হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৩ ১২:১৮ পিএম
আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৩ ১২:৪১ পিএম
গুলিস্তান স্টেডিয়াম এলাকায় এসে গাড়ির দম বোধহয় ফুরিয়ে যায়। তাই বিরক্তি নিয়ে অনেকেই পাবলিক পরিবহন থেকে নেমে ফুটপাথ ধরে হাঁটা দেন। মহানগরের ব্যস্ততম এই রাস্তায় দাঁড়ানোর ফুরসতই বা কোথায়? এর মধ্যে চোখে পড়ল অলিম্পিক ভবনের উল্টোপাশে শহীদ মতিউর পার্কের ফটক। সামনে চেয়ার-টেবিল পেতে টিকিট দেওয়া হচ্ছে। দর্শনার্থীরা টিকিট কেটে প্রবেশ করছে। এ পার্কে আগে যে কেউ বিনামূল্যে যখন-তখন যাতায়াত করতে পারত। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী আমিও ১০ টাকা মূল্যের টিকিট নিয়ে পার্কের ভেতরে গেলাম। প্রথমে গিয়ে দাঁড়ালাম দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত কাজী বশির মিলনায়তনের (মহানগর নাট্যমঞ্চ) পূর্বপাশে। সামনের পুকুরে শান বাঁধানো সিঁড়িতে গিয়ে বসলাম। নীলচে জল থেকে ঠান্ডা বাতাসে মন-প্রাণ জুড়িয়ে গেল মুহূর্তেই। পাশে বসে ছোট একটা মেয়েকে বাদাম খাওয়াচ্ছেন শিবলী আহমেদ নামের এক দর্শনার্থী। তিনি সপ্তাহে দুদিন তার মেয়েকে নিয়ে এখানে আসেন। তিনি জানালেন, শিশুদের বিনোদনের জন্য পার্কটি আরও আধুনিক করে তোলা দরকার।
এর মধ্যে দৃষ্টি গেল পাড় বাঁধাই করা পুকুরের মধ্যে ওয়াটার বোটে রাইড খেলা শিশু-কিশোরদের দিকে। অনিন্দ্য সুন্দর বোটগুলো পানির ওপর দুলছে। ওদের আনন্দের উচ্ছ্বাসও যেন উপচে পড়ছে। এ জন্য তাদের গুনতে হচ্ছে জনপ্রতি ৫০ টাকা।
আম, জাম, ঝাউ, মেহগনি, পাতাবাহারসহ কয়েক প্রজাতির ফুলগাছের সমারোহ দেখতে দেখতে দক্ষিণের গেটের কাছে পৌঁছলাম। সেখানে বসানো হয়েছে কয়েকটি কৃত্রিম পুকুর। যে শিশুরা সাঁতার কাটতে জানে না, তারা বোটে চড়ে রাইড করছে। অভিভাবকরা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। রাইড শেষ করে নামল পায়েল নামের এক শিশু। কেমন লাগছে জিজ্ঞাসা করতে আনন্দভরা কণ্ঠে সে বলল, ‘অনেক ভালো।’ পায়েলের মতো আরও অনেকেই প্রায় আসে এই বিনোদন কেন্দ্রে।
কথা হয় হরেকরকম পণ্যের দোকানি বাবুল ব্যাপারীর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘এটা অনেক ব্যস্ত এলাকা। আর এই পার্ক নিয়ে জনগণের মধ্যে অনেকটা ভীতি ছিল। আগে বারোয়ারি মানুষের আস্তানা ছিল। মানুষ নানারকম হেনেস্তার শিকার হতো। এখন এ পার্কটি যে শিশুদের জন্য বিনোদনের জায়গা হয়েছে, নতুনভাবে সংস্কার করা হয়েছে তা অনেকেই জানেন না। প্রচারের ঘাটতি আছে।’ এই ব্যবসায়ীর মতে, কর্তৃপক্ষ চাইলে এটি আরও নান্দনিক করে গড়ে তুলতে পারে।
ঘাসের কার্পেট বিছানো পার্কের সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনোহর দুটি নাগলিঙ্গম গাছ। পূর্বপাশের দেয়ালসংলগ্ন দোতলা জিমনেসিয়ামে ব্যায়াম করার জন্য রয়েছে সব ধরনের সরঞ্জাম। যে কেউ চাইলে শরীরচর্চা করতে পারেন।
ট্রেনসহ অনেকগুলো রাইড- নাগরদোলা, হেলিকপ্টার, ট্রেন, পুকুরের পাড়ে আছে প্যারেড রোড, ভূতের ঘর এবং সুইমিংপুল। এগুলোতে চড়তে খরচ পড়বে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। চটপটি, ফুসকা, ফাস্টফুডসহ বেশ কয়েকটি খাবারের দোকানও রয়েছে। খাবারের জন্য ক্যানটিনও আছে।
প্রায় সাড়ে তিন একর আয়তনবিশিষ্ট এ পার্কটির নামকরণ হয়েছে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত মতিউরের নামে।
এক বছরের জন্য পার্কটি ইজারা নিয়েছেন জাহিদুল ইসলাম মানিক। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘এত স্বল্প সময়ের মধ্যে এখানে বড় ধরনের বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।’
পুরান ঢাকার বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কোনোমতে টিকে থাকা এই পার্কে সবুজ নিঃশ্বাস নিতে প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘুরতে আসেন। সকাল আটটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এই বিনোদন কেন্দ্রে আপনার সন্তান নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন।