জেসমিন ইসলাম জুঁই
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৪ ১৬:২১ পিএম
আনন্দ উৎসবের একটি বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে বিয়ে উৎসব। এর শুরুটা হয় পানচিনি অনুষ্ঠান দিয়ে। এ অনুষ্ঠানের রীতি সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক-
ঢাকা অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের বিয়ের রীতি, যা ‘ঢাকাইয়া বিয়ে’ নামে পরিচিত। পুরান ঢাকায় বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় বিয়ের অনেক দিন আগেই। বরপক্ষ কনেবাড়ি এসে যেদিন প্রস্তাব দেয় সেদিনই মূলত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার শুরু। এটি ‘পানচিনি’ অনুষ্ঠান নামে পরিচিত। এ অনুষ্ঠান পরিচালনায় ঘটক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এরা পেশাজীবী ঘটক। ঢাকাইয়া ভাষায় ঘটককে বলা হয় ‘মোতাসা’। পাত্রপাত্রীর খোঁজ থেকে শুরু করে বিয়ে সম্পন্ন পর্যন্ত অনেক আচার-অনুষ্ঠানে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পানচিনি বা পাকাকথার অনুষ্ঠানে বরকনে উভয় পক্ষের নানা রকম প্রস্তুতি থাকে। এদিন বরপক্ষ কনেকে উপহার দেয়। এর মধ্যে রয়েছে শাড়ি, গহনা বা আংটি। কনেপক্ষ এদিন বরপক্ষের অতিথিদের জন্য বিশেষ আপ্যায়নের আয়োজন করে। বরপক্ষ কনের বাড়ি যাওয়ার সময় অনেক রকমের মিষ্টি ও পানসুপারি নিয়ে যায়। তবে বেশি নেওয়ার ব্যাপারটা সেখানে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। এর পেছনে অবশ্য বিশেষ একটি কারণ রয়েছে। পানচিনি অনুষ্ঠান শেষে কনেপক্ষ তাদের আত্মীয়স্বজনের বাড়ি সেসব মিষ্টি ও পানসুপারি পাঠিয়ে বিয়ের পাকাকথার বিষয়টি সবাইকে জানিয়ে দেয়। একসময় পুরান ঢাকায় পানচিনির অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী ‘মিরাশিন’ গানের আয়োজন করা হতো। এ ধারার গানের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল নারীকণ্ঠ তবে একক কণ্ঠে গান গাওয়া নয়, নারী শিল্পীরা দলবদ্ধ হয়ে সম্মিলিত কণ্ঠে গান করতেন। পূর্ব বাংলার মাঝে একমাত্র ঢাকায়ই মিরাশিনের প্রাচীন ঘরানা ছিল বলে জানা যায়। কালের পরিক্রমায় সেই রেওয়াজ এখন আর নেই। মূলত পানচিনি অনুষ্ঠানেই বিয়ের যাবতীয় কথা পাকা করা হয়। অনুষ্ঠানে আগতদের জন্য মুখরোচক খাবারের আয়োজন থাকে। এ রকম খাদ্যপর্বকে ঢাকাইয়া ভাষায় বলা হয় ‘খাস আপ্যায়ন’। বিয়ের প্রথম থেকে শেষাবধি আত্মীয়স্বজনের অংশগ্রহণ আর গানবাজনার মধ্য দিয়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এটিই বিয়ের মূল আকর্ষণ; যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত রয়েছে।
বিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। এর বিভিন্ন রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠান বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ করেছে। তবে অঞ্চলভেদে এসব রীতিনীতি ও আচার-অনুষ্ঠানে রয়েছে ভিন্নতা। কালের পরিক্রমায় এসব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারাতে বসলেও পুরান ঢাকায় এখনও টিকে আছে। আর পুরান ঢাকার এসব ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছে।