সেলাই মেশিন
আহমাদ শামীম
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৩ ১২:৫৯ পিএম
আপডেট : ১২ আগস্ট ২০২৩ ১৩:০২ পিএম
সেলাই মেশিন আবিস্কার বদলে দিয়েছিল সমাজকে
পৃথিবী বদলে দেওয়া আবিষ্কারের তালিকায় প্রথম দিকেই থাকবে সেলাই মেশিন। শত বছরের সাধনায় একাধিক মানুষের প্রচেষ্টায় পাওয়া সেলাই মেশিন পৃথিবীজুড়ে শুধু বাণিজ্যিক পরিবর্তনের ডাকই দেয়নি, বদলে দিয়েছিল সমাজকেও। এ যন্ত্র আবিষ্কারের গল্প এবং অন্য নানা দিক নিয়ে বিশেষ লেখা...
শুরুর কথা
নব্বইয়ের দশকের কথা। উত্তরার দক্ষিণখান এলাকার কসাইবাজারে রাস্তার ধারে মাচার মতোন ঘরে বসতেন একজন দর্জি। মোল্লা নামেই তাকে চিনত সবাই। ষাটোর্ধ্ব, মোটা কাচের চশমা আর কাঁচাপাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ির শ্যাম বর্ণের এই মানুষটি সব ধরনের পোশাক সেলাই করতেন। কালো রঙের একটা সিঙ্গার মেশিনে পায়ের চাপে প্রায় সারা দিনই সেলাই করতে থাকতেন। এ ছাড়া আম্মাকে দেখতাম বাসার সেলাই মেশিনে সময় পেলেই এটা-সেটা সেলাই করতে।
ওই সময় প্রায় সবার বাসায়ই দেখা যেত সেলাই মেশিন; কাজ হোক বা না হোক, মধ্যবিত্ত সমাজব্যবস্থায় ঘরে সেলাই মেশিন থাকাটাই যেন জরুরি। প্রশ্ন কি জাগে না, সেলাই মেশিন আবিষ্কারের আগে কীভাবে হতো সেলাই, কীভাবে তৈরি হতো পোশাক। কিংবা সেলাই মেশিন আবিষ্কারের ফলে কীভাবে বদলে গেল পৃথিবী। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আজকের লেখার অবতারণা।
সেলাই এবং আজকের বাংলাদেশ
আমাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির আজকের উত্থানের পেছনে আছে তৈরি পোশাকশিল্পের দারুণ অবদান। বিদেশিদের চাহিদার নানাবিধ কাপড় সেলাই করে যেমন লাভবান হচ্ছে দেশ ও বিনিয়োগকারীরা, তেমনি এ শিল্প স্বাবলম্বী করেছে, সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে দেশের লাখো মানুষকে।

এ শিল্পে সরাসরি নিয়োজিত আছে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক, পরোক্ষভাবে জড়িত আরও ১০ লাখ। এ ছাড়া বিভিন্নভাবে যুক্ত আছে আরও অগণিত মানুষ। দেশের জিডিপিতে তৈরি পোশাকশিল্পের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ এবং রপ্তানি আয়ের দিক থেকে সেটা দাঁড়ায় ৮১ শতাংশ। এত এত অবদান যে শিল্পের, তার উত্থান এবং অবদানের পেছনে যে যন্ত্রটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে তা হচ্ছে ‘সুইং মেশিন’ বা সেলাই মেশিন।
ইতিহাসের পথরেখা
আজ থেকে প্রায় ২০ হাজার বছর আগের মানুষের হাতেও সেলাইয়ের তথ্য পাওয়া যায়। সুঁই হিসেবে তারা ব্যবহার করত প্রাণীর হাড় কিংবা শিং; আর সুতা হিসেবে ব্যবহার হতো প্রাণীর পেশির তন্তু। পরে মানুষের আকাশসম আগ্রহ এবং প্রচেষ্টার বদৌলতে সেলাইশিল্প এগিয়ে গেছে সময়ের হাত ধরে।
১৮ শতকের শিল্পবিপ্লবে মানুষ দেখেছে কীভাবে বদলে যাচ্ছে প্রচলিত সব ধারা ও ধারণা। সময়ের ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকজনের আপ্রাণ চেষ্টায় মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তার ফলে আবিষ্কার হয় সেলাই মেশিনের; যা ইতিহাস, সমাজ, সময় ও সভ্যতা বদলে দিয়েছিল চূড়ান্তভাবে।
যাদের হাত ধরে এসেছে সেলাইযন্ত্র
সেলাই মেশিন তৈরির প্রচেষ্টায় ১৭৫৫ সালে চার্লস উইসেন্থাল নামে এক জার্মান ভদ্রলোক মেশিনে ব্যবহারযোগ্য একটি সুঁইয়ের পেটেন্ট লাভ করেন। সেলাই মেশিনের ইতিহাসে এ আবিষ্কার প্রথম পেটেন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে অবাক করার মতো তথ্য হচ্ছে, উইসেন্থালের মেশিনে ব্যবহারযোগ্য সুঁই এ পেটেন্ট পেলেও তখন পর্যন্ত সেলাই করার কোনো মেশিন কিন্তু আবিষ্কৃত হয়নি!
