শরীফ খান
প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ ১৪:৫৩ পিএম
আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৩ ১৫:০৪ পিএম
অলংকরণ : জয়ন্ত সরকার
বাজারের থলে হাতে দোতলায় উঠেছি, টের পেলাম তাথৈ জোরে জোরে কাঁদছে। আমার অতি আদরের পুতনিটা কাঁদছে কেন! দ্রুত সিঁড়ি টপকে টপকে পাঁচতলায় উঠে দেখি সদর দরজা খোলা, দাদির কোলে চড়ে হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে তাথৈ। এগিয়ে দরজার কাছে থলেটা রেখেই দুহাত বাড়ালাম, তাথৈ ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার বুক-কোল জুড়ে, ‘দাদাভাইগো! আমার ‘টুই’ আর ‘টিউ’কে বিড়ালে নিয়ে গেছে! বাজারে যাবার সময় কেন তুমি দরজাটা খোলা রেখে গিয়েছিলে! ও দাদাভাই! এখন আমি খেলব কাদের সাথে!’
বুকের ভেতরে একটা দুঃখের কামড় অনুভব করলাম। তাইতো! বাজারে যাবার সময় তাথৈ-এর দাদি ছিল কিচেনে। ওর মা-বাবা, মানে আমার ছেলে ও পুত্রবধূ গেছে অফিসে। তাথৈ ছিল ঘুমিয়ে। দরজা ভেজানো ছিল, বেওয়ারিশ পাজি হুলোটা সুযোগ পেয়ে ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেছে চুপিসারে, ডাইনিং রুম ও অন্য একটি রুম পেরিয়ে গেছে পেছনের ব্যালকনিতে, টুইকে মেরেছে এক থাবায়, টিউকে মুখে ধরে একদৌড়ে বেরিয়ে গেছে দরজা পথে, টিউ-এর ‘টিউ টিউ’ মরণচিৎকার শুনে তাথৈ-এর দাদি ছুড়ে মেরেছিল হাতের গরম চামচটা, হুলোর পিঠে লেগেছেও। মুখের শিকার ছাড়েনি ওটা।
ব্যাপার বুঝে ইশারায় তাথৈ-এর দাদিকে বোঝালামÑ সত্যি কথাটা ওকে না বললেও চলত।
রোজকার মতো সকালে ঘুম থেকে উঠেছে তাথৈ। ওর মুখ-হাত ধুইয়ে দিয়েছে দাদি। তারপরে
কোলে বসিয়ে মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছে ভাত।
ব্যস! খাওয়া শেষ তো খেলার শুরু। সাড়ে চার
বছরের পুতনিটা আমার খুবই চালাক। রোজ ৫-৭ বার সে পেছনের ব্যালকনিতে যায় টুই আর টিউকে খাবার খাওয়াতে। ছোট খাঁচাটা থেকে বের করে মুরগির ছানা দুটিকে। বাটি থেকে চাল-ডাল-গমের গুঁড়া মুঠিতে ভরে ছড়িয়ে দেয় ওদের সামনে। ছানা দুটি ঠুকরে ঠুকরে খেত। তাথৈ বারবার ও-দুটিকে দুহাতে তুলে নিজের বুক ও চিবুকে চেপে ধরে ধরে সোহাগ করত। বুকে চেপে রাখত অনেকক্ষণ যাবৎ। রাখত নিজের মাথার উপরে। ওদের সাথে কত কথাই না বলত! নিজে দৌড় দিয়ে এরুম-ওরুমে যেত, ছানা দুটিও ‘টিউ টিউ’ ডেকে ওর পেছনে পেছনে ছুটত। তাথৈ তো হেসে কুটি কুটি। আমাকে আর দাদিকে বারবার বলত, দাদা! ওরা আমার পেছনে পেছনে আসে কেন? আমরা প্রতিবারই জবাব দিতাম, টুই-টিউ তোমাকে ওদের মা মনে করে। দাদা মনে করে। দাদি মনে করে। বাবাও মনে করে।
আমাদের কথা শুনে তাথৈ প্রতিবারই জোরে জোরে হাসত। বলত, ‘ও মা! আমি টুই-টিউর মা!’
