× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

লাশগুলো যখন অজ্ঞাতনামা

আব্দুল্লাহ আল মামুন

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০৮ পিএম

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৩ ১৪:০৯ পিএম

উদ্বেগজনকভাবে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার বৃদ্ধি পেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন নির্বিকার

উদ্বেগজনকভাবে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার বৃদ্ধি পেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন নির্বিকার

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাতনামা লাশ। প্রতিদিন এমন সংবাদ ছাপা হয়। বিভিন্ন বয়সি নারী-পুরুষের পাশাপাশি বৃদ্ধ ও শিশুর পরিচয়হীন লাশ বাড়াচ্ছে আতঙ্ক। কেন বাড়ছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা- এ বিষয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, উত্তর তেমন নেই।


শিরোনাম-১।। আনোয়ারায় সাঙ্গু নদ থেকে অজ্ঞাতনামা যুবকের লাশ উদ্ধার

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সাঙ্গু নদ থেকে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১১ আগস্ট শুক্রবার সকালে উপজেলার জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের নদের চর থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আনোয়ারা থানার ওসি সোহেল আহমেদ। এ ব্যাপারে থানায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। জানা যায়, আনোয়ারার সাঙ্গু নদের উপকূলে এক ব্যক্তির লাশ স্থানীয়রা দেখতে পায়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পুলিশের ধারণা, কয়েক দিন আগে ওই যুবকের মৃত্যু হতে পারে।

শিরোনাম-২ ।। টাঙ্গাইলের মধুপুরে হাত-পাবিহীন অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার

টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চল থেকে অজ্ঞাতনামা এক যুবকের হাত-পাবিহীন লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার দুপুরে বেরীবাইদ ইউনিয়নের পচারচনা এলাকার গজারিবন থেকে এ লাশ উদ্ধার করা হয়। মধুপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফখরুল ইসলাম জানান, পচারচনা বন থেকে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহে পচন ধরেছে। দেহ থেকে মাংসহীন বিচ্ছিন্ন মাথার খুলি কয়েক হাত দূরে পড়ে ছিল। হাত-পায়ের সন্ধান বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, কিছুদিন আগে এ লাশটি ফেলে রেখে গেছে দুর্বৃত্তরা। হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ শিয়াল-কুকুরে খেয়ে ফেলেছে।

শিরোনাম-৩।। জগন্নাথপুরের নলুয়া হাওর থেকে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়া হাওরে ভাসমান অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ। ২৫ জুলাই মঙ্গলবার নলুয়ার হাওরে লাশটি ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেয় স্থানীয়রা। পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। স্থানীয়রা জানায়, জগন্নাথপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খালিকনগর এলাকার নলজুর নদের পাশে নলুয়া হাওরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ ভাসতে দেখা যায়। লাশটি প্রায় অর্ধগলিত তাই পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। জগন্নাথপুর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, লাশটি একজন পুরুষের। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


কোনো ব্যক্তির নাম-পরিচয় যখন অজানা থাকে, তখন তাকে বলা হয় অজ্ঞাতনামা। আর পরিচয়হীন মৃত ব্যক্তি হয়ে যায় ‘অজ্ঞাতনামা লাশ’। নামহীন, পরিচয়হীন এ মানুষগুলোর বাড়ি কোথায়, কারা তার পরিবার- এ বিষয় অজানাই থেকে যায় অধিকাংশ সময়। এমনকি কেন বা কীভাবে মারা গেছে, সে খবরও পাওয়া না। অজ্ঞাতনামা হিসেবেই তাদের দাফন হয়, কখনও কখনও পরিচয় শনাক্ত হয় লাশগুলোর, কারও কারও ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত শেষে অপেক্ষা করা হয় স্বজনের জন্য।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাতনামা লাশ। পত্রিকার পাতায় প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় এমন শিরোনাম। অধিকাংশ সময় হত্যার শিকার হয়ে থাকে তারা। লাশ গোপনের উদ্দেশ্যে অপরাধীরা দূরে কোথাও নদী, নালা, ডোবা, ঝোপ বা জঙ্গলে, মহাসড়ক ও রেললাইনের পাশে ফেলে আসে। উদ্বেগজনকভাবে এ হত্যাকাণ্ড এবং অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার বৃদ্ধি পেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন নির্বিকার।

মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই- এ সাত মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা বয়সি অজ্ঞাতনামা ১৮৫ নারী-পুরুষ-শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের শেষ চার মাসে ৫১ অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এমএসএফ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের এ প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। এসব ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারকেই এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নির্বিকার। শুধু অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে এমন তথ্য জানিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। এসব ঘটনায় জড়িতরা যত ক্ষমতাবানই হোক, সব অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অজ্ঞাতনামা ৩১ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। যাদের মধ্যে ছিল আট নারী ও ২৩ পুরুষ। এসব অজ্ঞাতনামার বেশির ভাগ নদী বা ডোবায় ভাসমান, বস্তাবন্দি, মহাসড়কের পাশে, রেললাইনের পাশে, গলায় গামছা প্যাঁচানো, জঙ্গল, বিল বা ফসলি ক্ষেতে রশি দিয়ে হাত-পা বাঁধা ও হাতকড়া পরা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ১৫-তে। যার মধ্যে তিন নারী ও ১২ পুরুষ। মৃতদের বয়স ২৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। মার্চে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উদ্ধার হয়েছে অজ্ঞাতনামা ছয় নারী ও ২১ পুরুষের লাশ; যাদের বয়স ছিল ২৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। এপ্রিলেও উদ্ধার হয়েছে অজ্ঞাতনামা ২৩ লাশ। যার মধ্যে এক শিশু, এক কিশোর, তিন নারী, দুই বৃদ্ধ, পাঁচ মাঝবয়সি ও ১১ যুবক। মে মাসে এ সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২৬-এ। যার মধ্যে ছিল এক শিশু, সাত নারী ও ১৮ পুরুষ। মৃতের মধ্যে ১৫ বছরের শিশু একজন, কিশোরী তিনজন, যুবক আটজন, ৪০-৫০ বছর বয়সের ১১ জন ও ৫০-ঊর্ধ্ব তিনজন রয়েছে। জুনে দুই কিশোর, ১১ নারী, তিন বৃদ্ধ, দুই মাঝবয়সি ও ১১ যুবক- এ ২৯ জনের অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে।

সর্বশেষ জুলাইয়ে উদ্ধার হয়েছে সর্বাধিক অজ্ঞাতনামা লাশ। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এক কিশোর, ১০ নারী, ২০ যুবক ও তিন বৃদ্ধ- এ মোট ৩৪ জনের নাম-পরিচয়হীন লাশ উদ্ধার হয়েছে। মৃতের মধ্যে ১৫ বছরের এক কিশোর, নারীদের বয়স ২৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে, যুবকদের সবার বয়স ২২ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে ও চার বৃদ্ধের বয়স ৫৫-এর ঊর্ধ্বে।


উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা এ লাশগুলোর মধ্যে ১৩১ পুরুষ, ৪৮ নারী ও শিশু-কিশোর রয়েছে ছয়জন।

অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের বিষয়ে কথা হয় মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাঈদুর রহমানের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একটা দেশ ক্রমাগত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হচ্ছে। মানুষের মনে তৈরি হয়েছে দারুণ নিরাপত্তাহীনতা। ডোবার ধারে লাশ, রাস্তার পাশে লাশ, ঝোপঝাড়ে লাশ। এ লাশ নিয়ে কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায় না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। এ নিয়ে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও চোখে পড়ে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এ প্রশ্ন জেগেছেÑ অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার কেন বেশি হচ্ছে।’

অজ্ঞাতনামা লাশ বৃদ্ধির কারণ এবং এ বিষয়ে সংগঠনটির কর্মপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গে এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘আমরা সচেতনভাবে দেখছি, যখন বিচারবহির্ভূত হত্যা কমে গেল তখন থেকে অজ্ঞাতনামা লাশ পাওয়া বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিষয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। যদিও কোনো সমাধানে এখনও আসা সম্ভব হয়নি। আমরা খোঁজার চেষ্টা করেছি, অজ্ঞাতনামা এই লাশের দাবিদার আসলে কারা। এ বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দিতে চায় না। আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করা হলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অজ্ঞাতনামা লাশের বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না। যদি কোনো আত্মীয়স্বজন পাওয়া যায় তবে লাশ দিয়ে দেওয়া হয়, নয়তো অজ্ঞাতনামা হিসেবেই দাফন হয়। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে আমরা ১০টি জেলায় সরাসরি কাজ করে থাকি। এসব এলাকায় কোনো অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হলে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংয়ের চেষ্টা করব। তবে এখন পর্যন্ত আমাদের কর্ম এলাকায় এমন কোনো লাশ উদ্ধার হয়নি। যদি উদ্ধার হয়ে থাকে, তবে আমরা জোরালোভাবেই এ বিষয়ে কাজ করব আগামী দিনগুলোয়।’

নাম না জানা যে মানুষটি মারা যাচ্ছে অন্যের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে, সেই মানুষটির পরিবার তার লাশের খবর কখনও পায়, কখনও পায় না। লাশ পেলে ভালো, এরপর মামলা হয়। কিন্তু তদন্ত কতদূর এগোয় সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ বিষয়। কিংবা নিখোঁজ হয়েই থেকে যেতে হয় তাকে আজীবন। মৃত মানুষটির স্বজনরা আশায় বুক বাঁধে কখনও কখনও। হাসপাতাল, থানা বা মর্গের বারান্দায় দিন, মাস, বছর কাটিয়ে ভুলে যেত চায় আপনজনকে। কোথাও কোনো অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হলে ছুটে যায়, এই বুঝি পাওয়া গেল হারানো মানুষটিকে। এই মানুষগুলোর দিন কাটে কান্না আর হাহাকারে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা