ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ফাইল ছবি
সরকারি হিসাবেই গত দুই মাসে ৪৫০-এর বেশি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া বিপর্যয়কর হাম পরিস্থিতির মধ্যে নতুন উদ্বেগ হয়ে নাক গলাচ্ছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। ইতোমধ্যে দেশের আট বিভাগের ৫৬টি জেলায় শনাক্ত হয়েছে ডেঙ্গু রোগী। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলায় এ রোগের বিস্তৃতি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের শঙ্কিত করে তুলেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত সারা দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৯৩১ জন; মৃত্যুও ঘটেছে পাঁচজনের। এমন পরিস্থিতিতে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে অধিদপ্তর।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি এখনই পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে দেশে চলতি বছর ডেঙ্গুর ভয়াবহতা গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি হবে। কারণ প্রথমত. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার এডিস মশা সংক্রান্ত জরিপ দুই বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম ধারণা নিতে প্রতি বছর বর্ষার সময় ছাড়াও আগে ও পরে অর্থাৎ তিন দফায় এ জরিপ করা হতো। ফলে অধিদপ্তর সম্ভাব্য ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রায় অন্ধকারে রয়েছে। দ্বিতীয়ত. স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোও বিভিন্ন কারণে এই সময় মাঠপর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ ঠিকমতো করতে পারেনি। তৃতীয়ত. ক্লাইমেটিক কিছু ফ্যাক্টর বা জলবায়ুগত কিছু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে এবার নির্ধারিত সময়ের আগেই বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। ফলে এডিস মশার প্রজনন ও উপদ্রব বেড়েছে। ইতোমধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা ছাড়িয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই যদি সমন্বিতভাবে রোগী অনুসন্ধান করে সময়মতো চিকিৎসা প্রদান, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা না হয়, তবে এর সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতি হবে অপূরণীয়। হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি সম্মিলিতভাবে ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষও সৃষ্টি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমাদের সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের গবেষণা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি খারাপ হবে। কেননা, এ বছর সময়ের আগেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় এডিস মশার প্রজনন ও উপদ্রব বেড়েছে। বৃষ্টিপাত আরও বাড়লে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ এখনই এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের মাপকাঠি ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ঢাকার প্রায় সব এলাকায়ই ২০-এর ওপর। কোনো কোনো জায়গায় এই ইনডেক্স সর্বোচ্চ ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম এক সতর্কবার্তা। কারণ ব্রুটো ইনডেক্স ২০-এর ওপরে থাকলেই পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।
ড. কবিরুল বাশার বলেন, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পেছনে কিছু কাঠামোগত ব্যর্থতা দায়ী। যার একটি হলো, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার কাঠামো অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের বরখাস্ত করায় মাঠপর্যায়ে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ একেবারেই হয়নি। এ ছাড়া গত প্রায় দুই বছর সরকারি পর্যায়ে কোনো নিয়মিত নজরদারি বা সার্ভে হয়নি, যার ফলে প্রতিটি ওয়ার্ডের প্রকৃত পরিস্থিতি না জেনেই মশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। যা কার্যত অসম্ভব। আরেকটা হচ্ছে, ক্লাইমেটিক কিছু ফ্যাক্টর বা জলবায়ুগত কিছু পরিবর্তনের বিষয়। যে কারণে এ বছর একটু আগেভাগেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির পরেই সাধারণত এডিশ মশার উপদ্রুব বাড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে করণীয় প্রসঙ্গে এই কীটতত্ত্ববিদ বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা অনুযায়ী, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সুতরাং প্রথমত. যদি কীটনাশকের স্বল্পতা থাকে, তা দ্রুত কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত. ডেঙ্গু প্রতিরোধে সম্ভাব্য সবকিছুকে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য লোকবল ঠিক করতে হবে। তদারকি জোরদার করতে হবে। মশার লার্ভা নিধনে পাড়ায় পাড়ায় জনগণকে সচেতন ও সম্পৃক্ত করতে হবে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে কার্যকরভাবে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি বাসায় গিয়ে লার্ভা আছে কি না, তা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক পরামর্শক ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুতে এখন অনেকেই সারা বছর কমবেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তবে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ঘটে বর্ষা মৌসুমেÑ বিশেষ করে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এই সময়ে বৃষ্টির পানি জমে থাকা ছোট ছোট জলাধার এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া, দীর্ঘ উষ্ণ সময়কাল ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে। এখন সংক্রমণ আগেভাগে শুরু হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে যেখানে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাবে, সেখানেই সমন্বিত ক্রাশ প্রোগ্রাম দিতে হবে। যদি আমাদের স্বাস্থ্যগত কাঠামো না থাকে, জনবল কম থাকে, তাহলে ভলান্টিয়ার যুক্ত করে কাজ করতে হবে। যেখানে রোগী পাওয়া যাবে, সেখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতে হবে, ওই এলাকায় আর কারও জ্বর আছে কি না। যদি থাকে তাহলে তার ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে। ডেঙ্গু ধরা পড়লে প্রয়োজনমতো চিকিৎসা দিতে হবে। রোগী গরিব হলে তাকে হাসপাতালে সরকারি খরচে চিকিৎসা করাতে হবে। তার পরিবার যাতে না খেয়ে থাকে, সেজন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। এর সঙ্গে রোগীর এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম, জমে থাকা পানি ও আবর্জনা পরিষ্কার কার্যক্রম জোরালোভাবে পরিচালনা করতে হবে। তাহলে ধীরে ধরে ডেঙ্গু রোগী কমানো যাবে। এভাবে যদি দেশের প্রত্যেকটা অঞ্চলে ডেঙ্গু রোধে পরিকল্পিত কার্যক্রম, ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা স্থাপন করে রোগীদের প্রাথমিক পর্যায়েই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে কোনো হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে না এবং ডেঙ্গুতে প্রাণহানি কমার সম্ভাবনা জোরালো হবে।
সতর্কাবস্থায় সরকার, অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশন
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। গত ১২ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভিডিওবার্তায় ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে প্রতিটি এলাকার সংসদ সদস্যসহ সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের প্রতি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রত্যেক সপ্তাহের শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর গত ১৪ মার্চ শনিবার থেকে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযানও শুরু হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ পর এর আর তেমন ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। তবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন চলতি মাসে ঢাকঢোল পিটিয়ে মাঠে নেমেছে। প্রত্যেক মাসের প্রথম শনিবারকে ক্লিনিং ডে হিসেবে ঘোষণা করে গত ৭ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে।
ইতোমধ্যেই ডিএসসিসি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসির সহযোগিতায় ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রথমবারের মতো লার্ভার অবস্থা বুঝতে বিশেষ জরিপ কার্যক্রম শুরু করেছে। এ জরিপ শেষে এডিশ লার্ভার ঘনত্ব বুঝে সেভাবে কার্যক্রম চালানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ উন্নয়ন, বায়ুদূষণ হ্রাস, ডেঙ্গুমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিটি ভবনের আঙিনা পরিষ্কার রাখা ও সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ‘পরিচ্ছন্ন আঙিনা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অঞ্চলভিত্তিক তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জনসচেতনতা সৃষ্টি করে মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা বিষয়ে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে ‘সুরে সুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধ’ শীর্ষক ভ্রাম্যমাণ বাউলসংগীত কর্মসূচি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্লিন স্কুল, নো মসকিউটো’ শিরোনামে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযানের সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করে প্রচার কর্মসূচি পালন করেছে।
‘সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে’
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের এ উদ্যোগ প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘নিঃসন্দেহে এগুলো ভালো উদ্যোগ। এর ফলে সাধারণ মানুষ নতুন করে সচেতন হবে। কিন্তু শুধু সচেতন হলে হবে না, সম্পৃক্তও করতে হবে। প্রশাসনকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করতে হবে এবং বাড়ির অন্যদের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ ডেঙ্গু সম্পর্কে প্রায় সবাই কমবেশি জানে, নিজের বাড়িতে কোথায় পানি জমে থাকে, সেটাও জানে। তাদের সম্পৃক্ত করলে বাসায় বাসায় পানি জমে থাকা রোধ হবে। বাড়ির আশপাশে ড্রেনেজ ব্যবস্থা বা এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির মাঝে ময়লা-আবর্জনার দিকেও তাদের নজর পড়বে; সেগুলো তারা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেবে। তাহলে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা রোধ করা সম্ভব হবে।
পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের শুরু থেকে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে একজন করে দুজনসহ তিনজন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন এবং রাজশাহী বিভাগে একজন মারা গেছে। ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, গাজীপুর ও চাঁদপুর জেলায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ২২ শতাংশ মিলেছে এই পাঁচ জেলায়। এখন পর্যন্ত কোনো রোগী পাওয়া যায়নি শরীয়তপুর, চুয়াডঙ্গা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও মৌলভীবাজার জেলায়।