তাপস রায়
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৩ ০৯:১৩ এএম
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৩ ১৮:৫২ পিএম
প্রচ্ছদ: রামিন দেওয়ান, ষষ্ঠ শ্রেণি, নেভি এ্যাংকরেজ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
গল্প দিয়েই তবে শুরু হোক। এ হলো সত্যি গল্প। হুমায়ূন আহমেদ তখন চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র। একদিন ক্লাস টিচার ‘আমার প্রিয় ঋতু’ রচনা লিখতে দিলেন। দিয়েই টেবিলে পা তুলে ঘুম।
হুমায়ূন আহমেদ ভেবে দেখলেন, তার প্রিয় ঋতু বর্ষা। তিনি বর্ষা নিয়ে লিখলেন। ততক্ষণে ক্লাসের সময় প্রায় শেষ। স্যার তড়াক করে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তার দিকেই হাত বাড়িয়ে বললেন, দেখি কী লিখেছিস?
পড়ে স্যার হুংকার দিয়ে বললেন, প্রিয় ঋতু হবে বসন্ত। তুই লিখেছিস বর্ষা!
গাধা কান ধর।
কী আর করা! স্যারের নির্দেশ। হুমায়ূন আহমেদ অসহায়ের মতো কান ধরে
দাঁড়িয়ে রইলেন।
হুমায়ূন আহমেদের মতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও প্রিয় ছিল বর্ষা। এমনও হয়েছে, কবির মালপত্র ট্রেনে উঠে গেছে। তিনি ভ্রমণে বের হবেন। হঠাৎ ঈশান কোণে কালো মেঘের ঘনঘটা। কবি কাউকে কিছু না বলে স্টেশন থেকে শান্তিনিকেতনে ফিরে এসেছেন। কারণ আশ্রমে বসে তিনি বর্ষা উপভোগ করবেন।
ওদিকে কবির সেক্রেটারি স্টেশনে কবিকে খুঁজে হয়রান। স্টেশনে ট্রেন হুইসেল বাজাচ্ছে। ঝমঝম শব্দ তুলে ট্রেন ছাড়ল বলে! কে খোঁজে সেখানে সুর? এর চেয়ে আকাশের গুরু গুরু গর্জন ঢের মধুর।
এ হলো বড়দের ছেলেমানুষি। মনের খেয়াল। কাছের কেউ এ নিয়ে বললে কবি বলতেন, আমি আর কি খেয়ালি রে? খেয়ালি ছিলেন আমার বড়দা। বড়দা মানে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার একবার খেয়াল চাপল, কাপড়ের যদি জোব্বা হয়, তবে কাগজের জোব্বাও হবে। ব্যস, নানা রঙের কাগজ জুড়ে জোব্বা বানালেন। তারপর সেই জোব্বা পরে ঘুরে বেড়ালেন পুরো কলকাতা শহর।
আবার একদিন তার খেয়াল হলো,
ঘিয়ে যদি লুচি ভাজা যায়, তবে জলে ভাজা যাবে না কেন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হাসেন আর বলেন, জিনিয়াসে জিনিয়াসে বাড়ি আমাদের ভরা ছিল!
সত্যিই তাই। জিনিয়াসদের কখন যে কী মনে হয়! একবার এই তুমুল ঝড়ের দিনে বিজ্ঞানী নিউটনের খেয়াল চাপল ঝড়ের বেগ মাপবেন। সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু ছিলেন। তারা অবাক! এ আবার কেমন কথা! ঝড়ের বেগ মাপা যায় নাকি?
নিউটন বললেন, অবশ্যই যায়। চেষ্টা করেই দেখা যাক।
নিউটন ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে ঝড়ের বাতাস যেদিকে বইছে সেদিকে দিলেন এক লাফ। যেখানে পড়লেন সেখানে দাগ কাটলেন। এরপর আগের স্থানে ফিরে বাতাসের উল্টো দিকে লাফ দিলেন। দুটি স্থানের দূরত্ব মেপে ঝড়ের বেগ আনুমানিক বলে দিলেন।
ওদিকে নিউটনের কাণ্ড দেখে বন্ধুদের আক্কেলগুড়ুম!
আমরা জানি, ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে সুখ। ঝড়ে যে আবিষ্কারও করা যায় নিউটন ছাড়া কে জানত? আমাদের কাছে ঝড় ভয়ের। এর কারণও আছে। কবি তো বলেই দিয়েছেন- ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। কিন্তু কে মানছে সে কথা! উল্টো সুর তুলে বলছে- আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে।
একবার হুমায়ূন আহমেদের খুব শখ হলো; অদ্ভুত শখ! ঝুমবৃষ্টিতে সমুদ্রের পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে থাকবেন। শখপূরণে তিনি কক্সবাজার চলে গেলেন। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। তিনি সমুদ্রে নামলেন। গলাপানিতে বসে আছেন। ঢেউ এসে মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। এ এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা!
-64a78353c590e.jpg)
বর্ষা এমনই উপভোগ্য। তবে গ্রামে বর্ষার এক রূপ, শহরে আরেক। বর্ষার সেই রূপ আমাদের আবেগে ভাসায়। প্রকৃতিও এ সময়ের অপেক্ষায় থাকে। বর্ষার জলধারায় সতেজ হয়। এজন্য বর্ষা বরণে তারও রয়েছে প্রস্তুতি। রয়েছে নিজস্ব রঙ, রূপ, প্রকার।
বর্ষার মেঘ কখনও চঞ্চল, কখনও থমথমে জলভারে নত, কখনও ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, কখনও গভীর নীল। সেই বর্ষা যখন নামে, প্রতিটি ফোঁটায় তিরতির কেঁপে ওঠে সবুজ পাতা। মাটি সোঁদা গন্ধ ছড়ায়। পেখম মেলে ময়ূর। ওদিকে গলা মেলাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে ব্যাঙের দল। তাদের হাঁকডাক ছাপিয়ে যায় টিনের চালে একটানা ঝমঝম শব্দ। আকাশটাই বুঝি ভেঙে পড়বে চৌচালার ওপর। অথচ ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।
এ সময় জানালায় বসে বৃষ্টি দেখতে দেখতে মন পাখা মেলবেই। ছুটে গিয়ে উঠোনে দাঁড়াতে ইচ্ছা হবে।
শহরে উঠোন কোথায়?
ছাদ তো আছে। আর আছে মায়ের কড়া শাসন- খবরদার! একদম ভিজবে না কিন্তু।
মন কি খারাপ হলো?
ঠিক আছে, লেখাটা শুরু করেছিলাম গল্প দিয়ে। শেষেও রইল আরেকটি গল্প। এ গল্পের নায়ক নাসিরুদ্দিন হোজ্জা।
একদিন তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। মসজিদের ইমাম দৌড়ে বাড়ি ফিরছেন। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা দেখে বললেন, ইমামসাহেব! বৃষ্টি আল্লাহর দান। পবিত্র। আর আপনি বৃষ্টিতে ভেজার ভয়ে দৌড়ে যাচ্ছেন!
এ কথায় ইমাম লজ্জা পেলেন। তিনি দৌড় থামিয়ে ভিজে ভিজেই বাড়ি ফিরলেন।
কয়েক দিন পর আবার বৃষ্টি নামল। এবার ইমাম সাহেব দেখলেন, হোজ্জা বৃষ্টি এড়াবার জন্য দৌড়ে বাড়ি যাচ্ছে। তিনি নাসিরুদ্দিনকে ডেকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, কী হে! সেদিন তুমিই না বললে বৃষ্টি আল্লাহর দান। আজ যে তবে দৌড়ে পালাচ্ছ!
ভুল তো বলিনি। মোল্লা দৌড়াতে দৌড়াতেই বললেন, এমন পবিত্র জিনিস পায়ে মাড়াই কী করে!