সিপাহি বিদ্রোহ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬ ১২:৪৫ পিএম
ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ শুধু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে সেনাদের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছিল না, এটি ছিল রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শোষণ, ধর্মীয় উদ্বেগ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
ইতিহাসের পাতায় এটি কখনও ‘সিপাহি বিদ্রোহ’, কখনও ‘ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
একশ ৬৯ বছর পরও বহু স্মৃতি ও গল্প আজ বিস্মৃত
বিদ্রোহের একশ ৬৯ বছর পরে এসে এখনও এই আন্দোলনের বহু স্মৃতি ও গল্প আজ বিস্মৃত হয়ে আছে।
বিদ্রোহের সূচনা ঘটে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুর সেনানিবাসে।
সেদিন প্রশিক্ষণের সময় এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানান সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে।
অভিযোগ ছিল, ওই কার্তুজে গরু ও শূকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে, যা হিন্দু ও মুসলিম উভয় ধর্মাবলম্বী সৈনিকদের ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত হানে।
গ্রেপ্তারের চেষ্টা হলে মঙ্গল পাণ্ডে ব্রিটিশ অফিসারের ওপর গুলি চালান। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই জমে ওঠা ক্ষোভ বিস্ফোরণের রূপ নিতে শুরু করে।
শুধু কার্তুজ-সংকটই বিদ্রোহের কারণ নয়
তবে ইতিহাসবিদরা বলছেন, শুধু কার্তুজ-সংকটই বিদ্রোহের কারণ ছিল না।
রাজনৈতিক অধিকার হারানো দেশীয় রাজন্যবর্গ, কৃষকের ওপর করের বোঝা, অর্থনৈতিক শোষণ এবং বিদেশি শাসনের প্রতি ঘৃণা—সব মিলিয়ে ব্রিটিশবিরোধী ক্ষোভ তীব্র হয়ে ওঠে।
ইতিহাসবিদ আর সি মজুমদার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণকে বিদ্রোহের প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দিল্লি হয়ে ওঠে বিদ্রোহের কেন্দ্র
১৮৫৭ সালের ১০ মে মিরাটে সেই ক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ নেয়। চর্বিযুক্ত কার্তুজ ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানানোর দায়ে ৮৫ জন সিপাহিকে প্রকাশ্যে অপমান ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর পরদিন সন্ধ্যায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা জেল ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করে দিল্লির দিকে অগ্রসর হয় এবং শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের সম্রাট ঘোষণা করে।
দিল্লি তখন হয়ে ওঠে বিদ্রোহের কেন্দ্র। নানা সাহেব, ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাই, মৌলভি আহমদউল্লাহসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নেতারা এই আন্দোলনে যুক্ত হন।
শুধু সিপাহিরাই নয়, কৃষক ও সাধারণ মানুষও অস্ত্র তুলে নেয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে।
গবেষকদের মতে, মিরাট অঞ্চলের প্রায় ৮৪টি গ্রামের হাজারো কৃষক শাহ মাল নামের এক জমিদারের আহ্বানে বিদ্রোহে অংশ নেন।
মোঘল সম্রাটের দুরদর্শীতায় নস্যাৎ ব্রিটিশ কূটকৌশল
এই বিদ্রোহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য। ১৮৫৭ সালের কোরবানির ঈদের সময় দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করেছিল ব্রিটিশপন্থীরা।
গরু জবাইকে কেন্দ্র করে সংঘাত সৃষ্টি করে বিদ্রোহ দুর্বল করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।
কিন্তু বাহাদুর শাহ জাফর পরিস্থিতি বুঝে ঈদে পশু কোরবানি নিষিদ্ধ করেন।
মুসলমানরাও তখন স্বাধীনতার সংগ্রামকে বড় ত্যাগ হিসেবে গ্রহণ করে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।
ব্রিটিশ কর্মকর্তা কিথ ইয়ং হতাশ হয়ে লিখেছিলেন, “নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা করার বদলে তারা সবাই একসঙ্গে হয়ে আমাদের ওপর ভয়ানক আক্রমণ চালায়।”
প্রথম ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ না কি শুধুই বিদ্রোহ
তবে কিছু ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল মূলত স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ
কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এই ঘটনাকে “ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। জাতীয়তাবাদী লেখক বিনায়ক সাভারকারও একই মত দেন।
তবে কিছু ইতিহাসবিদের মতে, এটি ছিল মূলত স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ; স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তখনও গড়ে ওঠেনি।
বিদ্রোহের আঁচ পৌঁছে বর্তমান বাংলাদেশেও
বিদ্রোহের আঁচ বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডেও পৌঁছেছিল। যদিও উত্তর ভারতের তুলনায় এখানে এর প্রভাব কম ছিল, তবু ঢাকা ও চট্টগ্রামে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে ওঠে।
১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সিপাহিরা জেলখানা ভেঙে বন্দিদের মুক্ত করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন দেয়।
পরে ঢাকার লালবাগ কেল্লায় দেশীয় সৈন্যদের সঙ্গে ব্রিটিশ নৌসেনাদের সংঘর্ষ হয়। এতে বহু সিপাহি নিহত হন।
ইতিহাসের নীরব সাক্ষী ঢাকার ‘গোর-এ শহিদ মাজার’
ঢাকার আজিমপুর-লালবাগ এলাকায় এখনও সেই ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘গোর-এ শহিদ মাজার’।
স্থানীয়ভাবে এটি ‘গোরা শহিদের মাজার’ বা ‘ঘোড়া শহিদের মাজার’ নামেও পরিচিত।
ধারণা করা হয়, ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে নিহত সিপাহিদের একাংশকে এখানে দাফন করা হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ইতিহাস প্রায় বিস্মৃত হয়ে গেছে।
এলাকাবাসীর অনেকেই জানেন না, এটি উপমহাদেশের ‘প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামের’ এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত দমন করা হলেও এটি ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।
একই সঙ্গে ভারতীয়দের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই বিদ্রোহই পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।