আসমাউল হুসনা
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৩:৫০ পিএম
আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৩ ১৫:৪২ পিএম
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একান্নবর্তী তথা যৌথ পরিবারই দেখা যেত বেশি। সময়ের পরিক্রমায় একই ছাদের নিচে সবাই মিলে বসবাসের এ রীতি পাল্টে যাচ্ছে। একক বা ছোট পরিবারই গড়ে তুলতে চাইছে সবাই। ছোট পরিবারের সুবিধা হয়তো আছে, একই সঙ্গে আছে হাজারো সমস্যাও। এ বিষয়ে বিস্তারিত...
‘আমাদের পরিবারে দাদা-দাদি, বাবা-মা, দুই চাচা ও চাচি মিলে মোট সদস্য ছিল ১৫ জন। সব ভাইবোনকে দাদাজান খুব ভোরে ঘুম থেকে তুলে নামাজ আদায় করিয়ে হাঁটতে নিয়ে বের হতেন। হাঁটাহাঁটি শেষ করে পড়াতেন। মা-চাচিরা ততক্ষণে নাশতার জোগাড় করতেন। খাওয়াদাওয়া, পড়াশোনার বিষয়গুলোয় আমরা ছিলাম দাদা-দাদি নির্ভর। বিকাল হতে না হতেই ভাইবোনের দল নেমে যেতাম মাঠে। খেলাধুলা, গাছ থেকে ফল নামানো, সাঁতার প্রতিযোগিতা ছিল নিত্যদিনের রুটিন। তখনকার সন্ধ্যা মানেই দাদিকে ঘিরে গল্পের আসর। দাদি ছিলেন আমদের মূল গৃহকর্ত্রী। মা-চাচিদের প্রতি তার কড়া নির্দেশ ছিল, ঘরের প্রতিটি বাচ্চাই যেন নিজ সন্তানের মতো আদরযত্ন পায়। ছোটবেলায় মধুর ছিল পিঠা উৎসব। হেমন্তে নতুন ধান ওঠার সে কি আনন্দ। শীতের দিনে খেজুর রসে পাক দিয়ে তৈরি করা হতো গুড়। ভাইবোনেরা সেই গুড় দিয়ে মুড়ি, খই খেতাম। পিঠা তৈরি করে দাদির সঙ্গে আত্মীয়বাড়ি বেড়াতে যেতাম। তারাও আসতেন আমাদের বাড়ি। আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে দাদা-দাদির শাসন, ভালোবাসা।’ এভাবেই যৌথ পরিবারে বড় হয়ে ওঠার আনন্দময় স্মৃতিচারণা করেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রাশিদা আক্তার।
একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন সুমাইয়া কবির। বাবা-মাকে নিয়ে একক পরিবারে তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করতে করতে বলেন, ‘মাকে দেখেছি ঘরের কাজ একাই সামলাতে। কখনও অসুস্থ হলেও তাকে সেবা করার মতো কেউ ছিল না। অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কারসহ সবই তাকে করতে হতো। বাবা ছিলেন চাকরিজীবী। সকালে বের হতেন। রাতে বাড়ি ফিরতেন একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। আমি স্কুল, টিউশন, পড়াশোনা করেই দিন পার করতাম। আনন্দ বলতে মাঝে মাঝে বাবা-মায়ের সঙ্গে পার্কে বেড়াতে যেতাম।
এখন বড় হয়েছি। কোলজুড়ে এসেছে আমার সন্তান আয়ান। ওর বয়স সাড়ে তিন বছর। অফিস, ঘরবাড়ির কাজ সামলে নিজেকে খুবই ক্লান্ত লাগে। যার প্রভাব পড়ছে আমার সন্তানের ওপর। ওর বাবা চাকরির কারণে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। একটা ছোট মেয়ে থাকে বাসায়। ওকে ব্যস্ত রাখতে মোবাইল/ট্যাবের কার্টুনই একমাত্র ভরসা। আয়ান আমাদের ডাকে খুব বেশি একটা সাড়া দেয় না। ডাক্তার বলেছেন ওকে মানুষের মধ্যে রাখতে। ওর সঙ্গে বেশি বেশি কথা বলতে। কর্মব্যস্ত জীবনে এত সময় কই? আর ছোট্ট এই পরিবারে কথা বলার মতো মানুষই বা কে। বেশ কিছুদিন আগে আয়ান অসুস্থ হয়ে পড়ে, ওকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। বিশেষ কাজ থাকায় অফিস থেকে ছুটি নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। বাসা, অফিস, হাসপাতাল সব মিলিয়ে নাভিশ্বাস অবস্থা। আয়ানের দাদা-দাদি বৃদ্ধ। তারা গ্রামে থাকেন। তাদের পক্ষেও আসা সম্ভব হয়নি।’

