× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আহ্‌ ম্যাটারহর্ন

শায়লা বিথী

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৪ ১১:২৪ এএম

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪ ১২:৫০ পিএম

ম্যাটারহর্ন পর্বতের সামনে লেখক ও তার ভ্রমণসঙ্গী।

ম্যাটারহর্ন পর্বতের সামনে লেখক ও তার ভ্রমণসঙ্গী।

ম্যাটারহর্ন, সুইস আল্পসের অন্যতম বিখ্যাত ‘ভয়ংকর সুন্দর’ একটি পর্বত। ভয়ংকর সুন্দর বলার কারণ ১৮৬৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ পর্বতারোহী ম্যাটারহর্নে আরোহণ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা ৪ হাজার ৪৭৮ মিটার বা ১৪ হাজার ৬৯২ ফুট। 

ম্যাটারহর্নের কথা আমি প্রথম শুনি ২০১৫ সালে। সেবার অক্টোবরে নেপালের হিমালয় রেঞ্জের ৬ হাজারি পর্বত ক্যাজুরির বেসক্যাম্প ট্রেকে গিয়েছিলাম। ট্রেইলে দেখা পাই হিমালয়ের অন্যতম প্রেস্টিজিয়াস পর্বত আমাদাবলামের। দেখেই ভয় লাগে, কেমন দুবাহু প্রসারিত করে মাথা টানটান করে দাঁড়িয়ে আছে। গাইড জানাল একে কিন্তু বলা হয় হিমালয়ের ‘ম্যাটারহর্ন’। ম্যাটারহর্ন কী, কোথায় অবস্থিত, দেখতে কেমন- কিছুই জানতাম না। মনে তাই স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল সৃষ্টি হলো। হিমালয়ের ম্যাটারহর্ন এত সুন্দর, না জানি আসল ম্যাটারহর্ন কতই না সুন্দর! সেদিন রুমে ফিরে দ্রুত ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলাম আসল ম্যাটারহর্ন নিয়ে। জানলাম, সুইজারল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্বত এটি, আরও টুকটাক তথ্য। সুইস পর্বত জেনে আগ্রহ কিছুটা উবে গিয়েছিল। কেননা সুইজারল্যান্ডে যাওয়া তখন অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।

ম্যাটারহর্ন, সুইস আল্পসের অন্যতম বিখ্যাত ‘ভয়ংকর সুন্দর’ একটি পর্বত।

অবেশেষে এ বছর ঈদের ছুটিতে সুযোগ এলো ছোট একটা ইউরোপ ট্যুরের। আমি এবং আমার স্বামী যখন ভ্রমণ পরিকল্পনা করছিলাম শুরুতেই সুইজারল্যান্ড বাদ দিয়েছিলাম। কেননা ও দেশে ভ্রমণ খরচ সবচেয়ে বেশি। ওই বাজেটে আমরা ইউরোপের তিনটা দেশ সহজেই ঘুরতে পারব। পরক্ষণেই মনে পড়ল আমাদের একটা বন্ধু রয়েছে সুইজারল্যান্ডে। ওকে নক করতেই জানাল আমরা যেন নির্দ্বিধায় চলে আসি, ও আমাদের সঙ্গ দেবে। কাজেই আর বাড়তি চিন্তা না করে মনস্থির করলাম সুইজারল্যান্ড যাব। আর সেখানে গিয়ে ম্যাটারহর্ন দেখব না তা তো হয় না। 

পরিকল্পনা অনুযায়ী সুইজারল্যান্ডের অল্টেন শহরে আমাদের বন্ধুর বাসায় পৌঁছি ১২ এপ্রিল সন্ধ্যায়। জার্মানির বার্লিন থেকে ট্রেনে করে আমরা আসি সুইজারল্যান্ডের বেসেল শহরে। ওখানে থেকে আমরা অন্য একটা ট্রেন ধরে অল্টেন স্টেশনে আসি। স্টেশনের একদম সঙ্গেই বন্ধুর বাড়ি, এক মিনিটের পথ বলা চলে। 

