বিশ্ব মেনোপজ দিবস
আসমাউল হুসনা
প্রকাশ : ১৮ অক্টোবর ২০২৩ ১৩:২০ পিএম
দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ নারী। যাদের মধ্যে মধ্যবয়সি নারীর সংখ্যাও কম নয়। এই বয়সে এসে তাদের ‘ মেনোপজ’ নামক শারীরিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এ সময় দেখা দেয় বিভিন্ন মানসিক সমস্যা। আজ ১৮ অক্টোবর বিশ্ব মেনোপজ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে মেনোপজের নানা দিক ও সুস্থতার বিষয়ে বিশেষ লেখা...
নাজমা আক্তার, বয়স ৫০ বছর। হঠাৎই লক্ষ করেন ইদানীং পিরিয়ড অনিয়মিত হচ্ছে। এ ছাড়া শারীরিক কিছু পরিবর্তনও ঘটছে। একই সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড গরম, আবার কখনও খুবই ক্লান্ত বোধ করছেন। ছোট ছোট বিষয় নিয়ে প্রচণ্ড রেগে যাচ্ছেন। এ কারণে স্বামী-সন্তানসহ পরিবারের সবার সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ছে। উদ্বিগ্ন নাজমা আক্তার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে জানতে পারেন, তার মেনোপজ শুরু হয়েছে।
নারীজীবনের বিভিন্ন অংশে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন আসে। যেমন শৈশব থেকে কিশোরে পদার্পণ করলে পিরিয়ড শুরু হয়। প্রতি ২৮ দিন অন্তর পিরিয়ড শুরু হয় এবং তিন থেকে সাত দিন স্থায়ী হয়। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় এ ধারা চলমান থাকে। তবে একজন নারী যখন ৪৫-৫৫ বছরে পৌঁছায় তখন আবার হরমোনালজনিত পরিবর্তনের কারণে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়। একেই মেনোপজ বলা হয়। আমাদের দেশে অনেক নারীরই মেনোপজ নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই। এমনকি এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনায়ও আছে তাদের অনাগ্রহ।

রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় থাকেন আয়েশা বেগম। দুই সন্তান ও স্বামী নিয়ে তার সংসার। বর্তমান বয়স ৫৬। তার মেনোপজ শুরু হয়েছে আরও তিন বছর আগে। মেনোপজ নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই মুখে লজ্জা ও বিড়ম্বনার ছাপ স্পষ্ট হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশ দেখে নিলেন। আশপাশে কেউ না থাকায় যেন স্বস্তি বোধ করলেন। এরপর জানান, মেনোপজ শুরু হওয়ার আগে থেকেই ঋতুস্রাব অনিয়মিত হতে শুরু করে। বাড়িতে বয়সে বড় কোনো মহিলা সদস্য না থাকায় কারও সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেননি। তখন থেকেই ভীষণ দুর্বল অনুভূত হয়। ভাবতেন বাচ্চা জন্মদান ও বয়সের কারণেই হয়তো এমন লাগছে। শারীরিক সম্পর্কেও অনীহা আসতে লাগল। ছেলেমেয়েদের ওপর অল্পতেই রাগ হতো। এতে স্বামী-সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটল। একটা সময় ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যায় এটা আগে থেকেই জানা ছিল তার, তবে এতটা শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হবে বুঝতে পারেননি।
মেনোপজ মূলত কী?
ঋতুচক্র বা পিরিয়ড একটানা ১২ মাসের বেশি বন্ধ থাকলেই তাকে মেনোপজ বলে। বয়ঃসন্ধিকালে একটি সময়ে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া যেমন স্বাভাবিক তেমন পরিণত বয়সে ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়াও স্বাভাবিক বিষয়।
মেনোপজ কখন হয়?
সাধারণত ৪৫-৫৫ বছর বয়সের মধ্যে মেনোপজ শুরু হয়। তবে মেনোপজের গড় বয়স ৫১।
মেনোপজের লক্ষণসমূহ
- ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- হাড়ক্ষয়।
- ওজন বৃদ্ধি।
- হঠাৎ শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া।
- স্তন বড় হওয়া ও ব্যথা অনুভূত হওয়া।
- স্মরণশক্তি ও মনোযোগের অভাব হওয়া। সঙ্গে মাথাব্যথা হতে পারে।
- সন্তানধারণ ক্ষমতা হ্রাস।
- শারীরিক সম্পর্কে অনাগ্রহ।
- প্রস্রাবে নিয়ন্ত্রণ হারানো।
- রক্তে চর্বির (cholesterol) পরিমাণ বেড়ে গিয়ে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ দেখা দেওয়া।
- চুল পড়া।
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
সব নারীর ক্ষেত্রে মেনোপজের একই রকম লক্ষণ প্রকাশ না পেলেও কিছু কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়।

