× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রোগী ঘিরে গলাকাটা বাণিজ্য

মাসুদুল হাসান ও কাউসার আহমেদ

প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৫১ এএম

রোগী ঘিরে গলাকাটা বাণিজ্য

‘ওনার অবস্থা দেখছি খুবই খারাপ। ওনাকে তো আইসিইউতে না নিলে বাঁচানো যাবে না।’- খুব নিরীহ অথচ সহানুভূতি আর উদ্বেগ মেশানো এ রকম স্বরে রোগীর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন তারা। সরকারি হাসপাতালের করিডোর আর আশপাশে অহরহ দেখা মেলে এদের। রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজনদের আশ্বস্ত করেন, খুব অল্প টাকায় রোগীকে আশপাশের হাসপাতালে আইসিইউতে রাখার ব্যবস্থা করে দেবেন তারা। সেখানে দুয়েক দিন থাকলেই রোগী ভালো হয়ে যাবে।

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় গত বুধবার কথা হলো এমনই এক ‘সহানুভূতিশীল’ ব্যক্তির সঙ্গে। জাহিদুর ইসলাম নামের এই দালাল কথায় কথায় জানালেন, রোগীর স্বজনদের তারা বোঝান, এ রোগীকে দিন তিনেক আইসিইউতে থাকতে হবে। ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। পরে ভালো হয়ে গেছে বলে দিন দুয়েক পরেই রোগীকে কেবিনে নেওয়া হয়। এতে আইসিইউর ওই শয্যায় এক দিন আগেই নতুন রোগী আনা যায়। তিনি বলেন, ‘এতে হাসপাতালেরও লাভ হয়, আমরাও একটু বেশি কমিশন পাই।’

এ রকম সব দালালের ঘাড়ে ভর করে বেসরকারি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো (আইসিইউ) বর্তমানে সাধারণ মানুষের কাছে পরিণত হয়েছে ‘টাকা গেলার ভয়ংকর কুমিরে।’ এখানে এলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়ানো রোগীর চিকিৎসা মেলে বটে, কিন্তু পরিবার ডুবে যায় অস্বাভাবিক বিলের ভারে। অনেকের আবার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও এখানে আসতে হয় দালালের ফাঁদে পড়ে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যার তীব্র সংকট থাকায় দালালরা সহজেই তাদের ফাঁদে ফেলতে পারে। ফলে অসহায়, দরিদ্র মানুষকেও আইসিইউতে গেলে প্রতিদিন ৩০ হাজার থেকে কখনও কখনও এক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ গুনতে হয়। এভাবে রোগীদের ঘিরে হাসপাতালগুলো চলছে ‘গলাকাটা বাণিজ্য’।

প্রসঙ্গত, দেশের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ স্বল্পতা রয়েছে। এখনও ২২ জেলায় সরকারি কোনো আইসিইউ নেই। রোগীর অবস্থা মুমূর্ষু হয়ে পড়লে তাকে বাঁচিয়ে রাখার আশায় নিরুপায় আত্মীয়স্বজন বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে যেতে দ্বিধা করেন না। সীমিত শয্যা আর সীমাহীন চাহিদার ফাঁদে পড়ে সাধারণ মানুষ বাধ্য হচ্ছেন বাড়তি বিল গুনতে। এজন্য কেউ সঞ্চিত গয়নাগাটি বিক্রি করছেন, কেউবা ঋণ নিচ্ছেন।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত একটি ‘আইসিইউ রেগুলেশন নীতিমালা’ তৈরি করা, যেখানে হাসপাতালের শ্রেণি অনুযায়ী সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা থাকবে।

শয্যা ভাড়া অস্বাভাবিক

দেশের নামিদামি বেসরকারি হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে গেলে প্রতিদিন ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। মাঝারি মানের হাসপাতালগুলোতেও ব্যয় হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। শিশুদের এনআইসিইউ বা পিসিইউতে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। রাজধানীর আজগর আলি হাসপাতাল, রাশমনো স্পেশালাইজড হাসপাতাল, উত্তরা লেক স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও হাসপাতাল টুয়েন্টি সেভেন প্লাসে আইসিইউ-এর জন্য প্রতিদিন গুনতে হয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ঢাকার শমরিতা হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ভাড়া দিনপ্রতি ১৫ হাজার টাকা, ওষুধপত্র ইত্যাদি মিলিয়ে সেখানে মোট বিল আসে ২৫-৩০ হাজার টাকা। 

অনেক বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গেই দালাল চক্রের যোগসাজশ রয়েছে। বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে তাদের প্যাকেজ চুক্তি থাকে। একজন রোগী নিয়ে যেতে পারলে তারা কমিশন পায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ

রাবেয়া বেগম নামে এক রোগীর স্বজন অভিযোগ করেছেন, ‘ঢাকা মেডিকেল থেকে এক ডাক্তার নিজেই অ্যাম্বুলেন্সে করে আমাদের একটি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। বলেন, ওই হাসপাতালে চিকিৎসা ভালো হবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি এক দিনেই বিপুল বিল ধরিয়ে দিয়েছে।’

একটি হাসপাতালের বারান্দায় এই প্রতিবেদকের কাছে আজিজ নামের এক রোগীর আত্মীয় বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল প্রতিদিনের খরচ হবে ১৮ হাজার টাকা। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর দেখা গেল শুধু ওষুধের খরচই ৩০ হাজার টাকা, সঙ্গে ডাক্তার ও অন্যান্য বিল মিলে মোট ১ লাখ টাকা দাবি করছে হাসপাতাল।’

