প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৫ ১৮:৪৩ পিএম
দেশের শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত নতুন জরিপে একাধিক গুরুতর সংকট স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের প্রায় ৩৮ শতাংশের রক্তে সীসার মাত্রা নিরাপদ সীমার ওপরে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে অন্তত ৪ জন সীসা-দূষণের শিকার। একইভাবে, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের প্রায় ৮ শতাংশের রক্তে সীসার মাত্রা নিরাপদ সীমার বাইরে।
রবিবার (১৬ নভেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ এমআইসিএস ২০২৫ প্রিলিমিনারি ফাইন্ডিংস শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিবিএস ও ইউনিসেফ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অঞ্চলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা—এখানে ৬৫ শতাংশ শিশুর শরীরে অতিরিক্ত সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। জরিপ বলছে, সীসা দূষণ কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির সমস্যা নয়; বরং এটি সব আয়ের পরিবারের মাঝেই বিস্তৃত। আক্রান্ত শিশুদের অর্ধেকের বেশি উচ্চ আয়ের পরিবারে এবং প্রায় ৩০ শতাংশ নিম্ন আয়ের পরিবারে বাস করে। শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে সীসা মারাত্মক ক্ষতি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে শেখার ক্ষমতা, আচরণ ও স্বাস্থ্যে অপূরণীয় প্রভাব ফেলে।
জরিপে অপুষ্টির চিত্রও আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। কম ওজনের শিশু (Wasting) ২০১৯ সালের ৯ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে ১২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। মায়েদের অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা এখনও অত্যন্ত উদ্বেগজনক—হার ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ। এদিকে কিশোরী জন্মহার প্রতি ১,০০০ মেয়ের মধ্যে ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২ হয়েছে। এসব সূচক মাতৃ ও শিশু পুষ্টি, সঠিক স্তন্যপান-প্রচলন এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে দ্রুত হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাকে আরও তীব্রভাবে সামনে নিয়ে আসে।
৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৯ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—অর্থাৎ আরও ১২ লাখ শিশু নতুনভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সহিংসতার হারও উচ্চ; সাম্প্রতিক সময়ে ৮৬ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের সহিংস আচরণের শিকার হয়েছে। বাল্যবিবাহের হার কিছুটা কমে ৪৭ শতাংশে নেমে এলেও এখনও প্রায় অর্ধেক কন্যাশিশুর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়।
জরিপে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধন পরিস্থিতিও দুর্বল বলে উঠে এসেছে—এই বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশ নিবন্ধিত এবং ৪৭ শতাংশের জন্মসনদ রয়েছে। এর ফলে বড় একটি অংশ আইনগত পরিচয়, সুরক্ষা এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু সুরক্ষায় বিনিয়োগের সুফল অত্যন্ত বেশি—প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নয়গুণ লাভ পাওয়া যায়। ফলে শিশুশ্রম কমানো, সহিংসতা প্রতিরোধ, সামাজিক সেবা সম্প্রসারণ এবং কিশোর-কিশোরীদের ক্ষমতায়নে দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য সূচকগুলোতেও বিদ্যমান ঘাটতি স্পষ্ট। নবজাতকের মৃত্যুহার এখনও প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মে ২২। এটি পাঁচ বছরের কম বয়সী মোট শিশুমৃত্যুর প্রায় ৬৭ শতাংশ। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে প্রসবের ক্ষেত্রে সিজারিয়ান সেকশনের হার ৭৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে—যা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আর্থিক চাপ দুটোই বাড়াচ্ছে। মাত্র ৪৬ শতাংশ নারী গর্ভধারণের প্রথম চার মাসের মধ্যে অ্যান্টেনাল কেয়ার নিতে আসেন, যা মাতৃস্বাস্থ্যসেবার ঠিক কতটা পিছিয়ে আছে তা স্পষ্ট করে।
জল ও স্যানিটেশন খাতেও সংকট গভীর। স্যানিটেশন সেবায় প্রবেশাধিকার বাড়লেও নিরাপদভাবে পরিচালিত পানীয়জলের হার ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। দেশের প্রায় ১০ কোটির বেশি মানুষ নিরাপদ পানীয়জল থেকে বঞ্চিত। পানীয়জলের অর্ধেক উৎস এবং গৃহস্থালির ব্যবহৃত পানির ৮০ শতাংশের বেশি ই. কোলাই দ্বারা দূষিত। জলবায়ুজনিত বিপর্যয় গত এক বছরে ১০ দশমিক ২ শতাংশ পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত করেছে—যা জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে আনে।
শিক্ষায় প্রাথমিক স্তরে ভর্তির হার ৮০ শতাংশ হলেও উচ্চতর স্তরে উপস্থিতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক শিশু মৌলিক দক্ষতা অর্জন ছাড়াই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করছে এবং এখনও প্রায় ৬ থেকে ৭ শতাংশ শিশুই স্কুলের বাইরে। ফলে শিশুদের উপস্থিতি ও শেখার দক্ষতা বাড়াতে নতুন ও উদ্ভাবনী শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
বিবিএস-এর নতুন জরিপ বলছে, সীসা দূষণ, অপুষ্টি, শিশুশ্রম, সহিংসতা, দুর্বল মাতৃসেবা থেকে শুরু করে পানীয়জলের দূষণ—সব ক্ষেত্রেই শিশুদের নিরাপত্তা ও সুস্থ বিকাশ এখন চ্যালেঞ্জে ঘেরা। এই প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বহুমাত্রিক সরকারি হস্তক্ষেপ, নিরাপদ পানি, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, এবং শিশুশ্রম প্রতিরোধে বৃহৎ বিনিয়োগের দাবি করছেন, যাতে শিশুদের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়।