কৃষি জাদুঘর
মুসাদ্দিকুল ইসলাম তানভীর
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২৩ ১২:৪৩ পিএম
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অবস্থিত কৃষি জাদুঘরের একাংশ
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষির উন্নতি মানেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে কৃষির উন্নয়ন ঘটেছে, পাশাপাশি প্রাচীনকালে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতি এখন বিলুপ্তির পথে। এসব বিলুপ্তপ্রায় যন্ত্রপাতি সংরক্ষণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থাপিত হয়েছে কৃষি জাদুঘর- সবাই যাকে কৃষি মিউজিয়াম নামে চেনে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে ৫০০ মিটার পশ্চিমে এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) সামনে জাদুঘরটি অবস্থিত। কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য, কৃষি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণে বাকৃবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে একটি কৃষি জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন। ২০০২ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. মুস্তাফিজুর রহমান জাদুঘরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম কর্তৃক উদ্বোধনের পর ২০০৭ সালের ৩০ জুন সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

পাঁচ একর আয়তনের জাদুঘরটি অষ্টাভ,জী ভবন। ভবনের মধ্যবর্তী অংশে রয়েছে উন্মুক্ত জমি। যেখানে করা হয়েছে ফুলের বাগান। অফিসের জন্য দুটি কক্ষ এবং প্রদর্শনীর জন্য ছয়টি কক্ষে রাখা হয়েছে প্রাচীনকালে ব্যবহৃত কৃষক ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ।
বাঁশ, বেত, কাঠ ও লোহা দিয়ে তৈরি উপকরণ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রাংশ, বিভিন্ন প্রকার যন্ত্রাংশ, তামা ও পিতল দিয়ে তৈরি উপকরণ, মাটির তৈরি উপকরণ, মাটি ও সার জাতীয় উপকরণ, বিভিন্ন ফসলের বীজ, বিরল প্রজাতির ধান, ঔষধি উদ্ভিদ ও ফলমূল, মাছ ধরার উপকরণ, ফরমালিনে সংরক্ষিত মাছ, প্রাণী ও প্রাণীর কঙ্কালজাতীয় উপকরণ, বাদ্যযন্ত্রবিশিষ্ট উপকরণ, অলংকার জাতীয় উপকরণসহ কৃষকের ব্যবহৃত উপকরণ।
জাদুঘরে প্রদর্শনীর জন্য রয়েছে ছয়টি ডিসপ্লে রুম। সেখানে বড় বড় কাঁচের তাকে সাজানো রয়েছে সাত শতাধিক উপকরণ। জাদুঘরের প্রবেশ লবিতে প্রদর্শিত হয়েছে বিচিত্র সব মাছের অ্যাকুরিয়ামসহ সাতটি খনার বচন। প্রথম ও দ্বিতীয় ডিসপ্লে রুমে রয়েছে জানা-অজানা বিবিধ উপকরণের সমাহার। তৃতীয় ডিসপ্লে রুমকে বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বলা যেতে পারে। বাকি রুমে ন পেয়েছে জমি চাষাবাদের যন্ত্রপাতি এবং পূর্বে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রাদি।

বাঁশ, বেত, কাঠ, লোহার উপকরণের মধ্যে রয়েছে টুকরি, মাথাল, ঝুড়ি, কাইলং, কুরুম, খাঁচা, দা, কাঁচি, চালুন, কুলা, কোদাল, হুক্কা, কুড়াল, শাবল, লাঙল, জোয়াল, মই ইত্যাদি।
আধুনিক কৃষি যন্ত্রাংশের মধ্যে রয়েছে সয়েল টেস্টিং কিট, বীজ শোধন যন্ত্র, ধান মাড়াই যন্ত্র, স্প্রে মেশিন, ব্যালেন্স, পাওয়ার টিলার, ইনকিউবেটর, পাওয়ার স্প্রেয়ার ইত্যাদি। এছাড়াও তামা ও পিতলের উপকরণের মধ্যে রয়েছে থালা, গ্লাস, জগ, পানথাল, বদনা, পুষ্পপত্র, হুক্কা, পানের ডাবর, মালসা, বালতি, ঘটি, বেড়ি, পরাত, কুমন্ডলু, পান বাটা, ত্রিশুল, ফুল-সাজি, চিলমচি ইত্যাদি।
মাটির উপকরণের মধ্যে মটকা বা গজি, ডহি-পাতিল ঢাকনাসহ, সানকি, ভাতের থালা, মাটির বাঘ, পিঠার ছাঁচ, জলকান্দা, মাটির ব্যাংক, পাতিল, মালসা, মাটির চুলা, মাটির চারি, মাটির কলসি, ঝানঝরের তলা প্রভৃতি ।
বিরল প্রজাতির ধানের মধ্যে রয়েছে কাইশাবিন্নি, কটকতারা, পাইজং, কুমড়ি, হনুমানঝটা, গোবিন্দ ভোগ, জামাই ভোগ, হরিংগাদিয়া, পক্ষীরাজ, মালা, বেগুনবিচি, হাসিকমলি, লতিশাইল, বিরই, রাঁধুনি পাগল, নোনাকুচি, পাকড়ি, দাদখানি, সোনামুখী, সূর্যমুখী, দুলাভোগ, ঈরাবিন্নি, বটেশ্বর, ফুলবাদাল, ডাঁশফুল, রাজাশাইল, মধুমালতি, যাত্রামুকুট, জলকুমারী, বেনামুড়ি, পাটঝাক, কালামানিক ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন প্রকারের ঔষধি উদ্ভিদ ও ফলমূল, মাছ ধরার উপকরণ ও বাদ্যযন্ত্র জাতীয় উপকরণ।
কৃষি জাদুঘরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আশরাফুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিসংশ্লিষ্ট বিশাল সংগ্রহশালা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। জাদুঘরটি পরিদর্শনের মাধ্যমে শহরের ইট-পাথর, কাচঘেরা মানুষেরা খুব সহজেই গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।