আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬ ১১:২০ এএম
আপডেট : ২২ মে ২০২৬ ১১:২০ এএম
চমেক হাসপাতালে স্থানাভাবে প্রতি বেডে একাধিক শিশু রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চট্টগ্রাম মেডিক্যালের ১ নম্বর ওয়ার্ডে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডের ভেতরে প্রতি শয্যায় দুজন করে শিশু।
সাহানা বেগম সাইফুদ্দিন আর তুবা দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে দুই দিন আগে ফেনী থেকে এসেছেন। এর আগে ফেনীতে চিকিৎসাধীন ছিল ৬ থেকে ৭ দিন। চিকিৎসা কেমন চলছে প্রশ্ন করতেই পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কেন জিজ্ঞেস করছেন? সাংবাদিক পরিচয় দিতে সাহানা বলে উঠলেন, ‘শুনলে আনসার মাইর দিবে। কালকেও সাংবাদিকদের সঙ্গে অনেক ঝামেলা হইছে।’
ভবনের দ্বিতীয় তলায় ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে দুইটা আলাদা ব্লকেও হামের জন্য ডেডিকেটেড চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ফারহানের সঙ্গে তার তিন মাস বয়সী ভাতিজা আয়ান হামের উপসর্গ নিয়ে ওয়ার্ডে ভর্তি। দিনদশেক আগে নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি থেকে চমেক থেকে ফিরেছিল আয়ান। এর কয়েক দিনের মাথায় আবারও অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতাল ভর্তি করাতে হয়েছে।
“এবারের জ্বরে আয়ানের পুরো গায়ে লাল লাল গোটা ওঠে। জিহ্বাও ঘা হয়ে যায়। বুক ভর্তি কফ। ডাক্তার বলছে হামের লক্ষণ”, ভাতিজার বিষয়ে বলছিলেন আয়ান।
চিকিৎসার বিষয়ে ফারহান বলেন, “প্রতি সিটে দুইটা করে রোগী। ফ্লোরেও রোগী। ডাক্তার-নার্সরাও কী করবে। রোগীর চাপে তারা আগুন হয়ে থাকে। নেবুলাইজার করাতে টাকা, স্যালাইন দিতে টাকা। ক্যানোলা নাই। সেটা কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে”।
পাশ থেকে আলী হোসেন নামের একজন জানালেন, দিনে দুই থেকে তিনটা ক্যানোলা লাগে। গত ৭ দিন ধরে ছেলেকে নিয়ে এই ওয়ার্ডে আছেন তিনি। একটাও ক্যানোলা ওয়ার্ড থেকে দেওয়া হয়নি। ৫০ টাকা করে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এর বাইরে নার্সদের দুর্ব্যবহারের বিষয়ে ক্ষোভ রয়েছে তার। বলেন, “একবার নেবুলাইজার করালে ২০ টাকা, অক্সিজেন দিলে ১০০ টাকা। ১০০ টাকা দিলে সিটে থাকা রোগীকে নিচে নামিয়ে নতুন আসা রোগীকে সিটে তুলে দেয়। টাকা না দিতে চাইলে দুর্ব্যবহার করে। আবার রোগীর স্যালাইন বন্ধ হয়ে গেলে, ডাকতে গেলে আরেক সমস্যা”।
হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ সময় লাগছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ৬০ লিটার পর্যন্ত হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলার প্রয়োজন হচ্ছে। পিআইসিইউ শয্যা সংকটে অসহায় পরিবারগুলোকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শিশুদের জন্য বিভাগটিতে ২০টি পিআইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে। বাকি ৫টি শয্যায় অন্যান্য রোগী ভর্তি করা হচ্ছে।
তবে হাম সংক্রমণ বাড়ায় বর্তমানে শয্যার তুলনায় দ্বিগুণ সংকটাপন্ন শিশু পিআইসিইউ সেবার অপেক্ষায় রয়েছে। হাই ফ্লো নজল ক্যানোলা সংকটে গত সোমবার সুরাইয়া আলম নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের কোভিড ব্লকে ৮ শয্যার হাম কর্নার চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি) হাসপাতালেও ৬ শয্যার পৃথক ইউনিট তৈরি করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের পরীক্ষাগার না থাকায় রোগীদের নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে রিপোর্ট পেতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, বর্তমানে আমরা কাউকে ফেরত দিচ্ছি না। সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, “হাসপাতালের ২০ শয্যার শিশু আইসিইউর মধ্যে মাত্র ১০টি সরকারি। বাকিগুলো পরিচালিত হচ্ছে অনুদানের ভিত্তিতে। এছাড়া পুরো হাসপাতালে হাই-ফ্লো মেশিন রয়েছে ৪১টি। সীমিত সম্পদ নিয়েই চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে”।