এ ঘটনার প্রায় ৩৫ বছর পর ১৭৯০ সাল নাগাদ ব্রিটিশ নাগরিক থমাস সেইন্ট সেলাই মেশিনের প্রথম নকশা প্রণয়ন করেন। ‘চামড়া ও ক্যানভাস সেলাইয়ের জন্য হাত দ্বারা পরিচালিত এবং হাতলওয়ালা’ একটি মেশিনের পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। যদিও তিনি এ যন্ত্রটির কোনো মডেল তৈরি করেছিলেন কি না জানা যায় না। ১৮৭৪ সালে উইলিয়াম নিউটন উইলসন নামে একজন সেইন্টের নকশাটি পুনরুদ্ধার করে একটি মডেল তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন সেলাই মেশিন আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দেন।
থমাস সেইন্টের নকশার প্রায় ৪০ বছর পর ১৮৩০ সালে বার্থেলেমি থিমোনিয়ার নামে এক ফরাসির হাত ধরে প্রথম কার্যকর সেলাই মেশিনের দেখা মেলে। বার্থেলেমি পেশায় ছিলেন দর্জি। ফলে এ আবিষ্কারের পর পেটেন্ট নিয়েই তিনি বিশ্বের প্রথম মেশিনভিত্তিক পোশাক প্রস্তুতের একটি সেলাই কারখানা খুলে বসেন। প্রাথমিকভাবে ফরাসি সেনাদের পোশাক তৈরির কাজও পেয়ে যান। কিন্তু সে সময় ফ্রান্সের এ পেশায় নিযুক্তরা বার্থেলেমির আবিষ্কারে নিজেদের বেকার হয়ে যাওয়ার ভয় থেকে প্রতিবাদ শুরু করেন এবং একদিন ক্ষিপ্ত কিছু মানুষ তাঁর কারখানায় আগুন ধরিয়ে দেন। সে-যাত্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরে বার্থেলেমি মেশিনের মাধ্যমে সেলাইয়ের কাজই ছেড়ে দেন!

