জেসমিন ইসলাম
প্রকাশ : ২৩ মে ২০২৩ ১৩:৪২ পিএম
আপডেট : ২৩ মে ২০২৩ ১৫:০৬ পিএম
ছবি : যাদুর বাক্স
বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে গামছা জড়িয়ে আছে যুগ যুগ ধরে। ফ্যাশনেও গামছা পোশাক নতুন কিছু নয়। গরমে গামছা পোশাকে স্টাইল যেমন বজায় থাকে, তেমনি আরামও মেলে
ফ্যাশন সদা পরিবর্তনশীল ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। তারই ধারাবাহিকতায় প্রতিনিয়ত ফ্যাশনে সংযোজিত হচ্ছে নতুন মাত্রা। আর এই মাত্রায় অনন্য সংযোজন গামছা। একটা সময় ছিল যখন গামছা ব্যবহৃত হতো শুধু শরীর মোছার কাজে। কিন্তু বর্তমানে গামছা দিয়ে তৈরি হচ্ছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না, টপস, স্কার্ট, ফতুয়া, পাঞ্জাবিসহ নানা ধরনের পোশাক। এসব পোশাকে উঠে আসে বাঙালি ঐতিহ্য, মেলে ধরে বাঙালি তাঁতশিল্পকে।

অনেক ডিজাইনার আবার ভিন্ন ধরনের কাপড়ের সঙ্গে গামছার কাপড় যোগ করে তৈরি করছেন ফিউশন। ছেলেদের ফ্যাশনেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে গামছা। তৈরি হচ্ছে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া ও প্যান্টসহ বিভিন্ন পোশাক। শুধু পোশাকেই নয়; গামছা ব্যবহৃত হচ্ছে গয়না, ঘর সাজানোর নানা অনুষঙ্গ, পার্স ও স্যান্ডেলেও। গামছা দিয়ে তৈরি এসব জিনিস বর্তমানে ফ্যাশনপ্রিয়দের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
গামছাকে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার পেছনে যে মানুষটির অবদান সবচেয়ে বেশি; তিনি ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল। এই মানুষটিই বাংলার এ ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরেন। ১৯৭৪ সালে ফ্যাশন ডিজাইন নিয়ে তিনি লন্ডনে পড়তে যান। বিদেশে পড়ার সুবাদে আন্তর্জাতিক ফ্যাশনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। কোনো উৎসব, অনুষ্ঠান কিংবা ফ্যাশন শো- এসব জায়গায় ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করতেন গামছা। কখনও গামছা দিয়েই তৈরি করে নিতেন নিজের পোশাকটি। বিবি রাসেলের সৌজন্যে আমাদের দেশীয় এই শিল্প অনেক আগেই জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গনে।
বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী গামছার কাপড় নিয়ে কাজ করছেন অনেক তরুণ ফ্যাশন ডিজাইনার। গামছা ফেব্রিক ও প্যাটার্ন নিয়ে তৈরি হয়েছে আলাদা একটি ফ্যাশন জগৎ। কিশোর-কিশোরী থেকে মধ্য-বয়স্কদের ফ্যাশনেও স্থান করে নিয়েছে গামছা। এখন গামছার রঙে বিভিন্ন ধরনের কম্বিনেশন দেখা যায়। উজ্জ্বল রঙের কারণে গামছা কাপড়ের পোশাক অনেক বেশি নজর কাড়ে। পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী গামছার বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ন রেখেই তৈরি হচ্ছে সময়োপযোগী পোশাক। গামছার সবচেয়ে নজরকাড়া দিক হলো- উজ্জ্বল রঙ আর নজরকাড়া চেক। গামছার সৌন্দর্য দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় যেন রঙ আর চেকের কারণেই। গামছায় যেমন আছে ছোট, বড়, লম্বা, আড়াআড়ি অনেক রকম চেক; তেমনি রয়েছে নানা রঙ। কখনও লালের সঙ্গে শুভ্র সাদা, গোলাপির সঙ্গে নীল, হলুদের সঙ্গে লালের মিল তো কখনও আবার রঙধনুর সাত রঙে রাঙানো থাকে।
গামছা কাপড় পাতলা ও নরম হওয়ায় গরমের সময় এই পোশাক বেশ আরামদায়ক। তাই গরমে নিত্যদিনের কাজকর্ম থেকে শুরু করে বিভিন্ন উৎসবের পোশাকেও মানিয়ে যায় গামছার পোশাক ও গয়না। ঐতিহ্য আর হাল ফ্যাশনের সমন্বয়ে ভিন্নতা আনতে বাঙালিয়ানার বিভিন্ন উৎসবে পছন্দের তালিকায় রাখতে পারেন গামছা কাপড়ের পোশাক। গরমে গামছা ফেব্রিকের অনেক চাহিদা থাকে। সাধারণ বুনটের পাশাপাশি গামছার বিভিন্ন মোটিফ আর আঞ্চলিকতার ছোঁয়াও থাকে সেই ফেব্রিকে। বর্তমান প্রজন্মের কথা মাথায় রেখেই বানানো হচ্ছে গামছার পোশাক। গামছার জ্যাকেট, শ্রাগ, টিউনিক, শর্ট টপস, লং টপসের মতো বিভিন্ন স্টাইলের পোশাক বানানো হচ্ছে। গরমে জনপ্রিয় গামছার স্কার্ফও।
আরও পড়ুন : গরমে আরাম