আধুনিক জীবনধারায় দিন দিন ছোট হচ্ছে পরিবারগুলো। একটা সময় দাদা-দাদি, বাবা-মা, চাচা-চাচি ও ভাইবোনদের সমন্বয়ে গঠিত হতো পরিবার। আর এখন পরিবারের সদস্য বলতে শুধু সন্তান ও বাবা-মা বোঝায়। মোটা দাগে ছোট পরিবারের সুবিধা হয়তো আছে কিন্তু এর অসুবিধাই বরং বেশি।
ছোট পরিবারের প্রধানতম সমস্যা একাকিত্ব। মানুষ সামাজিক জীব। তাই মানুষের পক্ষে একা জীবনযাপন করা যায় না। ছোট পরিবারের সদস্য কম হওয়ায় খুব বেশি একাকিত্ব ও একঘেয়েমি অনুভব হয়। তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করে।
এ পরিবারগুলোয় বেড়ে ওঠা সন্তানরা হয় অনেকটা আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের। একা একা বড় হয়ে ওঠে তাই তারা নিজের জিনিস ভাগাভাগির আনন্দ বোঝে না। সব সময় সবকিছু একাই ভোগ করে ফলে আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব তৈরি হয়। এ ছাড়া তাদের মধ্যে থাকে আন্তরিকতারও প্রবল ঘাটতি।
ছোট পরিবার সব সময় তাড়াহুড়া এবং ছোটাছুটির মধ্যে ব্যস্ত থাকে। ধীরে ধীরে সন্তান বড় হয়। মা-বাবা বৃদ্ধ হন। তারা যেভাবে আলাদা হয়েছিলেন বড় হওয়ার পর সন্তানও ঠিক সেভাবে বাবা-মায়ের থেকে আলাদা হয়ে যায়। যৌথ পরিবারের মূল্যবোধ এখানে কাজ করে না। সে ক্ষেত্রে বেশিরভাগ সময় বাবা-মায়ের স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। ফলে দেখা যায়, ছোট পরিবারগুলোর পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হয় না তেমন।
ছোট পরিবারগুলোর আত্মীয়দের সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ থাকে না। ফলে নিজের সমস্যা সমাধানে তেমন কাউকে পাশে পাওয়া যায় না। শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায়ও একা একাই সবকিছু সমাধান করতে হয়। অর্থনৈতিক সমস্যায়ও তেমন কাউকে পাশে পাওয়া যায় না।
যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে দেশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথম ডিজিটাল ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে এখন মোট খানার (এক হাঁড়ির রান্না খেয়ে যারা একসঙ্গে থাকেন) সংখ্যা ৪ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ৫১টি এবং প্রতিটি খানায় গড়ে বাস করেন চারজন। মাত্র এক দশক আগেও এ সংখ্যা ছিল ৩ কোটি ২০ লাখ ৬৭ হাজার ৭০০টি, সে সময় খানাপ্রতি জনসংখ্যা ছিল গড়ে ৪ দশমিক ৪। সে হিসেবে বলা যায়, সময়ের পরিক্রমায় ছোট হচ্ছে পরিবারগুলো। এই সময়ে পরিবারসংখ্যা বেড়েছে ৮৯ লাখ ৪২ হাজার ৩৫১টি।