এ ঘটনার চার বছর পর আটলান্টিকের অন্য পাড়ের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াল্টার হান্ট নামে এক আবিষ্কারক একটি কার্যকর সেলাই মেশিন তৈরি করেন। কিন্তু তাঁর মেশিন সহজলভ্য হলে সেলাইশিল্পে জড়িত হাজারো মানুষ বেকার হয়ে যাবে, এমন ভাবনা থেকে হান্ট তাঁর মেশিনের নকশার পেটেন্ট করাননি শেষ পর্যন্ত।
১৮৪৪ সাল নাগাদ ইংরেজ ভদ্রলোক জন ফিশার এ পর্যন্ত সেলাই মেশিন আবিষ্কারের সব ধরনের চেষ্টার মধ্যে একটা মেলবন্ধন তৈরির প্রয়াস চালান। যথাযথভাবে সেলাই সম্পাদন করে এমন একটি মেশিনের নকশা করেন তিনি। কিন্তু কোনো এক দৈব কারণে তাঁর নকশার পেটেন্ট পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
১৮৪৫ সালে মার্কিন মুলুকের এলায়েস হাও জন ফিশারের নকশার কিঞ্চিৎ পরিবর্তন এনে তৈরি করেন নতুন এক যন্ত্র। তিনি সেলাইয়ের এ মেশিনে এতদিনকার সব ধারণাই বদলে দেন। এলায়েস হাওয়ের এ মেশিনে সেলাইয়ে ব্যবহৃত সুতা আসে দুটি থ্রেড থেকে। সুঁইয়ের মাথায় ছোট ছিদ্র দিয়ে আসে একটি থ্রেডের সুতা এবং কাপড়ের নিচে থেকে আসে অন্য থ্রেডের সুতা। সেলাইয়ের এ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ‘লকস্টিচ’।
নতুন ধারার এ আবিষ্কারে যারপরনাই খুশিতে আত্মহারা এলায়েস তাঁর যন্ত্রের বাণিজ্যিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সে সময় ইংল্যান্ডের উদ্দেশে যাত্রা করেন। কয়েক বছর সেখানে থেকে দেশে ফিরে দেখেন ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন তাঁর নকশার অনুরূপ মেশিন তৈরির পর সেগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহারও শুরু করেছে। এঁদের অন্যতম আইজ্যাক মেরিট সিঙ্গার।
আইজ্যাক সিঙ্গার ও আধুনিক সেলাই মেশিন
মার্কিন আবিষ্কারক, অভিনেতা ও ব্যবসায়ী আইজ্যাক সিঙ্গারকে বলা হয় আধুনিক ধারার সেলাই মেশিনের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। জার্মান বাবা ও মার্কিন মায়ের সন্তান সিঙ্গারের ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল গান ও অভিনয়ের প্রতি। শৈশবে একবার ঘর থেকে পালিয়ে যান এক ভ্রাম্যমাণ মঞ্চদলের সঙ্গে। পরে তিনি কাজ শুরু করেন একটি লেদ ফ্যাক্টরিতে। এ কাজের মাধ্যমেই যে তিনি ভবিষ্যতের পৃথিবী বদলের ডাক দেবেন তা কে ভেবেছিল।

১৮৩৯ সালে সিঙ্গার পাথর ড্রিল করার একটি মেশিন আবিষ্কার করেন এবং তার পেটেন্ট নিয়ে বিক্রি করেন একটি কোম্পানির কাছে। এরপর আবার যোগ দেন অভিনয়ের জগতে। বছর পাঁচেক পর আবার ফিরে আসেন যন্ত্রের দুনিয়ায়। ১৮৪৯ সাল নাগাদ তিনি কাঠ ও লোহা খোদাই করার একটি মেশিন আবিষ্কার করেন। এ যন্ত্র নিয়ে নতুন এক ব্যবসায় নাম লেখালেও সেখানে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হন সিঙ্গার। পরের বছর ঘটনাক্রমে এক কারখানায় তিনি এলায়েস হাওয়ের নকশায় তৈরি একটি সেলাই মেশিন দেখতে পান। ওই মেশিনটি ঠিকভাবে কাজ করছিল না। সিঙ্গার দেখতে পান মেশিনের শাটলটি যদি বৃত্তের পরিবর্তে একটি সরল রেখায় সরানো যায়, তবে এর কার্যকারিতা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। যেখানে বাঁকা সুঁইয়ের বদলে ব্যবহৃত হবে সোজা সুঁই। এমন ভাবনা থেকে আইজ্যাক সিঙ্গার ১৮৫১ সালের ১২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর এ মেশিনের পেটেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে সহজেযোগ্য এ মেশিন বাজারজাত শুরু করেন ‘আই এম সিঙ্গার অ্যান্ড কোম্পানি’ নামে।
