ৯ জন এবং খুলনা বিভাগের ৫ জন। তবে এই সময়ে রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, সিলেট এবং ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন করে কোনো নিশ্চিত রোগী পাওয়া যায়নি।
আক্রান্ত ও মৃত্যুর পাশাপাশি সুস্থ হওয়ার তথ্যও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ১ হাজার ৭৫ জন। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ৪৩ হাজার ৪১১ জন রোগী।