মেনোপজ হলে যা করবেন
মেনোপজের সময়টিতে স্বাভাবিক থাকতে প্রয়োজন স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন।
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, সপ্তাহের পাঁচ দিন অন্তত ৩০ মিনিট করে হাঁটতে হবে।
- সহজপাচ্য খাদ্যাভ্যাস তৈরি করতে হবে। লবণ, চিনি ও আমিষের পরিমাণ কমিয়ে সবুজ শাকসবজি, দুধ, দই, ছোট মাছ, তরল খাবারসহ ক্যালসিয়াম জাতীয় খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
- রাতে ৬ ঘণ্টা ঘুম ও সারা দিনের কাজের ফাঁকে বিশেষ করে দুপুরের সময় বিশ্রাম নিতে হবে।
- বছরে একবার ডাক্তার ও চেকআপ বিশেষ করে স্তন, জরায়ু, হাড়সহ রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ পরীক্ষা করতে হবে।
৩০ বছর বয়সের পরই এমন প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলে মেনোপজের কষ্ট অনেকটাই কমে আসে।
প্রতিকার
মেনোপজ শারীরের একটি আবশ্যিক প্রক্রিয়া। ফলে এর কোনো প্রতিকার নেই। তবে বহির্বিশ্বে হরমোন থেরাপি বেশ জনপ্রিয়। আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাকটিভ মেডিসিনের গবেষকদের এক গবেষণায় উঠে এসেছেÑ এর মাধ্যমে দেহে হরমোন সরবরাহ হয় এবং পুনরায় ঋতুস্রাব শুরু হয়।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষকরা টানা ১৪ বছর দুই ধরনের নারীর ওপর সমীক্ষা চালিয়েছেন। একদল যারা মেনোপজের পরে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করেছেন আর অন্য দল যারা সেটা করেননি। প্রতি বছর নিয়ম করে তাদের যাবতীয় শারীরিক পরীক্ষার পর দেখা যায়, যারা থেরাপি করিয়েছেন তাদের শারীরিক অবস্থা অন্য দলের চেয়ে তুলনামূলক ভালো। তারা মেনোপজ-পরবর্তী জটিলতাগুলো সহজেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। হরমোন থেরাপির বিপক্ষে থাকা দলটির যুক্তি ছিল, থেরাপির জন্য হার্টের সমস্যা, স্তন বা ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে। যদিও সেই আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দিয়েছেন গবেষক দলের সদস্যরা।
কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ এবং সার্জন অধ্যাপক ডা. রাশিদা খানমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের নারীরা মেনোপজের পরও গড়ে আরও ২০ বছর বেঁচে থাকেন। এ ২০ বছরে তাদের শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। বয়সের ছাপ পড়ে যায় মুখে। আমাদের দেশের অধিকাংশ নারী ঘরকুনো স্বভাবের হওয়ায় তাদের মধ্যে শারীরিক দুর্বলতাটা একটু বেশিই দেখা যায়। এ ছাড়া সুষম খাবার গ্রহণেও থাকে উদাসীনতা। ফলে দ্রুতই হাড়ের ক্ষয় ও হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতে মানসিকভাবে দৃঢ় এবং খাদ্যাভ্যাসের ওপর জোর দিতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে।’

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, ‘মেনোপজ একটি হরমোনজনিত শারীরিক পরিবর্তন। এটি খুবই সাধারণ বিষয়। তবে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও পরিবর্তন হয় এ সময়। সঠিক তথ্য না জানার কারণে অনেকেই বিষয়টি মেনে নিতে বা মানিয়ে নিতে পারেন না। শারীরিক পরিবর্তন ঘটার জন্য নিজেকে অকেজো ভাবতে শুরু করেন অনেকেই। ফলে দেখা দেয় হতাশা ও হীনমন্যতা।’
এ সময় আরও যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, সে বিষয় নিয়েও কথা বলেন এই মনোবিদ। যার মধ্যে রয়েছে-
বিষণ্নতা : মেনোপজ-পরবর্তী শারীরিক পরিবর্তনের জন্য অনেকে ভাবেনÑ এই বুঝি জীবন শেষ। এ ধারণার কারণে ভেতর থেকে বুড়িয়ে যান নারীরা। খাওয়াদাওয়া ও কাজকর্মে অনাগ্রহ চলে আসে। ভয় ও আতঙ্কের কারণে বিষণ্নতার সৃষ্টি হয়।
হীনম্মন্যতা : সাধারণত এ সময় ডিম্বাশয় থেকে নিঃসৃত হরমোন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন নারীদের ত্বক, চুল, যৌন আকাঙ্ক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু এমনটা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। এ ছাড়া ওজন বেড়ে যাওয়া, চুল পড়া, ত্বকের সমস্যা দেখা দেয়। এসব পরিবর্তন সবার পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। তখন অনেকেই ভুগতে থাকেন হীনমন্যতায়। কোনো কারণ ছাড়াই নিজেকে সব বিষয়ে দোষারোপ করতে থাকার প্রবণতা বেড়ে যায় এবং অন্য নারীদের সঙ্গে নিজের তুলনা করতে থাকে।
উদ্বেগ ও অস্থিরতা : মেনোপজ ঘিরে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ ও অস্থিরতা কাজ করে। এতে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।
খিটখিটে মেজাজ : হতাশা, হীনমন্যতা, উদ্বেগ থেকেই মেজাজ হয়ে ওঠে খিটখিটে। এ সময় অনেকেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান। ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ার ফলে আয়রনের ঘাটতি থেকে মুড সুইং শুরু হয়।
ইনসমনিয়া : দুশ্চিন্তার মাত্রা বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে খাবার ও ঘুমের পরিমাণ কমতে থাকে। একটা সময় রাতের পর রাত ঘুম আসে না, ফলে তারা ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত হন।
আজ ১৮ অক্টোবর বিশ্ব মেনোপজ দিবস। আন্তর্জাতিক মেনোপজ সোসাইটি (আইএমএস) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ২০০৯ সালে এ দিনটিকে বিশ্ব মেনোপজ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। নারীদের মেনোপজ সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে এবং তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সুস্থতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর এ দিনটি পালিত হয়।