বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬ ১২:১৯ পিএম
আপডেট : ০২ মে ২০২৬ ১২:২১ পিএম
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থাÑ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল। এই কাউন্সিল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কাউন্সিলের নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ সামনে আসছে।
বিগত সরকার ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা আইন-২০২৩’ প্রণয়ন করে। এই আইনের মাধ্যমে হোমিওপ্যাথিক খাতকে একটি আধুনিক ও সুসংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী কাউন্সিলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর থাকবেÑ গভর্নিং বডি এবং নির্বাহী পরিষদ। এর মধ্যে নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পদধারী ব্যক্তি কাউন্সিলের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা ও নীতিমালা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব তার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পালন করছেন। সরকার পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় শিগগির স্থায়ী চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে শিগগির বিভাগীয় পর্যায়ে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে চিকিৎসক প্রতিনিধি সদস্যদের নামের তালিকাও সংগ্রহ করা হয়েছে। তাই কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে।
চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক : এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাহী পরিষদের চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে নরসিংদী হোমিও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. শফিকুল ইসলামের নাম সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হচ্ছে। তবে এ সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে চিকিৎসক, শিক্ষক ও সংগঠকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে কাউন্সিলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কারণ যোগ্যতা না থাকলেও মন্ত্রীর সঙ্গে সখ্যের সুবাদে তাকে নিয়োগ দেওয়ার তোড়জোড় চলছে। ডা. শফিকুল ইসলাম স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নিজ এলাকার হওয়ায় সেই সুবিধাকে তিনি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।
জানা গেছে, ডা. শফিকুল ইসলাম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুবিধাভোগী হিসেবে সর্বমহলে আলোচিত ছিলেন। এ অবস্থায় কিছু চিকিৎসক মনে করছেন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার বিষয়টি উপেক্ষিত হলে পুরো খাতের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাদের মতে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ হলে কাউন্সিলের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ডা. সৈয়দ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, ‘চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে যদি যোগ্যতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু একটি পদে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো খাতের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই সময়ে সঠিক নেতৃত্ব না এলে সেই সুযোগ নষ্ট হতে পারে।’
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক ও সংগঠক ডা. মৌসুমী আক্তার মনে করেন, ‘এই পদে এমন একজনকে নিয়োগ দেওয়া উচিত, যিনি পেশাগতভাবে দক্ষ, প্রশাসনিকভাবে অভিজ্ঞ এবং সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য। শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়।’
ডা. শফিকুল ইসলামকে কাউন্সিলের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে হোমিওপ্যাথিক সংশ্লিষ্ট কয়েকজন চিকিৎসক ও সংগঠক ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, চেয়ারম্যান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেন স্বচ্ছতা বজায় থাকে এবং কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকে দায়িত্ব না দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা চাই সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করুক। এই কাউন্সিল শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি পুরো হোমিওপ্যাথিক শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা কাউন্সিল দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই খাতের উন্নয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, পাঠ্যক্রম নির্ধারণ এবং প্রতিষ্ঠান তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সেই কারণে চেয়ারম্যান পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বগুণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন অযোগ্য বা অদক্ষ ব্যক্তির কারণে পুরো ব্যবস্থাপনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন সব ধরনের রাজনৈতিক চাপ, ব্যক্তিগত প্রভাব ও বিতর্ক এড়িয়ে একটি স্বচ্ছ ও যোগ্যতাভিত্তিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।