কঙ্কন সরকার
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:৩৪ পিএম
আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ১২:৩৪ পিএম
আলী আমজদের ঘড়িঘরের বয়স হয়েছে ১৪৫ বছর
‘চাঁদনী ঘাটের সিঁড়ি/ আলী আমজদের ঘড়ি/ জিতু মিয়ার বাড়ি/ বঙ্কু বাবুর দাড়ি।’ প্রচলিত এ পঙ্ক্তির মাধ্যমে সিলেটের চারটি ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে জানা যায়, বঙ্কু বাবু জীবিত নেই, তবে বাকি তিনটি ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে। এর মধ্যে আলী আমজদের ঘড়ি একটি।
সুদৃশ্য আধুনিক স্থাপনার টার্মিনালে বাস থেকে নেমে ভাবছি সময়টা শাহজালালের মাজারে কাটাব। যে ভাবা সেই কাজ। লোককে জিজ্ঞাসা করতেই বলল- একটু হাঁটলেই ক্বিন ব্রিজ। আর সেখান থেকেই সিএনজি পাবেন মাজারের। কিন্তু ক্বিন ব্রিজের এত কাছেই যে ঘড়ির অবস্থান, তা অনুমানে ছিল না। চোখে পড়ল লালরঙা উঁচু ঘরটি। সেখানে আঁটা বড় আকারের ঘড়িটা। থেমে চেয়ে চেয়ে দেখি এপাশে-ওপাশে ঘুরে ঘুরে। জানা যায়, ঘড়িঘরের বয়স হয়েছে ১৪৫ বছর। মাঝেমধ্যে ঘড়িটি বিকল থাকলেও তা পুনরায় সচল করা হয়েছে। তবে আমি জানতাম আলী আমজাদের ঘড়ি, কিন্তু সঠিকটা হবে- আলী আমজদের ঘড়ি।
এটি একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। যারা সিলেট ভ্রমণে আসে , তারা এটিকেও দেখতে আসে একনজর। শুনেছি মাঝেমধ্যেই নাকি ঘড়ির কাঁটা দিনের পর দিন থমকে থাকে। আর এ ঘড়িঘরের আশপাশে পড়ে থাকা নোংরা আবর্জনা চোখে পড়ল। এক পাশে বাস রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তা নাকি প্রায়ই থাকে। পাশেই বয়ে চলেছে সুরমা নদী। তার পাড় বাঁধা হয়েছে মানুষের বসা, হাঁটা-চলার জন্য। সেখানে চাওয়ালা, চানাচুরওয়ালা ও বিভিন্ন পণ্যের হকারকেও দেখলাম। পাশে অবস্থিত সার্কিট হাউস। ঘড়িটির অবস্থান নাকি শহরের প্রবেশমুখে। দাঁড়িয়ে আছে এটি ১৮৭৪ সাল থেকে। কৌতূহলে জানতে চাইলাম- এ ঘড়ির স্থাপনের ঘটনা। জানলামÑ ওই বছর নাকি তৎকালীন বড়লাট লর্ড নর্থব্রুক সিলেট সফরে এসেছিলেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান ঘড়িটি নির্মাণ করেন। নামকরণ করেন নিজের ছেলে আলী আমজদ খানের নামে। তিনি ভারতের দিল্লির চাঁদনি চক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ঘড়িটি স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন।
ঘড়িটি দেখভাল করার দায়িত্বে আছে সিলেট সিটি করপোরেশন। আলী আমজদের ঘড়ির দৈর্ঘ্য ৯ ফুট ৮ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৮ ফুট ১০ ইঞ্চি। নিচ থেকে ছাদ পর্যন্ত উচ্চতা ১৩ ফুট, ছাদ থেকে ঘড়ি অংশের উচ্চতা ৭ ফুট, ঘড়ির ওপরের অংশের উচ্চতা ৬ ফুট। মোট উচ্চতা ২৬ ফুট। ঘড়িটির ডায়ামিটার আড়াই ফুট এবং ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা।
লোহার খুঁটির ওপর ঢেউটিন দিয়ে সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির এই ঘড়ি। নান্দনিক স্থাপনাময় ঘড়িটি সিলেটের প্রতীক হিসেবে এখন দেশ-বিদেশে সুপরিচিত। তবে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা ঘড়িটি বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। কেননা বাঙালির ভালো কিছু তারা পছন্দ করতে পারত না। মুক্তিযুদ্ধের পর কিছুসংখ্যক প্রবাসী, আরও পরে তৎকালীন সিলেট পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বিধ্বস্ত ঘড়িটিকে সচল করতে উদ্যোগী হয়। পরে বারকয়েক সংস্কার করা হলেও নানা সময়ে ঘড়িটি অচল হয়ে পড়ত। ২০১৬ সালে সিটি করপোরেশন ঘড়িটি পুনরায় সচল করে। তবে কোনো সময় ঘড়িটির সমস্যা হলেও সচল থেকে জানান দেয়- আমি আছি।