বাসায় পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে দ্রুত ডাইনিংয়ে গেলাম ডিনারের জন্য। খেতে খেতেই বন্ধু জানাল আগামীকালই আমরা ম্যাটারহর্ন দেখতে যাব। আমার আনন্দ আর কে দেখে! খুশি খুশি মনে খাবার শেষ করে দ্রুতই শুয়ে পড়লাম। কেননা আগামীকাল সারা দিন বাইরে থাকতে হবে। কাজেই পর্যাপ্ত এনার্জি দরকার। ম্যাটারহর্ন সুইস আল্পস পর্বতমালার অন্যতম বিখ্যাত একটি পর্বত। ম্যাটারহর্ন নামটি এসেছে জার্মান থেকে। ইতালিতে পরিচিত ‘মন্টে কার্ভিনো’ নামে। আর ফ্রেঞ্চ নাম ‘মন্ট কার্ভিন’। তবে এর অবস্থান জার্মান কিংবা ফ্রান্সে নয়, ইতালি আর সুইজারল্যান্ডের সীমান্তে। ১৯৯৯ সালে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ব্যবহার করে ম্যাটারহর্নের উচ্চতা পরিমাপ করা হয় ৪ হাজার ৪৭৭ দশমিক ৫৪ মিটার বা ১৪ হাজার ৭৬৯ ফুট। 

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই অসংখ্য পর্বতারোহী এর শীর্ষে আরোহণের চেষ্টা করেন। ১৮৬৫ সালে ১৪ জুলাই প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ পর্বতারোহী এডওয়ার্ড উইমপার ও তার দল ম্যাটারহর্ন আরোহণে সফল হয়। তবে পর্বত থেকে নামার সময় তার দলের চার সদস্য একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। ১৮৬৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ পর্বতারোহী ম্যাটারহর্নে আরোহণ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। তাই পর্বতটিকে আল্পস পর্বতমালার অন্যতম প্রাণঘাতী শৃঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

সকাল ঠিক ৮টা ১ মিনিটে আমাদের ট্রেন। ট্রেনে চেপে বসতেই ছেড়ে দিল। ইউরোপ ঘুরে একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, অধিকাংশ শহরে তেমন মানুষের দেখা বা মানুষদের ব্যস্ততা না দেখতে পেলেও একমাত্র বাস বা ট্রেন স্টেশনেই মানুষের ভিড় দেখা যায়। ট্রেন ছাড়ার অল্প সময়ের মধ্যেই শহরের বাইরে চলে এলাম। বন্ধু বলছিল, সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে ট্রেনে করে ভ্রমণের বিকল্প নেই। আমারও তাই মনে হলো, ট্রেন লাইন চলে গিয়েছে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে বিস্তীর্ণ উপত্যকা দিয়ে, কখনও বা লেকের পাড় দিয়ে যেখানে আকাশের নীল আর প্রকৃতির সবুজ মিলেমিশে একাকার। ট্রেন থেকে যতদূর চোখ যাচ্ছে পাহাড়ি উপত্যকা। ক্রোসান্ট আর কফি খেতে খেতে আমি এসব দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। 

সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীরা কতটা শৌখিন, নৈসর্গিক আর নিরিবিলি জীবন যাপন করে তা নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। পাহাড়ের গায়ে কাঠের ডুপ্লেক্স বাড়ি, তার চারপাশে নানা ধরনের সবজি ও ফলের বাগান। জুকিনি, টমেটো, গাজর, লেটুস, আঙুর, আপেল, কিউইসহ বিভিন্ন পাম ফলের বাগান- কী নেই ওদের! বাড়ির চারপাশে গরু, ‍শূকর ও ভেড়ার ফার্মসহ নানা ধরনের গৃহপালিত পশুপাখির অবাধ বিচরণ। একদম সাদামাটা জীবনযাপন। অথচ এসব বাড়ির মালিকেরা নাকি একেকজন ধনকুবের। সুইসরা প্রকৃতির বিন্দুমাত্র ক্ষতিসাধন না করে পাহাড়ের ঢাল বা আদল অনুযায়ী নিজেদের আবাসস্থল বা জমি চাষ করে। যে কারণে সুইজারল্যান্ড এখনও স্বর্গের ন্যায় সুন্দর।

সুইজারল্যান্ডের অধিবাসীরা নিসর্গে নিরিবিলি জীবনযাপনে অভ্যস্ত

আমাদের গন্তব্য জ্যামার্ট শহর, যেখানে ভয়ংকর সুন্দর ম্যাটারহর্নের অবস্থান। ঘণ্টা তিনেকের পথ। মাঝে আমাদের একবার ট্রেন পরিবর্তন করতে হলো। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ ট্রেনের যাত্রীদের দেখলেই বোঝা যাচ্ছে এরা সবাই পাহাড় দেখতে বা অভিযানে যাচ্ছে। কিছু অভিযাত্রী তো আইসবুট, হেলমেট, স্নোগগলস আর অন্যান্য ট্রেকিং গিয়ার পরে এমনভাবে প্রস্তুত হয়ে এসেছে, ট্রেন থেকে নেমেই যেন পাহাড়চূড়ার উদ্দেশে দৌড়াবে। বন্ধু জানাল, আজ রবিবার ও সুইজারল্যান্ডের সামার শুরু হওয়ায় এবং চমৎকার আবহাওয়ার কারণে এমন ভিড়। ট্রেন থেকেই দেখা যাচ্ছে চমৎকার সব পাহাড়ি হাইকিং ট্রেইল। আর দূরে উঁকি দিচ্ছে শ্বেতশুভ্র সুইস আল্পস। বরফে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। 