দেশের অন্যান্য বিভাগেও ছোট পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। রাজশাহীতেও ছোট হচ্ছে পরিবার। এখানে প্রতি পরিবারে বাস করে ৩ দশমিক ০৮ জন। রংপুরে পরিবারের আকার ৩ দশমিক ০৯, খুলনায় ৩ দশমিক ০৯, বরিশালে ৪ দশমিক ০১, চট্টগ্রামে ৪ দশমিক ০৪, ময়মনসিংহে ৪ জন।
একটা সময় বাংলাজুড়েই ছিল যৌথ পরিবারব্যবস্থা; যা এখন নেই বললেই চলে। উচ্চবংশীয় ও ঐতিহ্যের পরিবারগুলো এখন ভেঙে ছোট পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থার কাছে একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবার বড্ড সেকেলে।
কেন ভেঙে যাচ্ছে যৌথ পরিবার- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা বলি কথাসাহিত্যিক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মূলত আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব থেকেই ছোট পরিবারের জন্ম। উন্নত জীবনযাপন করা এর মূল লক্ষ্য হলেও এতে বেড়েছে সামাজিক অবক্ষয়। শেষ বয়সে পরিবারের সহায়তা পাওয়ার জন্য হলেও একান্নবর্তী পরিবার গুরুত্বপূর্ণ। আর একান্নবর্তী পরিবার ধরে রাখতে প্রয়োজন মানবিক মনমানসিকতা। একজন ভালো মানুষ হওয়ার পেছনে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় শিক্ষাই প্রয়োজন।’
একটা সময় মানুষের জীবিকা বলতে ছিল শুধু কৃষিকাজ। জমিতে সবার অংশ থাকলেও এর মালিকানা ছিল পরিবারের কর্তার। কৃষিকাজের মাধ্যমে যেমন পরিবারের চাহিদা মিটত, তেমনি নিজের জীবিকাও নির্বাহ হতো। ফলে সবাই একসঙ্গে কৃষিকাজ করত। পরে শিল্পের অগ্রগতি হলো। তখন জমি ছাড়াও জীবিকা নির্বাহের জন্য বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হতে লাগল আংশিক মানুষ। শিল্পায়ন ও শহরায়ন এতটাই বৃদ্ধি পেল যে মানুষ উন্নত জীবনযাপন করতে গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হতে শুরু করল।
একান্নবর্তী পরিবারগুলোয় পারিবারিক শিক্ষাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব অনুভব করল এবং শিক্ষা অর্জনের জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে বসতি স্থাপন শুরু করল।
একান্নবর্তী পরিবারে আনন্দ ও সহযোগিতার সঙ্গে সঙ্গে নিপীড়নও কম ছিল না। পরিবারের সব সদস্যের জন্য রান্না ও ঘরের অন্যান্য কাজ করেই তাদের দিন কাটত। পরিবারের সবার আয় যে একরকম ছিল এমনও না। দেখা যেত যার আয় কম সে সংসারে কম টাকা দিত ফলে তাকে অন্যান্য কাজ বেশি করতে হতো। এমন অবস্থায় অনেকেই হীনমন্যতায় ভুগত। এমন বেশ কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে ছোট ছোট পরিবারে পরিণত হয়েছে।
পরিবার ছোট হোক বা বড়; সুন্দর একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা আমাদের উচিত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিক গুণসম্পন্ন করে গড়ে তোলা। বাস্তবিক কারণেই হয়তো যৌথ পরিবারে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। ব্যক্তিগত সুখের সন্ধানে যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার গড়ে তুলে সমস্যাগ্রস্ত সময় পার না করে বরং এ থেকে উত্তরণের কথা ভাবতে হবে।