মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২৫ ১২:৪১ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
চিকিৎসাসেবার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং মান নিশ্চিত করতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স নেওয়া এবং নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। অনুমোদন ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনারও এখতিয়ার নেই। অথচ দেশজুড়ে দেদারসে চলছে হাজার হাজার অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্ল্যাডব্যাংক। বিস্ময়কর হলোÑ অবৈধ হাসপাতালের তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে। অনুমতিবিহীন চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো শনাক্তের জন্য নিয়মিত কোনো অভিযানও নেই।
অথচ ভুল চিকিৎসায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে দেশের মানুষকে। যার ফলে তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকটও। ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় অবস্থিত ইউনাইটেড মেডিকেল হাসপাতালে সুন্নাতে খতনা করাতে গিয়ে ভুল অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগে মারা যায় ৫ বছরের শিশু আয়ান। এর পরও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মৃত শিশুকে আইসিইউতে রেখে ৬ লাখ টাকা বিল করে শিশুটির পরিবারকে চাপ দেয়। এমন মর্মান্তিক ঘটনা অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিদর্শনে গিয়ে জানতে পারে অনুমোদন ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল ইউনাইটেড হাসপাতাল। এমনকি হাসপাতালটি কখনও নিবন্ধনের জন্য আবেদনই করেনি।
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্ট শিশু আয়ানের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান করে সাত দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (স্বাস্থ্যসেবা) নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি সারা দেশে লাইসেন্স ও অনুমোদনহীন কতগুলো হাসপাতাল রয়েছে, তার তালিকা এক মাসের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (স্বাস্থ্যসেবা) নির্দেশ দেন।
এর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে আদালতকে জানানো হয়, দেশে লাইসেন্সবিহীন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্ল্যাডব্যাংকের সংখ্যা ১ হাজার ২৭। আর সারা দেশে লাইসেন্সধারী বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্ল্যাডব্যাংকের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৩৩।
সম্প্রতি এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পদস্থ কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘রাজধানীর লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের নামগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়নি। রাজধানীতে শতাধিক নবায়নবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক-ব্লাডব্যাংক রয়েছে।’ তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নবায়নের আবেদন সংখ্যাটাই আছে বলে তিনি জানান।
আমাদের চিকিৎসা খাতের বড় অংশ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ চিকিৎসাসেবা দেয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। ঢাকার লোকসংখ্যা দুই কোটির বেশি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য রাজধানীতে রয়েছে ২৫টির মতো সরকারি হাসপাতাল। এ ছাড়া পঞ্চাশের অধিক বেসরকারি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। রাজধানীতে অনুমোদন ছাড়া কী পরিমাণ হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাডব্যাংক রয়েছেÑ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে এ বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তালিকা নেই। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বছর ঘুরলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রো ও উপশহরগুলোতে কয়েক ডজন অনুমোদনহীন হাসপাতাল-ক্লিনিক রয়েছে, যারা নীরবে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। ছোট ছোট এসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জনবল ও বিষয় ভিত্তিক দক্ষ লোক নেই। তবে রাজধানীতে পুরোপুরি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের কথা জানা নেই বলে জানান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এর কারণ হিসেবে গত দেড় বছরে কোনো জরিপ পরিচালনা না হওয়ার কথা বলেন তারা।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ সাফি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এ বিষয়ে কাজ করার জন্য আলাদা জনবল ও মনিটরিং ব্যবস্থা আমাদের নেই। এজন্য লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির সুযোগ কম। নিয়ম মেনে কেউ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলে আমরা সশরীরে পরিদর্শনে যাই। সন্তোষজনক মনে হলে তবেই অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়।’
বেসরকারি হাসপাতাল মনিটরিংয়ে সিটি করপোরেশনেরও দায় রয়েছে। কারণ তারাই ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘অধিদপ্তরের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার না থাকার কারণেও আমরা কঠোর অবস্থানে যেতে পারি না। আমাদের জরিমানা করার ক্ষমতা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর বেশি কঠোর হওয়ার সুযোগ নেই।’
এদিকে গত দেড় বছরে রাজধানীর লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সুনির্দিষ্ট তালিকার বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে হালনাগাদ তালিকা করা হয়নি।’ রাজধানীতে লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে গত দেড় বছরে কোনো অভিযানও নেই কেনÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যানবাহন ঘাটতি রয়েছে, জ্বালানি নেই। এই সংক্রান্ত বরাদ্দ নেই। আমি তো নিজের টাকা খরচ করে পরিদর্শন করতে পারি না।’
২০২২ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালকের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে বলা হয়, ‘দেশের সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ও ব্লাডব্যাংকগুলো লাইসেন্স নম্বর মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখসহ বোর্ডে ঝুলিয়ে রাখতে হবে। এটি প্রয়োজনে কিউআর কোডসহ ডিসপ্লে করতে হবে, না হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্ত রাজধানীতে একাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ঘুরেও এই নির্দেশ মানতে দেখা যায়নি। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে বিষয়টি সঠিকভাবে মনিটর করা যাচ্ছে না।’
জানা যায়, প্রতি বছর ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স নবায়নের জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিস্তারিত বিবরণ, সিটি করপোরেশনের ছাড়পত্র, কর সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য নথি প্রয়োজন। এর আলোকে এসব হাসপাতালকে নিয়মিত নোটিস দেওয়ার পাশাপাশি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু এসব কাগজপত্র দিতে পারে না বলে লাইসেন্স নবায়ন করতে আসে না অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৫ বছর আগে দেশে ১৫ হাজারেরও বেশি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশেরই ছিল না বৈধ লাইসেন্স।
বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স ইস্যুতে দীর্ঘ সময় নীরব থাকা ও কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা না থাকার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. সুজানা করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এ বিষয়ে ভাবা উচিত। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর নিয়মিত লাইসেন্স পরিদর্শন ও ত্রুটি যাচাই করা হলে বেসরকারি চিকিৎসাসেবার মান বাড়বে। আর এ কার্যক্রমে উদাসীনতা দেখালে জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে।’