হাসপাতালের আইসিইউ বেডে অসুস্থ সন্তানের অক্সিজেন মাক্স ধরে বসে আছেন মা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আমি একটা পিএইচডি কোর্স পড়াই, যেখানে ডেটা ভিজুলাইজেশনে হাম নিয়ন্ত্রণে সফলতার হিট্ম্যাপ ছবি তৈরি ও প্রাক্টিস করাই। কিন্তু সেই হাম বাংলাদেশে এইভাবে ফিরে আসবে ভাবিনি। ছোট ছোট বাচ্চা হারানো মানুষের আহাজারি সহ্য করা কঠিন। আর এটা যদি হয় অবহেলার কারণে, তাহলে তো নয়ই।
বাংলাদেশ ২০০০-২০২০ সময়কালে হাম (Measles) নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে দেশটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেটা নিয়ে একটা বারগ্রাফ (ছবিতে দেখুন) করলাম, যাতে এটি স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। মার্চ-এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে ৫৮টির বেশি জেলায় হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই ৫ বছরের কম বয়সী এবং টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণভাবে টিকা নেওয়া শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এই পরিস্থিতিকে একটি উচ্চ জাতীয় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এখন পর্যন্ত কয়েকশ শিশু মারা গেছে।
আরও পড়ুন: হাম নিয়ন্ত্রণে এলেও ফিরবে না অকালে হারিয়ে যাওয়া সেইসব শিশু |
কেন এমন হলো?
১. টিকাদান কভারেজে ফাঁক (Immunity gap)
হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য কমপক্ষে ৯৫% শিশুদের পূর্ণ টিকাদান প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে MR টিকার প্রথম (MR1) ও দ্বিতীয় (MR2) ডোজ উভয় ক্ষেত্রেই কভারেজ কমে গেছে। ফলে অনেক শিশু একেবারেই টিকা পায়নি (zero dose children)।
২. সময়মতো ক্যাচ আপ ক্যাম্পেইন না হওয়া
বাংলাদেশে সাধারণত প্রতি ৪-৫ বছর পর পর বিশেষ হাম-রুবেলা (MR) টিকাদান ক্যাম্পেইন হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে নির্ধারিত ক্যাম্পেইনটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি, যার ফলে লাখ লাখ শিশু সুরক্ষার বাইরে থেকে যায়।
৩. টিকা সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা
২০২৫ সালে টিকা ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে ভ্যাকসিনের ঘাটতি, দেরি এবং স্টক আউট দেখা যায়। এর প্রভাব পড়ে রুটিন টিকাদানে, যা হাম ছড়িয়ে পড়ার পরিবেশ তৈরি করে।
৪. শহুরে বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশ সীমিত। এসব এলাকায় ও শরণার্থী প্রভাবিত জনগোষ্ঠীতে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং হাসপাতাল-ব্যবস্থা চাপে পড়ে।
স্বল্পমেয়াদি করণীয় (এখনই)
১. জরুরি হাম-রুবেলা (MR) টিকাদান ক্যাম্পেইন : ৬ মাস-৫ বছর বয়সী সব শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা
২. ভিটামিন A সাপ্লিমেন্টেশন ও দ্রুত হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা
৩. জিরো ডোজ শিশু শনাক্তকরণ ও মোবাইল টিকাদান টিমের মাধ্যমে পৌঁছানো
৪. উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় রোগ নজরদারি ও রিপোর্টিং জোরদার করা
এই ধরনের জরুরি উদ্যোগ ইতোমধ্যে সরকার, WHO ও UNICEF-এর সহায়তায় শুরু হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি করণীয়
১. রুটিন টিকাদান পুনর্গঠন (MR1 ও MR2 উভয় ক্ষেত্রেই ≥৯৫%)
২. নিরবচ্ছিন্ন ও স্বচ্ছ টিকা সরবরাহ ব্যবস্থা (UNICEF/Gavi চ্যানেল ব্যবহার)
৩. ডিজিটাল টিকাদান রেজিস্ট্রি ও রিয়েল টাইম রোগ নজরদারি
৪. শহুরে বস্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কৌশল
৫. রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
Lancet এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি কোনো টিকার ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ফল।
হাম একটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। বাংলাদেশ অতীতে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, ভবিষ্যতেও পারবে যদি সিদ্ধান্তগুলো সময়োপযোগী, তথ্যভিত্তিক এবং সমন্বিত হয়।
ড. আবু বকর ছিদ্দিক
জৈব তথ্য বিশ্লেষক, সুইডিশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন