মিঠাপুকুর হাসপাতাল
মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৮:৫৬ পিএম
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪ ১৯:০৬ পিএম
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের নিন্মমানের খাবার সরবরাহসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। রোগীদের অভিযোগ, তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হয় না খাবার। যা দেওয়া হয় তা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অস্বীকার করলেও খাবার সরবরাহ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ‘খাবারের জন্য যে বরাদ্দ রয়েছে, তাতে তালিকা মোতাবেক খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত প্রতিদিন একজন রোগীর জন্য বরাদ্দ ১৭৫ টাকা। বরাদ্দে একজন রোগীর জন্য সকালে ২৫০ গ্রাম ওজনের পাউরুটি, একটি কলা, একটি ডিম, ৫০ গ্রাম চিনি দিতে হবে। দুপুরে উন্নতমানের ২৫০ গ্রাম চালের ভাত, ৯৫ গ্রাম মুরগির মাংস (ব্রয়লার) অথবা ১১১ গ্রাম রুই, কাতলা, মৃগেল অথবা সিলভার কার্প মাছ, মশুর ডাল ৫০ গ্রাম, মৌসুমী সবজি ১৫০ গ্রাম দিতে হবে। রাতেও ওই একই রকমের খাবার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া উন্নতমানের খাবারের মধ্যে সকালে ৫০ গ্রাম সেমাই-লাচ্ছা, একটি পাকা কলা, ১০০ গ্রাম আপেল, ৫০ গ্রাম চিনি দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। দুপুরের খাবারে ২০০ গ্রামের পোলাওয়ের চালের ভাত, দেশি মুরগির মাংস ৭৫ গ্রাম, ৪১ গ্রাম খাসির মাংস, ১০০ গ্রাম ওজনের রসগোল্লা দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। রাতেও একই ধরনের খাবার সরবরাহ করার কথা।
দরপত্রের তালিকায় ১১০ টাকা কেজির চিকন চাল, দুধ, ডিম ও ঘিসহ অন্যান্য খাবার দেওয়ার কথাও বলা আছে।
তবে তালিকা অনুযায়ী খাবার পাচ্ছেননা বলে জানান রোগীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি একাধিক রোগী বলেন, হাসপাতালে বেশিরভাগ সময় সিলভার-পাঙাশ মাছ ছাড়া অন্য কোনও মাছ দেয় না। মাংস দেয় ব্রয়লার মুরগীর। যে ভাত দেয় তাতে একজন মানুষের পেট ভরে না। তাছাড়া খাবার একদম নিম্নমানের।
ডায়রিয়ার রোগীদের দেওয়া তথ্যমতে- কমলা, আপেল, ডাব, সবরি কলা দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীরা তা পায় না।
অভিযোগ রয়েছে, আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তার (আরএমও) প্রতিদিন স্বশরীরে রান্না ঘরে এসে খাবারের পরিমাপ ও মান দেখার কথা থাকলেও তিনি তা করেন না। ঠিকাদারের লোকজন খাবার দিয়ে যাওয়ার সময় শুধু আরএমওকে মোবাইলে তা জানানো হয়। এমনকি ঠিকাদারের লোকজন বাজার যে করে দিয়ে যান তা দেখেন কুক মশালচি। পরে তিনি আরএমওকে যা বলেন তিনি তা লিখে নেন। তিনি সরেজমিন কোনো কিছু দেখেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ- সরকারিভাবে রোগীদের উন্নতমানের খাবার বরাদ্দ দেওয়া হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের প্রধান সহকারীর (বড় বাবুর) যোগসাজসে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে একটি সিন্ডিকেট খাবার সরবরাহের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছে। দরপত্রে যত ঠিকাদার অংশগ্রহণ করুক না কেনো কার্যাদেশ পাচ্ছেন একই সিন্ডিকেট। বড় বাবুর যোগসাজশে স্থানীয় এক যুবক অন্যের লাইসেন্স নিয়ে খাবার সরবরাহ কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন।
তারা জানান, শুধু রোগীদের খাবারই নয়, এই ঠিকাদার ও আরএমওর বিরুদ্ধে রোগী ভর্তি না থাকলেও তা রেজিস্ট্রারে ভর্তি দেখিয়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা লোপাট করার অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিন আকর্ষিক পরিদর্শন করা হলে অভিযোগের সত্যতা মিলবে।
তবে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মো. মিজানুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘নিম্নমানের খাবারের ব্যাপারে কোনো রোগী আমাদেরকে অভিযোগ দেয়নি। আমরা প্রতিনিয়ত খাবারের বিষয়টি তদারকি করি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খাবারের জন্য যে বরাদ্দ রয়েছে, তাতে তালিকা মোতাবেক খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বিকাশ চন্দ্র বর্মণ জানান, সরকার সেবা খাতকে জনকল্যাণমূলক করতে নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। হাসপাতালে যারা ভর্তি থাকেন তাদের বেশিরভাগই গরীব রোগী। তাদের চিকিৎসার পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। খাবারের মান নিয়ে রোগীদের অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. রাশেবুল হোসেন বলেন, ‘খাবার বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
হাসপাতালে খাবার সরবরাহে অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন রংপুর সিভিল সার্জন ডা. মোস্তফা জামান চৌধুরী।