জ্যার্মাট শহরে পৌঁছালাম দুপুর ১২টা নাগাদ। ঝকঝকে আবহাওয়া, দারুণ রোদ, কটকটে নীল আকাশ। ট্রেম্পারেচার ১০ ডিগ্রি হলেও রোদের কারণে গরম লাগছিল আমাদের। স্টেশনকে ঘিরেই ছোট্ট জ্যার্মাট শহর। ট্যুরিস্টে ভরপুর হলেও ভীষণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাহাড়ি এ শহর। রয়েছে নানা ধরনের রেস্তোরাঁ, বার, স্যুভেনিয়র শপ, পোশাক, জুতা, সানগ্লাস ও ঘড়ির বড় বড় ব্র্যান্ডের দোকান। কী নেই এ শহরেÑ পাঁচতারকা হোটেল থেকে শুরু করে হোম স্টে সার্ভিস। ক্যাবল কারে চড়ে ম্যাটারহর্ন দেখার সুযোগ, আইস-স্কি, প্যারাগ্লাইডিং, মাউন্টেন বাইকিং, হাইকিংসহ নানা ধরনের পাহাড়ি অ্যাকটিভিটি। ট্রেন থেকে নেমে সোজা ম্যাটারহর্নের দিকে এগোলাম। আমাদের মতো আরও অনেক ট্যুরিস্ট ওই একই পথে যাচ্ছে। সামনে এগোচ্ছি আর একটু করে ধরা দিচ্ছে ম্যাটারহর্নের বরফাচ্ছাদিত চূড়া। আবহাওয়া পরিষ্কার থাকায় একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পিরামিড আকৃতির পর্বতে বরফের ফাঁকে কঠিন কালো পাথর। কেমন রুক্ষ, কিন্তু শীতল একটা অনুভূতি হচ্ছে। অমন ভয়ংকর সৌন্দর্যে যেন চোখ ঝলসে যাচ্ছে! আহ্‌! স্বপ্নের ম্যাটারহর্ন।

ম্যাটারহর্ন পর্বতের সামনে লেখক।

প্রায় ৪৫ মিনিটের মতো হেঁটে একটা চমৎকার ভিউ পয়েন্ট এরিয়া পেলাম। কোনো মানুষও ছিল না সেখানে, তাই আমরা ওখানেই বসলাম। প্রথম ১৫ মিনিট চলল আমাদের মোবাইল ফোনে ছবি তোলার পালা। এরপর এক্সাইটমেন্ট কিছুটা কমলে সবাই স্থির হয়ে ওর দিকে মুখ করে বসলাম। এই ভয়ংকর সুন্দর পর্বত অভিযানে এসেই তো কত অভিযাত্রী মারা গেল। এসব ভাবতে ভাবতে আরও মিনিট ত্রিশেকের মতো সময় অতিবাহিত করলাম। হুট করেই খেয়াল করলাম একটু পাশে পাহাড়ের ঢালে জমে থাকা বরফ। পুরো শীতে এখানে বরফাচ্ছাদিত থাকে, সামার শুরু হওয়ায় ধীরে ধীরে সে বরফ গলতে শুরু করেছে। সেই বরফে গিয়েও চলল আমাদের ছবি তোলা। বন্ধু তাড়া দিচ্ছে, এবার ফিরতে হবে না হলে অন্য একটা শহরে আজ আর যাওয়া হবে না। কী আর করা, উঠতেই হলো আমাদের। ট্রেনে ওঠার আগে ম্যাটারহর্ন দেখতে দেখতে আমরা দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। খানিক সময় বিরতি নিয়ে আবারও ট্রেন ধরলাম। ফিরতি যাত্রায় যতক্ষণ ম্যাটারহর্ন দেখা যাচ্ছে, আমি তাকিয়েই থাকলাম। কিছুটা মন খারাপ হচ্ছে, আরও কিছু সময় থাকতে পারলে ভালো লাগত হয়তো! তাই তো মনে মনে ভাবছি এই পথে আবারও কবে আসব ম্যাটারহর্নকে আরও একটু কাছে থেকে দেখতে! আসব তো, আসতেই হবে। পাহাড়ের ডাক একবার যার কানে পৌঁছায় তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আমি অপেক্ষায়...

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা