আবু বকর সিদ্দিক বাবু
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:০৫ পিএম
আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৩:০৭ পিএম
সময়টা ২০১১ সাল। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন অতুল সরকার। উপজেলায় সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মাসে আট আনা (৫০ পয়সা) চাঁদা নেয়া হবে। এই অর্থ দিয়েই গঠন করা হবে ‘জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট’। পরিকল্পনা অনুসারে কাজেরও চাই বাস্তবায়ন। পদাধিকার বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হন এই ট্রাস্টের সভাপতি।
উপজেলায় স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ রয়েছে ৪১৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। শিক্ষার্থীদের প্রতিজনের কাছ থেকে নেওয়া আট আনা চাঁদার অর্থ ৫ লক্ষাধিক টাকা প্রতিবছর ‘জ্ঞানের আলো ট্রাস্টের’ হিসাবে জমা হয়। এই টাকা দিয়ে শুরু হলো বইমেলার আয়োজন।
বইমেলার পরিকল্পনা নিয়ে এই ট্রাস্টের যাত্রা শুরু হলেও এর কর্মপরিধির প্রসার ঘটতে থাকে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় এই প্রতিষ্ঠানটি।
ট্রাস্ট থেকে উপজেলার দুস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেয়া হয়। দই স্তরের বৃত্তি প্রদান করা হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় এককালীন বৃত্তি। উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের প্রদান করা হয় মাসিক বৃত্তি। মাসিক বৃত্তির পরিমাণ ১ হাজার ৫০০ টাকা। উপজেলার কোনো শিক্ষার্থী টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারছে না। এ সময় ছুটে যাচ্ছে জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্যোগকালে এই ট্রাস্টের শিক্ষার্থীরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষার্থীদের লেখা নিয়ে প্রকাশ হয়ে আসছে একটি স্মরণিকা।
নাম ‘ফাগুনের আবাহন’। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার প্রতি আগ্রহ ও উৎসাহ প্রদানের জন্য তাদের লেখাগুলো সম্পাদনা করে স্মরণিকায় প্রকাশ করা হয়। এখানে শুধু শিক্ষার্থীদের লেখাই ঠাঁই পায়। মূলত শিশু-কিশোরদের সৃজনপ্রতিভা বিকাশে এই স্মরণিকা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এই স্মরণিকায় প্রথম লেখা প্রকাশ হয়েছে এমন অনেক শিক্ষার্থী এখন দেশের বিভিন্ন মিডিয়ায় নিয়মিত লেখালেখি করছে। কোনো কোনো শিক্ষার্থীর বইও প্রকাশ হচ্ছে।
শিশু-কিশোরদের আট আনা চাঁদার অর্থে মেলার আয়োজন হওয়ায় এর স্থায়ী প্রতিপাদ্য করা হয় ‘আট আনায় জীবনের আলো’। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মেলামঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে। সেই সঙ্গে আয়োজন করা হয় বিতর্ক প্রতিযোগিতার। প্রতিবছর ৫ দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হলেও এ বছর ৭ দিনব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি উপজেলা পরিষদ চত্বরে বইমেলা শুরু হয়।
বইমেলায় আগত উল্লাপাড়া সানফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী নবনীতা বলেন, আমাদের দেওয়া মাসিক আট আনার অর্থে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাস্ট। তাই মেলা নিয়ে আমাদের আবেগ একটু বেশি। এই মেলায় উপস্থিত হয়ে যেমন নানা ধরনের বই কিনে থাকি, সেই সঙ্গে দিনভর আনন্দ উৎসবও করি।’ প্রকৃত অর্থে এই মেলাটি উল্লাপাড়া উপজেলার শিক্ষার্থীদের কাছে বাৎসরিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। হয়ে উঠেছে এক মিলনমেলা। শিক্ষার্থীরা এই মেলাকে আট আনার বইমেলা বলে থাকে। এই মেলায় বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাই স্টল নিয়ে বই বেচাকেনা করে।
জ্ঞানের আলো ট্রাস্টের উদ্যোগ সম্পর্কে কথা হয় সিরাজগঞ্জ জেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধান এইচটি ইমাম গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের আলো সম্প্রসারিত করার একটি বড় মাধ্যম অমর একুশে বইমেলা। আর এই সুযোগটি করে দিয়েছে জ্ঞানের
আলো ট্রাস্ট। জ্ঞানের আলো ট্রাস্ট আমাদের উপজেলার শিক্ষার্থীদের মানসিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে।
উল্লাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জল হোসেন জানান, শিশু-কিশোরদের চাঁদার অর্থে প্রতিষ্ঠিত এই গ্রন্থমেলা প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের বই পড়া ও জ্ঞান
অর্জনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মেলায় উপস্থিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করে। এ মেলাটি শিক্ষার্থীদেরই মেলা।