হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৩ ১৩:০০ পিএম
আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২৩ ২০:২২ পিএম
ছবি: আরিফুল আমিন
আমাদের বয়ন শিল্পের আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক জামদানি। বংশপরম্পরায় বয়নশিল্পীরা তাদের ভালোবাসা ও নিষ্ঠায় শিল্পটিকে এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন। ভৌগোলিক নির্দেশক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই পণ্যের কারিগর বা ওস্তাদের হাতে বোনা শাড়ি নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় ১৯ জুলাই শুরু হয়েছে ‘অনন্য বয়নে জামদানি উৎসব’। শুধু শাড়ি নয় এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে জামদানি তৈরির নানা ধাপ ও প্রক্রিয়া। উৎসবের স্থানে আসার পর আপনার মনে হতেই পারে, কোনো জামদানি পল্লীতে বুঝি এসে পড়েছেন।
প্রদর্শনীতে জামদানির আলঙ্কারিক বিন্যাসের ছন্দ, প্রাকৃতিক রঙের নান্দনিক বর্ণময়তা ও শুদ্ধতম জামদানি নকশার সৃজনশীল পরিকল্পনায় সমসময়ের জামদানি শাড়ির রূপান্তর প্রদর্শিত হয়েছে। দেয়ালে টানোনো বাহারি সব শাড়ি পরখ করার আগে যে কারও ইচ্ছে হবে নান্দনিক এই কাপড় কীভাবে তৈরি হয়েছে তা একবার দেখে নিতে। কী প্রক্রিয়ায় বোনা হয় একেকটি শাড়ি- এর বিস্তর জানা যাবে এখানে এলে।
শাড়ি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ প্রাকতিক রঙ। এর গুণেই জামদানি হয়ে ওঠে অন্যন্য। জলচৌকির ওপর বৃক্ষের শুকনো পাতা বিছানো জমিন। থরে থরে সাজানো রঙিন মৃৎপাত্রে রয়েছে প্রাকৃতিক রঙ তৈরির বেশ কিছু উপকরণ- মেহেদি পাতা, চা পাতা, খয়ের, সুপারি, আরও কত কী!
বাঁশের তৈরি ছাপরা একটা ঘরে বসানো রয়েছে হাতে বোনা তাঁত। লোকজ আল্পনায় সজ্জিত ঘরটিতে রয়েছে সুতা কাটার চরকা। সুতা তোলার পদ্ধতি। গুটিতে পেঁচানো সুতার গুটি। ববিনে পেঁচানো সুতা।
১৮ জন ওস্তাদ এবং ২০ জন শাগরেদের নিবিষ্ট সৃজনে প্রদর্শনীতে ২৫টি জামদানি শাড়ি প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রতিটিতে ওস্তাদ ও শাগরেদের নাম লেখা আছে। একটি শাড়ি তৈরিতে কয় গুটি সুতা ও কতগুলো মোটিফ ব্যবহার করা হয়েছে এবং কত সময় লেগেছে, উল্লেখ আছে তারও। এ প্রদর্শনীর শাড়িগুলো ১৫০ থেকে ১৭৫ বছরের পুরোনো জামদানি শাড়ির নকশা থেকে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। নতুন শাড়ির পাশাপাশি ১৫০ বছরের পুরোনো দুটি জামদানি শাড়িও উৎসবে স্থান পেয়েছে। অবহেলায় কীভাবে জামদানি নকশার বিপর্যয় ঘটতে পারে, তার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে উৎসবে।
প্রদর্শনীতে আসা রাশেদুল হক বলেন, এখানে এসে জামদানির মোটিফ, তাঁতি এবং শাড়ি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পেরেছি।’
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিলনে এবং বয়নশিল্পীদের সৃজন-ভাবনা ফুটে উঠেছে প্রত্যেকটি শাড়ির জমিনে। তাদের বংশপরম্পরায় অর্জিত জ্ঞান থেকে নতুন এই জামদানিগুলো বুনেছেন ঢাকার তারাব, ডেমরা, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁর ওস্তাদ ও কারিগররা। কথা হয় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকার বয়নশিল্পী মো. জামাল হোসেনের সঙ্গে। তার হাতে বোনা শাড়িও এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া পেশা আমরা এখনও ধরে রেখেছি। এই জামদানি দেশে-বিদেশে সুনাম বয়ে আনছে। ভালো লাগছে আমাদের কাজগুলো দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।’ সরকার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোর দাবি জানান এই জামদানি শিল্পী।
প্রদর্শনীর কিউরেটর বাংলাদেশ কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্রশেখর সাহা বলেন, আমাদের বয়নশিল্পীদের দক্ষতা ও মেধার চর্চা অব্যাহত রাখতে প্রদর্শনীটির আয়োজন করা হয়েছে। সময়ের প্রেক্ষাপটে বয়নশিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতারও প্রয়োজন রয়েছে।’ সেবা নারী ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের উদ্যোগে, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সহযোগিতায় সবার জন্য উন্মুক্ত এই প্রদর্শনী চলবে ২৯ জুলাই পর্যন্ত। খোলা থাকবে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।