হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ০৫ জুলাই ২০২৩ ১৩:০৯ পিএম
বর্তমানে কাঁচা মরিচের ঝালের চেয়েও বেশি ঝাঁজালো এর দাম। দোকানির হাঁকানো দরের কাছে এর সামনে দাঁড়ানোই দায়! এরপরও আমাদের রান্নার হাঁড়িতে থাকতে হবে মরিচ। সময়ে অসময়ে মূল্যবৃদ্ধি হওয়া মসলাজাতীয় এ পণ্যটির আগমনের পূর্বে আমরা খাবারের ঝাল বাড়াতে কী ব্যবহার করতাম? কোথা থেকেই বা এলো! জেনে নিই এর আদ্যোপান্ত।
বাঙালির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া এ মরিচ কিন্তু ভারতবর্ষীয় কোনো উদ্ভিদ নয়। মানবসভ্যতার যেমন রয়েছে ইতিহাস, তেমনি প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতিরও আছে ইতিহাস।
ভারত উপমহাদেশে মরিচের আগমনের বহু পূর্বে এ অঞ্চলের মানুষ রান্না ঝাল করার জন্য উদ্ভিদটির ভিন্ন জাতের কিছু ফল ব্যবহার করত। এগুলোর নাম ছিল ‘ব্ল্যাক পিপার’ বা গোলমরিচ এবং ‘পিপ্পলি’ বা লঙ্কা মরিচ। পূর্ববাংলা ও ওড়িশার বনাঞ্চলে লঙ্কা মরিচ জন্মাতে দেখা যেত। এসব মরিচজাতীয় ফল পিপ্পলি, পিপলি কিংবা পিপুল নামে পরিচিত। বহির্বিশ্বে মসলা হিসেবে ভারতীয় পিপলির ব্যাপক কদর ছিল। বিশেষত ইউরোপীয়দের কাছে। আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারত ও মিসরের মধ্যে মসলার বাণিজ্য শুরু হয় চৌদ্দ শতকে। মসলা হিসেবে পিপলি বা পিপার তথা গোলমরিচের চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। মিসর থেকে তা যেত ইউরোপে। এর মধ্যে রোমানদের হাত থেকে মিসরের কর্তৃত্ব চলে যায় মুসলমানদের কাছে। তখন মিসর হয়ে ভারতে পৌঁছানো ইউরোপীয় বণিকদের পক্ষে কঠিন ছিল। মসলার বাজারকে দখলে নিতে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা ভারতে আসার জন্য বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। এই উদ্দেশ্যে স্পেন থেকে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যাত্রা করেন। তবে ভারতবর্ষে আসার পরিবর্তে তিনি আবিষ্কার করেন আমেরিকা মহাদেশ। সেখানেই তিনি প্রথম মরিচের সাক্ষাৎ পান। তিনি তার ডায়েরিতে এটিকে ‘চিলি পিপার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। আর এভাবে চিলি ‘চিলি পিপার’ নামে পরিচিতি পায়। তিনি এই চিলি পিপার স্পেনে নিয়ে আসেন। সেখানে এটি মসলা হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। এরপরই সারা বিশ্বে মরিচের আবাদ শুরু হয়। পরে ইউরোপ থেকে মরিচ ভারত, চীন ও জাপানে ছড়িয়ে পড়ে।
শুরুর দিকে স্পেন ও পর্তুগালের বিভিন্ন ধর্মীয় মঠের বাগানগুলোতে কৌতূহলবশত শুরু হয় মরিচ চাষ। রান্নার পরে সন্ন্যাসীরা আবিষ্কার করেন ভিন্ন কিছু। এ মরিচগুলো ভারতীয় গোলমরিচের চেয়ে স্বাদে ও গন্ধে অনেক উন্নত। তখন গোলমরিচের এতটাই দাম ছিল যে অনেক দেশে মুদ্রা হিসেবে সেগুলোর প্রচলন ছিল। তাই গোলমরিচের সস্তা একটি বিকল্প হিসেবে তারা এ মরিচ ব্যবহার করা শুরু করেন। তারপর মরিচের বীজ মুসাফির সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ব্যবসায়ীদের দ্বারা তা আফ্রিকা ও এশিয়ায় প্রবেশ করে।
কলম্বাসের অভিযানের কয়েক বছর পর ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ অভিযাত্রী ভাস্কো দা গামা ভারতবর্ষের মালাবার উপকূলের কালিকট বন্দরে পৌঁছান। কলম্বাস যেখানে ব্যর্থ হয়েছিলেন, দা গামা সেখানে সফল হলেন। ঐতিহাসিক লিজি কলিংহামের মতে, ভারতের মালাবার উপকূলে কখন মরিচের উপস্থিতি ঘটল তা হলফ করে বলা সম্ভব নয়। ভাস্কো দা গামা ভারতের মাটিতে পা রাখার ৩০ বছর পর গোয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মরিচ জন্মানো দেখা গেছে। মুম্বাইতে তাদের নাম হলো ‘গোয়াই মিরচি’, অথবা ‘গোয়া পিপার’। এ থেকে বোঝা যায়, গোয়া ছিল ভারতবর্ষে মরিচের প্রবেশদ্বার। সেখান থেকে কালক্রমে মরিচ সারা ভারতে ও বাংলায় বিস্তৃতি লাভ করে।
বর্তমানে উপমহাদেশজুড়ে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মরিচের শত শত প্রজাতি উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশে উত্পন্ন বিভিন্ন প্রজাতির মরিচের মধ্যে বালিজুরি, বোনা, বাইন, সাইতা, সূর্যমুখী, পাবা, হালদা, ধানী, শিকারপুরী, পাটনাইসহ নানান জাত।
বাংলার লোকজীবনের দার্শনিক কবি খনা মরিচ ও পেঁয়াজ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণীস্বরূপ রচনা করেছেন বচন- ঘরের কোণে মরিচগাছ/লাল মরিচ ধরে/ পেঁয়াজ তোমার কথা ভেবে/ চোখে পানি ধরে।’ এ যাত্রায় পেঁয়াজের কথা না ভেবে বরং বাড়ির আনাচকানাচে জন্মে থাকা কাঁচা মরিচের মূল্য কেন এত বাড়তি সেসব নিয়ে ভাবি!