সিঙ্গার মূলত তাঁর নকশায় হাও, হান্ট ও থিমোনিয়ারের নকশার দারুণ এক সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন। যদিও এ কারণে তাঁকে আদালতের দ্বরস্থ করেন হাও। অনুমতি না নিয়ে নকশার ব্যবহারের কারণে হাওয়ের করা মামলায় হেরে যান সিঙ্গার। জরিমানা হিসেবে এলায়েস হাওকে সিঙ্গার কোম্পানির লভ্যাংশের একটি অংশ দেওয়ার রায় দেন আদালত। এ রায়ে আইজ্যাক সিঙ্গারের পাশাপাশি এলায়েস হাও-ও বিপুল অর্থ-বৈভবের মালিক হন।
বদলে যাওয়া এক পৃথিবী
আইজ্যাক সিঙ্গারের আবিষ্কৃত সেলাই মেশিনের পরে পৃথিবীতে এক দারুণ পরিবর্তন সূচিত হয়। এ পরিবর্তন যতটা বাণিজ্যিক ও আর্থিক, ততটাই সামাজিক।
১৮ শতকের মধ্যভাগ নাগাদ ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে অধিকাংশ বস্ত্র তথা জামাকাপড় সেলাই হতো হাতে। ওই সময় একটি সাধারণ শার্ট তৈরিতে প্রয়োজন হতো প্রায় ২০ হাজার সুঁইয়ের ফোঁড়। সেলাইয়ে দক্ষ কোনো নারী প্রতি মিনিটে সর্বোচ্চ ৩৫টি ফোঁড় দিতে পারতেন। সে হিসেবে একটি শার্ট তৈরিতে সময় লাগত ১০ ঘণ্টার বেশি। ১৮৫১ সালে সিঙ্গারের নতুন সেলাই মেশিনে প্রতি মিনিটে কাপড়ের মধ্যে ৩ হাজার ফোঁড় তোলার সক্ষমতা ছিল। ফলে একটি শার্ট তৈরিতে লাগত মাত্র এক ঘণ্টা।

সেলাইয়ের সময় কমে যাওয়ার পাশাপাশি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতেও বেশ কাজে দেয় সেলাই মেশিন। কেননা, তখনকার ইউরোপীয় সমাজে নারীরাই বিশেষত হাতে সেলাই করত। শ্রম অনুযায়ী শ্রমের দাম পেত কম। কারণ পোশাক তৈরিও হতো কম। সেলাই মেশিনের কারণে দ্রুততম সময়ে সেলাই সম্পাদনের পাশাপাশি আর্থিকভাবেও লাভবান হতে শুরু করে তারা। সিঙ্গারের সেলাই মেশিনের দাম তখন ছিল ১২৫ মার্কিন ডলার। এত বেশি দামে কেনার মতো সক্ষমতা ছিল না অনেক মার্কিন মধ্যবিত্তের। ফলে আইজ্যাক সিঙ্গার শুরু করলেন কিস্তিতে মেশিন বিক্রি। মাত্র ১০ থেকে ২০ ডলার দিয়ে প্রতি মাসে ৫ ডলার পরিশোধের মাধ্যমে মেশিনটি কেনার সুবিধা মিলত। সিঙ্গারই মূলত যুক্তরাষ্ট্রে কিস্তি ধারণার জন্ম দেন।
সেলাই মেশিন সহজলভ্য হতে শুরু করার পর আমেরিকা ও ইউরোপে স্থাপিত হতে থাকে নতুন নতুন পোশাক কারখানা; যা সেলাইশিল্পকে তৈরি পোশাকশিল্পের দিকে নিয়ে যেতে দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করে। শুধু কি তাই, নতুন এ মেশিনের কারণে ফ্যাশন জগতেও আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নানা নকশার, নানা রঙের পোশাক তৈরি করা আরও বেশি সহজ হয়ে যায়। উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে সিঙ্গার কোম্পানির বৈদ্যুতিক সেলাই মেশিন পোশাকশিল্পে বিশ্বময় নতুন এক জোয়ার তোলে বলা যায়।