হাসনাত মোবারক
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৩ ১৩:০৫ পিএম
সন্ধ্যায় কর্মজীবী মানুষের নীড়ে ফেরার ব্যস্ততা। ঢাকার রাস্তায় নাগরিক কোলাহল। এর পরও জ্যাম-যাতনা পেরিয়ে উপস্থিত হলাম উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ১৬ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়িতে। মূল ফটকের সামনে ঝাঁকড়া বরই গাছটা যেন দর্শনার্থীদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্যই দাঁড়িয়ে আছে। বৃক্ষটির গোড়ায় বেড়ে ওঠা রঙ্গন ফুলগাছ। এর কুঁড়িগুলো দর্শনার্থীদের বিনা অনুমতিতেই প্রবেশের নির্দেশনা দিচ্ছে।
সচরাচর এমন বাড়ির দেখা মেলা ভার। এটা তো কোনো সাধারণ গৃহ নয়! শিল্পের আঙ্গিনা। গ্যালারি কায়া এর নাম। গেট ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই জানতে পারলাম, চার কক্ষবিশিষ্ট এ শিল্পবাড়িটি ২০ বছরে পা রেখেছে। সে উপলক্ষে ১৯তম বার্ষিক শিল্পকর্মের প্রদর্শনী চলছে। ২ জুন প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
তেলরঙ, জলরঙ, ছাপচিত্র, চারকোল এবং অ্যাক্রেলিকসহ বিভিন্ন মাধ্যমের ৮৪টি শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো গ্যালারি। চিত্রকর্মগুলো ৫০ জন শিল্পীর আঁকা। ১৯৫৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ের। নিতুন কুন্ডু, কাইয়ুম চৌধুরী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, মুর্তজা বশীর বা ভারতীয় শিল্পী যোগেন চৌধুরী, সনৎ করের মতো বিখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা ছবি রয়েছে এ প্রদর্শনীতে। স্থান পেয়েছে হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, হামিদুজ্জামান খান, শাহাবুদ্দিন আহমেদের মতো প্রথিতযশা শিল্পীদের ছবি। স্বভাবতই অনেক দুর্লভ শিল্পকর্মও রয়েছে এখানে। স্বনামধন্য শিল্পী শিশির ভট্টাচার্য্য থেকে তরুণ কয়েকজন শিল্পীর চিত্রকর্মও স্থান পেয়েছে এখানে।
দর্শনাথীরা আসছেন, দেখছেন। পছন্দের চিত্রকর্মের সঙ্গে ছবি তুলছেন। কথা হলো উত্তরার দক্ষিণখান থেকে আসা দর্শনার্থী আহমেদ রনির সঙ্গে। তিনি জানান, গ্যালারির চিত্রকর্ম দেখে কিছুটা সময়ের জন্য কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়া যায়।’ শিল্পের মাঝে যারা অনুভব খুঁজে বেড়ায়, তাদের জন্য এটি চমৎকার আয়োজন। আবদুস শাকুর শাহর লোকজধারায় অবগাহনে তুলে আনা এক নারীর চিত্রপটে দৃষ্টি আটকে গেল। লোকজমোটিফে আঁকা জলরঙের এ শিল্পকর্মের ওপর লেখা মৈমনসিংহ গীতিকার গীতিনাট্যের কয়েকটি পঙক্তিÑ ‘ভিনদেশী পুরুষ দেখি চান্দের মতন/ লাজ-রক্ত হইল কন্যার পরথম যৌবন/ কলসী ভরিয়া কন্যা ঘরেতে ফিরিল/ কুড়া লইয়া চান্দ বিনোদ বইনের বাড়ী গেল।’
কথা হয় গ্যালারি কায়ার পরিচালক শিল্পী গৌতম চক্রবর্তীর সঙ্গে। তিনি জানান, ‘শুদ্ধ শিল্পকলার প্রচার এবং প্রসারের জন্যই মূলত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তরুণ শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতার লক্ষ্যও রয়েছে আমাদের। সেই উদ্দেশ্য থেকেই মূলত এ বার্ষিক প্রদর্শনীর আয়োজন।’
শিল্পের আশ্রয়ে হৃদয় রাঙানো এই আঙিনায় ঠাঁই করে নিয়েছে প্রখ্যাত শিল্পীদের শিল্পকর্মের সঙ্গে নবীন চিত্রকরদের চিত্রকর্ম। অ্যাক্রেলিকে আঁকা আবুল বারেক আলভীর বিমূর্ত চিত্রকর্মটি গতিময় রেখায় সজ্জিত। তেমনি আহমেদ শামসুদ্দোহার ‘সুন্দরবন’ চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে প্রতিবাদের ভাষা।
হাশেম খানের ছবিতে দেখা যায় মাঝনদীতে ঢেউয়ে ঢেউয়ে এগিয়ে চলেছে পালতোলা নৌকা, এ যেন নদীমাতৃক জীবনের প্রতিচ্ছবি। জামাল আহমেদের চিত্রকর্মে যুগল পায়রার ভাব-ভালোবাসার মুহূর্ত। নিসর্গের শোভাময় পাহাড়ি শ্রমজীবী নারীর জীবনের ছবি এঁকেছেন কনক চাঁপা চাকমা। প্রাণ-প্রকৃতি, নদী, নগর ও গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলার নানা অনুষঙ্গ হয়ে ধরা পড়েছে অধিকাংশ চিত্রকর্মে। শিল্পীর কল্পনার জগতে উঁকি দেওয়া ভুবনের ছাপচিত্র যেন পুরো গ্যালারি। মুগ্ধতা ছড়ানো চিত্রকর্মগুলো শিল্পানুরাগীদের হৃদয়ে প্রশান্তির দোলা দিয়ে যাবে নিশ্চিত। ছবি দেখার পাশাপাশি শিল্প সংগ্রহের সুযোগও রয়েছে প্রদর্শনীতে। প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। চলবে ১৭ জুন পর্যন্ত।