রুগ্ন হাসপাতাল
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৫ ১৫:২২ পিএম
অসুস্থ মানুষের জীবন বাঁচাতে নয়, কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম যেন কাগজে-কলমে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। আধুনিক আইসিইউ, আইসোলেশন ইউনিট, আরটিপিসিআর ল্যাব বা বিএসএল-৩ ল্যাব- সবই এখন হাসপাতালের গুদামে স্তূপ হয়ে আছে। যন্ত্রগুলো কেনা হয়েছে, কিন্তু চালানোর মতো জনবল নেই, নেই রক্ষণাবেক্ষণ। সরকারি অডিট বলছে, অবহেলা, অদক্ষতা আর অনিয়মের কারণে কয়েকশ কোটি টাকার সরঞ্জাম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তব চিত্র কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপ্রেয়ার্ডনেস (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পের, যার উদ্দেশ্য ছিল মহামারির সময় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং ভবিষ্যৎ মহামারির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। কিন্তু তিন বছর পর সেই প্রস্তুতির বেশিরভাগই কাগজে আটকে গেছে।
অর্থে গতি, কাজে স্থবিরতা
প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ হাজার ১২৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে ৮৫০ কোটি টাকা আসে বিশ্বব্যাংক ও এআইআইবির ঋণ সহায়তায়। মাত্র এক বছরের মাথায় প্রকল্পে প্রথম সংশোধনী আনা হয়; যেখানে মেয়াদ না বাড়িয়েও ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৮৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে পাঁচগুণেরও বেশি।
এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। একই সঙ্গে ব্যয় কমিয়ে ধরা হয় প্রায় ৬ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, মেয়াদ বাড়লেও কাজ এগোয়নি; বরং যন্ত্রপাতি ক্রয়, বিতরণ ও ব্যবহার নিয়ে অসংখ্য অনিয়ম ধরা পড়ে।
আইসিইউ থেকে ল্যাব- সবখানেই অচল
আইএমইডির (বাস্তবায়ন পরীবিক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ৭৬ শতাংশ হলেও কার্যত কোনো লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ৫০টি জেলায় ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের মধ্যে ৭টির কাজ অসম্পূর্ণ, যন্ত্রপাতি পৌঁছেনি। ২০ শয্যার আইসোলেশন ইউনিটের মধ্যে ৬টির কাজ শেষ হয়নি।
২৯টি আধুনিক মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবরেটরির মধ্যে ১০টিতে কোনো যন্ত্রপাতিই সরবরাহ করা হয়নি। ২টি বিএসএল-৩ ল্যাবরেটরি ভবন প্রস্তুত হলেও যন্ত্রপাতি বসানো হয়নি। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে পিআইসিইউ ও অবস্টেট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ভবন নির্মাণ হলেও ভেতরে ফাঁকা ঘর ছাড়া কিছু নেই।
ওয়ান-স্টপ ইমার্জেন্সি কেয়ার সেন্টার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবনও একই দশায়, দরজা-জানালা লাগানো হয়েছে কিন্তু ভেতরে কিছুই বসানো হয়নি।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ডা. মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য দাখিলকৃত দরপত্রগুলো নন-রেসপন্সিভ হওয়ায় ক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। এই কারণে অনেক আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিটে যন্ত্রপাতি পৌঁছেনি।
অডিটে উন্মোচিত সরকারি সম্পদের অপচয়
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অডিট রিপোর্টে উল্লেখ আছে, অব্যবহারযোগ্য কেএন৯৫ মাস্ক সরবরাহের কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অযোগ্য সরবরাহকারীর সঙ্গে চুক্তি করে ৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা অপচয় করা হয়েছে। ৪৭ কোটি ২৬ লাখ টাকার চিকিৎসাসামগ্রী এখনও ব্যবহারই করা হয়নি।
ইউনিসেফ ৩০টি হাসপাতালে গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণের জন্য সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই ৫৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়। কাজ বিলম্বিত হওয়ায় অতিরিক্ত ৫৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়।
অডিটে আরও পাওয়া গেছে, সরবরাহ ছাড়া চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা পরিশোধ হয়েছে। সরবরাহকারীদের অনিশ্চিত অর্থ প্রদান, ট্যাক্স ও ভ্যাট জমা না দেওয়া এবং আসবাবপত্রের হিসাবহীন ব্যবস্থাপনায় সরকারি সম্পদের অপচয় আরও বাড়িয়েছে। কিছু আসবাব হারিয়ে গেছে, কিছু গুদামে অপ্রয়োজনে পড়ে আছে।
মাঠপর্যায়ের ভয়াবহ চিত্র
আইএমইডির পরিদর্শন দল দেখতে পায় বেশিরভাগ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে যন্ত্রপাতি নষ্ট বা অচল অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও প্যাকেটবন্দি, কোথাও মরিচা ধরা। এপিডেমিওলজিক্যাল ইউনিটগুলোতে সরঞ্জাম থাকলেও ব্যবহার নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভবনও বন্ধ। যেখানে মহামারির সময় প্রতিটি শয্যার প্রয়োজন ছিল অক্সিজেন সাপোর্ট, সেখানেই এখন অকেজো গ্যাস পাইপলাইন ও বন্ধ মেশিনের সারি।
দায় কার, নেতৃত্ব কোথায়
প্রকল্পের ছয় বছরে সাতজন প্রকল্প পরিচালক বদল হয়েছেন; যার মধ্যে পাঁচজন ছিলেন অতিরিক্ত দায়িত্বে। নিয়মিত নেতৃত্বের অভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, ক্রয়-বিতরণে অনিয়ম এবং মনিটরিং ব্যর্থতা প্রকল্পটিকে অকার্যকর করে তুলেছে।
আইএমইডি বলছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে নিয়মিত দক্ষ পরিচালক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ প্রকল্পই অতিরিক্ত দায়িত্বে পরিচালিত হয়, যার ফলে কেউই প্রকল্পের পূর্ণ দায় নিতে চান না।
প্রকল্পের ৬ হাজার ৩৮৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বরাদ্দের বিপরীতে ৪ হাজার ৭৮২ কোটি ২০ লাখ ব্যয় হয়েছে। আর্থিক অগ্রগতি ৭৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ, বাস্তব অগ্রগতি ৭৬ শতাংশ। কিন্তু এই শতকরা হিসাব কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ; বাস্তবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হাসপাতালকে প্রস্তুত করা, যা একটি ইউনিটেও পূরণ হয়নি।
অবশেষে সুপারিশ কিন্তু বাস্তবায়ন কে করবে
আইএমইডি ও সরকারি অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরঞ্জাম ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল দ্রুত নিয়োগ, ইনভেন্টরি সঠিকভাবে মার্কিং, ক্রয় প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং প্রকল্প পরিচালক স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া জরুরি।
কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের অভিজ্ঞরা বলছেন, এই সুপারিশগুলোও হয়তো পরবর্তী প্রকল্পের কাগজেই থেকে যাবে। কারণ যেভাবে সরকারি যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প প্রশাসনে দায়হীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে ‘বারোভূতে’ খাওয়া এসব সরঞ্জামের হিসাব আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না।