গামছা শাড়ি
গামছা চেকের শাড়ির এখন দারণ চল। একই সঙ্গে জনপ্রিয়তা পেয়েছে গামছার অন্যান্য কাপড়ের কম্বিনেশনে তৈরি ফিউশন শাড়িগুলো। তাতে থাকছে ব্লক ও স্ক্রিন প্রিন্টের কাজ। আবার যেকোনো ব্লক কালার সুতি বা খাদির শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্টে পরতে পারেন গামছা চেক ব্লাউজ। শাড়ির সঙ্গে গামছা দিয়ে মনের মতো নকশা করে বানিয়ে নিতে পারেন ব্লাউজ। শাড়ির সঙ্গে তা দারুণ মানিয়ে যাবে।
পশ্চিমা ধাঁচের পোশাকে গামছা
গামছার ব্যবহার এখন শুধু দেশীয় পোশাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গামছা দিয়ে তৈরি হচ্ছে পশ্চিমা ধাঁচের পোশাকও। এই ধরনের পোশাকে ব্যবহার হচ্ছে গামছার প্যাচওয়ার্ক। অন্য ফেব্রিকের সঙ্গে গামছার সংমিশ্রণ পোশাকের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় বহু গুণে। যার মধ্যে রয়েছে গাউন, ওয়েস্ট কোট, জ্যাকেট, শ্রাগ, টিউনিক, স্কার্ট টপস, শর্ট টপস, লং টপস ইত্যাদি।
ছেলেদের জন্য রয়েছে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, প্যান্ট, শার্ট, ব্লেজারসহ বিভিন্ন পোশাক। নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে এবং দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বহন করতে এসব পোশাকের জুড়ি মেলা ভার। শুধু পোশাকই নয়। গামছা দিয়ে তৈরি নানাকিছু মেলে এখন। সেটি হতে পারে গয়না, ব্যাগের মতো নিত্য অনুষঙ্গ। আবার গৃহসজ্জার সামগ্রীতেও দেখা যায় গামছার ব্যবহার।

বর্তমানে গামছা শুধু পোশাকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। গামছা দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা রকম আকর্ষণীয় গয়না। ব্যাঙ্গেলস থেকে গলার মালা, কানের দুল, আংটিসহ অনেক কিছুই পাওয়া যায়। এসব গয়নায় গামছার সঙ্গে পাট, কড়ি, কাপড়, সুতা ইত্যাদি দেশি উপকরণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গামছা দিয়ে তৈরি এসব গয়না আপনার সাজসজ্জায় আনতে পারে পরিপাট্য ও নতুনত্ব।
বর্তমানে ফ্যাশনের পাশাপাশি গামছার ব্যবহারে পিছিয়ে নেই গৃহসজ্জাসামগ্রীও। বেডকভার, বালিশ, কুশনকভার, পর্দা, রানার, প্লেসম্যাট, সোফার কভার, ফ্লোরম্যাটসহ বিভিন্ন ধরনের গৃহসজ্জাসামগ্রী এখন তৈরি হচ্ছে গামছা দিয়ে। বুনন শৈলী ও বিচিত্র রঙের কারণে এগুলো গৃহসজ্জায় যোগ করে অনন্য মাত্রা। আধুনিক যুগে আমাদের দেশীয় শিল্পের টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পড়েছে হুমকির মুখে। আমাদের উচিত নিজেদের দেশ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসা। যথাসম্ভব দেশীয় পোশাক ও দেশীয় পণ্যের ব্যবহার করা।