এটিএম আনোয়ারুল কাদির
প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৩:৩০ পিএম
বিমান মল্লিককের নকশায় প্রথম আটটি ডাকটিকিট
১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ নামে আটটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল। এ আটটি ডাকটিকিট বাংলাদেশের প্রতি বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর তাই বাংলাদেশে ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের রেজিস্টার্ড সংগঠন ফিলাটেলিস্টস্ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (পিএবি) ২০০৩ সাল থেকে ২৯ জুলাই তারিখটিকে ‘ডাকটিকিট দিবস’ হিসেবে উদ্যাপন করে আসছে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। দেশে তখন যুদ্ধ চলছে। যোগাযোগব্যবস্থা এক প্রকার বিচ্ছিন্ন। তাই অস্থায়ী সরকার ডাকব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব অনুভব করে কেন্দ্রীয় ডাকঘরসহ বেশকিছু ফিল্ড পোস্ট অফিস স্থাপন করে। সরকার উপলব্ধি করে স্বাধীনতার সপক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির জন্য ডাকটিকিট বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
১৯৭১ সালের এপ্রিলের শেষের দিকে তৎকালীন ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য ও পোস্টমাস্টার জেনারেল জন স্টোনহাউজ অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে বলেন, মুক্তাঞ্চলে চিঠি আদানপ্রদানের জন্য বাংলাদেশ নামে ডাকটিকিট ব্যবহার করা হলে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিশ্বের কাছে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘বাংলাদেশ’ নামে ডাকটিকিট প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২৯ এপ্রিল জন স্টোনহাউজ লন্ডনপ্রবাসী বাঙালি ডিজাইনার বিমান মল্লিককে ডাকটিকিট ডিজাইনের দায়িত্ব প্রদান করেন। বিমান মল্লিক বিনা পারিশ্রমিকে ডিজাইন করার দায়িত্ব নেন। তিনি আটটি ডাকটিকিটের ডিজাইন করলে সেগুলো প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের অনুমোদনও পায়। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই লন্ডনের হাউস অব কমন্সে জন স্টোনহাউজ ও প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য জোর দাবি উত্থাপন করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, জাপানসহ বিশ্বের অনেক দেশ এবং বিদেশে অবস্থানরত ১২২ জন বাঙালি কূটনীতিক পাকিস্তানের আনুগত্য অস্বীকার করে বাংলাদেশের পক্ষে চলে আসেন। এরপর বিমান মল্লিকের ডিজাইন করা আটটি ডাকটিকিট (১০, ২০, ৫০ পয়সা এবং ১, ২, ৩, ৫ ও১০ রুপি মূল্যমানের) একযোগে মুজিবনগর, কলকাতার বাংলাদেশ মিশন ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।
বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তিতে বাংলাদেশ সরকারের স্মারক ডাকটিকিট১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয় এবং সেদিন মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত আটটি ডাকটিকিটের মধ্যে তিনটিতে (১০ পয়সা এবং ৫ ও ১০ রুপি মূল্যমানের) ইংরেজিতে Bangladesh Liberated ও বাংলায় ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ কথাগুলো ওভারপ্রিন্ট করে প্রকাশ করা হয়। আমাদের বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এ পর্যন্ত বিজয় দিবসের ওপর ২৮টি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া ভারত দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীতেই ২০, ৬০ ও ৭৫ পয়সা মূল্যমানের তিনটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডিজাইনার কে জি মুস্তাফা। এরপর ১৯৮২ সালের বিজয় দিবসে প্রকাশিত প্রতিটি ৫০ পয়সা মূল্যের সাতটি স্মারক ডাকটিকিটে স্থান পায় সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর ছবি। ডিজাইনার আহমেদ ফজলুল করিম। দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের রজতজয়ন্তীতে ৪ ও ৬ টাকা মূল্যমানের দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডিজাইনার মোহাম্মদ সামসুজ্জোহা।
২০০১ সালে বিজয়ের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যমানের চারটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডাকটিকিটের নকশায় বীরশ্রেষ্ঠ, বীরউত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক পদকের ছবি স্থান পায়। এ পদকগুলোর নাম শুনলেও অনেকে হয়তো চোখে দেখার সুযোগ পায়নি। ডাকটিকিটগুলোর মাধ্যমে পদকগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে। ডিজাইনার মাহবুব আকন্দ। এর ১০ বছর পর ২০১১ সালে বিজয়ের ৪০ বছরে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়।

২০১৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। নকশায় বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় স্মৃতিসৌধের ছবি স্থান পায়। ডিজাইনার আনোয়ার হোসেন। ২০১৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডাকটিকিটের নকশায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভের সামনে বঙ্গবন্ধুর ছবি স্থান পায়। ডিজাইনার জসিমউদ্দিন। ২০১৫ সালে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডিজাইনার সনজীব কান্তি দাস। ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১৬ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডিজাইনার আনোয়ার হোসেন। ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডিজাইনার সনজীব কান্তি দাস। ২০১৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর ৪৭তম বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডাকটিকিটে বঙ্গবন্ধু ও ওই সময়ে নির্মিতব্য পদ্মা সেতুর ছবি স্থান পায়। ডিজাইনার সনজীব কান্তি দাস। ২০১৯ সালে বিজয় দিবসে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডিজাইনার সনজীব কান্তি দাস। ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডাকটিকিটে পতাকা, মানচিত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় উল্লাসের ছবি স্থান পায়। ডিজাইনার সনজীব কান্তি দাস। ২০২১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ৫০ বছর ও বাংলাদেশে দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ উপলক্ষে প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যমানের দুটি স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। ডাকটিকিটের নকশায় একটিতে বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় উল্লাস এবং অন্যটিতে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের দলিলে পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি ও ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার স্বাক্ষরের ছবি স্থান পায়। ডিজাইনার সনজীব কান্তি দাস। ভারতও বিজয়ের ৫০ বছর উপলক্ষে ৫ রুপি মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। সর্বশেষ ২০২২ সালে বিজয় দিবস উপলক্ষে ১০ টাকা মূল্যমানের স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ পায়। ডিজাইনার সুমন্ত কুমার।
বিজয় দিবসের ডাকটিকিট নকশায় নেই কোনো বৈচিত্র্য। একই ধরনের বিষয় ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত গান, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক, চলচ্চিত্র বা পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয় করে ডাকটিকিট প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।