রংপুর থেকে আসা সাইফুল ইসলাম প্রামাণিক নামে এক রোগী জানালেন, মহাখালীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে তার ১২ দিনের শয্যা ভাড়া এসেছে ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৪০ হাজার টাকারও বেশি বিল গুনতে হয়েছে তার পরিবারকে।

রাসেদা আক্তার নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘বাবা তেমন অসুস্থ না থাকলেও দালাল চক্রের প্রভাবে তাকে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয়। প্রথমে ১০ হাজার টাকার কথা বললেও এখন ৩০ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দিয়েছে।’

রাজধানীর মেরুল বাড্ডার বাসিন্দা পারভীনের ৪ বছরের বাচ্চা বাবু নেফ্রাইটিসসিনড্রোমে আক্রান্ত। গত বছর তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। কয়েক দিন পর অবস্থা খারাপ হওয়ায় চিকিৎসক হঠাৎ আইসিইউতে স্থানান্তর করতে বলেন। ধানমন্ডির জিগাতলার একটি হাসপাতালে ২ দিন রাখা হয় তাকে, একটু সুস্থ হলে আবার ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। মাঝখানের ২ দিনে ওষুধসহ বিল এসেছে ৬৫ হাজার টাকা। নিকটজনের কাছ থেকে ধারকর্জ করে এ বিল পরিশোধ করেছেন পারভীন।

নির্মাণ শ্রমিক বকুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ভবনের ৭ তলা থেকে পড়ে বুকে ও মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সি থেকে ওইদিন রাতে তাকে ধানমন্ডির মিরপুর রোডের একটি নামকরা বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখানে প্রতিদিন শুধু আইসিইউ ভাড়া দিতে হয় ৩৭ হাজার টাকা, ওষুধপত্রসহ এই বিল দাঁড়ায় ৫৫ হাজার টাকারও বেশি। ১১ দিনে তার বিল আসে প্রায় ১২ লাখ টাকা!

ঢাকা কলেজের স্নাতকোত্তর ছাত্র রবি ধানমন্ডির মিরপুর রোডে মোটরবাইক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। তার মাথার খুলি ও বুকের হাড় ভেঙে যায়। পরে তাকে দ্রুত ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। আইসিইউতে সাত দিন রাখার পর মারা যান তিনি। তখন তার পরিবারকে বিল গুনতে হয় প্রায় ৩ লাখ টাকা।

সরকারি তথ্য যা জানাচ্ছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশের ৪২ জেলার ৭৪টি সরকারি হাসপাতালে বর্তমানে মোট ১ হাজার ৩৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। অর্থাৎ ২২ জেলায় এখনও কোনো আইসিইউ সুবিধা নেই। এ ছাড়া এসব শয্যার মধ্যে ৭৫৮টি (৫৫ শতাংশ) ঢাকাভিত্তিক ২২টি সরকারি হাসপাতালে কেন্দ্রীভূত। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের অধীনে ৪৮ জেলায় সরকারি হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩ জেলায় আইসিইউ সেবা চালু হয়েছিল। জনবল সংকটে কিছু জেলায় আইসিইউ সেবা বন্ধ হয়ে যায়।

ইউএনএফপির চলতি বছরের জুলাই মাসের হিসাব মতে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৭ লাখ। সরকারি আইসিইউ আসন সংখ্যা ১ হাজার ৩৭২টি। অর্থাৎ প্রতি ১২ হাজার ৮০২ লোকের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র একটি সরকারি আইসিইউ আসন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢামেক হাসপাতালে ৬০ শয্যার, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ২৫ শয্যার, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ২০ শয্যার এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০ শয্যার আইসিইউ রয়েছে। সারা দেশ থেকে আগত রোগীদের বড় অংশই আইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হলে এসব সরকারি হাসপাতালে ভিড় করেন। তবে আসন ফাঁকা না পেলে ছোটেন বেসরকারি হাসপাতালে।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যার মূল্য নির্ধারণ করলে, এই সেবা দিতে আমরা চাপে পড়ে যাব। কারণ ওষুধসহ সবকিছুর দাম বাড়ছে। এর চেয়ে সরকার এই শয্যা সংখ্যা বাড়াতে পারে।’

হাসপাতাল টুয়েন্টি সেভেন প্লাসের প্রধান নির্বাহী নাসিম হায়দার বলেন, ‘যারা হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসেন, তারা আমাদের মার্কেটিং টিমের কেউ নন। তারা বাইরের প্রতারক চক্র। এসব অভিযোগ আমাদের ওপর চাপানো ঠিক নয়। আইসিইউতে যা বিল আসে আমরা সেটাই রাখি।’

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আজিজুল হক বলেন, ‘এটা নিয়ে সরকার ও হাসপাতাল মালিকদের সক্রিয় হতে হবে।’ আইসিইউ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ওমর ফারুক বলেন, ‘রোগীদের অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে বিরত রাখলে দৈনিক খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমিত রাখা সম্ভব।’

যা জানাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ শয্যার মূল্য নির্ধারণ করার কোনো পরিকল্পনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেই। এ বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে গেলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘বেসরকারি আইসিইউ শয্যার মূল্য নির্ধারণে আপাতত কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। তবে জনগণের ভোগান্তির তথ্য আমাদের কাছে আসে। এ নিয়ে কাজ করতে একটা আলাদা উইং করার পরিকল্পনা আছে। তবে দ্রুতগতিতে কিছু হবে না। এতে সময় লাগবে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা