শরীফ খান
প্রকাশ : ০৫ মে ২০২৩ ০০:২৫ এএম
আপডেট : ০৫ মে ২০২৩ ২০:৪৬ পিএম
অলংকরণ: জয়ন্ত সরকার
বাড়ির পাশে খাল। খালপাড় জোড়া বিশাল তরমুজ ক্ষেত। বৈশাখ মাস শেষ হতে চলেছে। তরমুজও শেষের পথে। বড় বড় তরমুজগুলো তো রোজার মধ্যেই ব্যাপারীরা এসে নিয়ে গেছেন গাড়ি ভরে। এখন যেগুলো আছে, সেগুলো আকারে ছোট, ওজনেও কম। তবুও কম দাম হবে না। যা গরম পড়েছে না এ বছর!
ক্ষেতের পাশে ছোট তাঁবুর মতো একখানা ঘর। পাটকাঠির বেড়া। গোলপাতার ছাউনি। এই পাহারাঘরে বসেই কাজল আর রেবার বাবা রাতভর ক্ষেত পাহারা দেন। চোরের ভয় আছে। তাড়াতে হয় ধেনো ইঁদুর। পাতিশিয়াল। কাজল আর রেবা সুযোগমতো দিনের বেলায় পাহারা দেয়। এই যেমন, এখন এই ভরদুপুর বেলায় পাহারা ঘরে বসে আছে রেবা। কাজল পড়তে গেছে বেলাল স্যারের বাড়িতে। ও ফিরলেই চলে আসবে এখানে। দুই ভাই-বোন তখন খালের জলে নেমে গোসল করবে, ডুব দেবে খালের শীতল জলে, সাঁতরাবে, শরীর জুড়োবে। ওই সময়ে এসে পড়ে পাড়ার আরো কিছু সমবয়সি ছেলেমেয়ে। সবাই মিলে যা মজা করে গোসল করে না!
কাজল এলো। বলল, চল যাই গোসল-টোসল সেরে বাড়ি যাই। দিনে তো নিরাপদ। চোর-টোর আসবে না।
বেশি ক্ষতি তো করে ধেনো ইঁদুরেরা- পাহারাঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলল রেবা- এই সিজনেই দ্যাখ কতগুলো তরমুজ ফুটো করে দিল ইঁদুরেরা! পাতিশিয়ালরা দাঁত বসাল কতগুলোতে! শোন ভাই, বাবা গেছেন হাটে, বড় এক তরমুজ ব্যাপারীর সঙ্গে দেখা করতে, মা গেছেন নানাবাড়িতে, ফিরতে রাত হবে।
পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে কাজল বলল, খোদা এবার আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেনরে!
একশোবার। কোটিবার! এই তরমুজ ক্ষেত থেকেই তো বাবা এবার লাভ করেছেন এক লাখ টাকার ওপরে। জমিও কিনেছেন দেড় বিঘা। সামনের সিজনে ওই জমিতে লাগাবে তরমুজ। আহারে! খোদার রহমত থাকলে ক্ষেতে এখন যে শখানেক ছোট ছোট তরমুজ আছে, এগুলো থেকেও আসবে কয়েক হাজার টাকা। মা বলেছেন, ছোট তরমুজের টাকা দিয়েই ঘরের চালে এবার খড়ের বদলে নতুন টিন লাগাবেন!
রেবা খুশিতে ছোট ভাইয়ের পিঠ চাপড়ে দিল। খালের জলে নেমে গোসল করছে তো করছেই- পাড়ার সবুর-হেনা-রুমা ও খোকনও আছে। একটু পরে রেবা চিৎকার দিল। আকাশ ভরে গেছে কালো মেঘে! চারদিকটা আঁধার। মেঘ ডাকছে গুড় গুড় গুড়।
খালের জল ছেড়ে উঠে পড়ল সবাই। কাজল বলল, তাড়াতাড়ি আমাদের বাড়িতে চল সবাই।
ছ’জন বালক-বালিকা ছুটে গেল রেবাদের বাড়ির উঠানে। সবাই দু-হাতে দু-খানা করে হোগলার পাটি নিয়ে ছুটল তরমুজ ক্ষেতটার দিকে। কৌশল করে সবাই মিলে পাটি দিয়ে ঢেকে দিল তরমুজগুলো।
শিলাপাত শুরু হলো। প্রথমে ছোট ছোট, তারপরে বড় বড় শিলা। হোগলার পাটিগুলোতে যেন খই ফুটছে- চটপট চটপট ...! ওরা সবাই বসা পাহারাঘরে। টানা ১০ মিনিটেই তরমুজ ক্ষেতটা বরফ সাদা হয়ে গেল। খালের জলে ভাসছে হাজার হাজার শিলা।
থেমে গেল শিলাপাত। হইচই করে ছ’জন শিশু ছুটে গেল ক্ষেতের দিকে। সব পাটি তুলে ধরা হলো। ও মা! কিছুই হয়নি তরমুজগুলোর, ভেজেওনি! চারপাশটা সাদা সাদা! তার মাঝে ছোট ছোট তরমুজগুলো যেন হাসছে।
খোকন চিৎকার দিয়ে বলল, তরমুজগুলোকে দেখতে ঠিক উটপাখির ডিমের মতো লাগছে। ঈদের সময় তো আমি ঢাকায় ছিলাম, বড় মামার বাসায়। গিয়েছিলাম ঢাকা চিড়িয়াখানায়। দেখে এসেছি উটপাখির ডিম। আমার তো মনে হয় এখান থেকে তিন-চারটে তরমুজ নিয়ে উটের ডিমের সঙ্গে অদলবদল করলে উটপাখিরা তরমুজেই তা দেবে।
আকাশফাটা হাসিতে কেঁপে উঠল চারপাশটা। তারপরে সবাই মিলে ডিগবাজি দিয়ে নামল বরফ-ভাসা খালের শীতল জলে।