‘নয় তো কী! আমাদের পেছনে তো ছোটে না। তাথৈমণি, তুমি ওদেরকে যেমন ভালোবাসো, আদর করো, ওরাও তোমাকে অনেক ভালোবাসে।’
আমিই দিন দশেক আগে ওকে কোলে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম বাসাবোর দিকে। ভ্যানগাড়িতে বসে একজন মহিলা হাঁস-মুরগির ছোট ছোট ছানা বিক্রি করছিল। তাথৈ মুরগির ছানা কিনবেই! কিনলাম একজোড়া। একটি ছানা হলুদাভ, অন্যটি বাদামি। সারাক্ষণ ডেকেই চলছিল। বাসায় আনার পরে খুশিতে সে কী লাফালাফি তাথৈ-এর!
দুদিন পরেই ওর দাদি নাম রেখেছিল। হলুদাভটা টুই। বাদামিটা টিউ। সেই টুই-টিউ-এর শোকে তাথৈ এখন মাতম করছে। ওকে কোলে নিয়ে ছাদে গেলাম। ফুল-পাখি-প্রজাপতি দেখালাম। না, কোনো কিছুতেই ভুলছে না। ভুলতে পারছে না টুই-টিউ-এর কথা। মোবাইলে কথা বললাম ওর দাদির সাথে। সত্যিটা না বললেই তো হতো! মরা ছানাটিকে ময়লার পাত্রে রেখে দিলে হতো না! হুলো বেড়ালের কথা না বললেই তো চলত! ‘মরা’ ব্যাপারটা কি তাথৈ এই বয়সে বোঝে!
ছাদে হাঁটতে হাঁটতে বললাম আমি, ‘দাদাভাই! টুই তো মরেনি। ঘুমিয়েছে। ঘুম থেকে উঠলেই ডাকবে টিউ টিউ করে, খুঁজবে তোমাকে। আর টিউ তো গেছে ওর নানুমির বাড়িতে বেড়াতে! দুপুরেই চলে আসবে ও!’
কথা শুনে তাথৈ যা একখানা হাসি দিল না! বলল, ‘ওর মামাবাড়ি কোথায়?’
‘ওইতো তোমার মামাবাড়ির পাশেই। খিলগাঁওয়ে।’
আবারও হাসি একখানা দিল বটে তাথৈ! সে হাসিতে চারপাশের কুয়াশা যেন মিলিয়ে গেল, ভোর থেকেই কুয়াশায় ঢেকে ছিল ঢাকা শহর। সূর্য উঁকি দিল। তাথৈ বলল, ‘দাদাভাই! তুমি গিয়ে ওকে তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। বলবে, তাথৈ কাঁদছে। ও দাদাভাই! টিউ ঘুম থেকে জাগবে কখন?’
‘চলো দেখি’, বলেই নামলাম সিঁড়ি বেয়ে। দাদির কোলে দিলাম ওকে। চিপস আনার কথা বলে নামতে শুরু করলাম সিঁড়ি বেয়ে।
ওর দাদি ওকে ঘুমিয়ে থাকা টুইকে দেখাল। তারপরে উঠে গেল ছাদে। তিরিশ মিনিটের
ভেতরই আমি ঘরে ফিরলাম। বেছে বেছে কিনেছি আবার দুটি তুলতুলে মুরগিছানা, একটি হলুদাভ, অন্যটি বাদামি। বয়সও আগের দুটির মতন।
মোবাইলে কল করলাম ওর দাদিকে। ছাদ থেকে নেমে দাদি আমার রুমে ঢুকলেন, ‘গিয়েছিলে টিউয়ের নানুমি বাড়ি?’ বলেই দাদির কোল থেকে নেমে তাথৈ এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে বলল, ‘ও দাদাভাই! আসেনি আমার টিউ? টুই-এর ঘুম ছোটেনি!’
আমি তাথৈকে কোলে নিলাম, চুমু দিলাম ওর কপালে, বললাম, ‘আমার তাথৈমণি! টুই জেগেছে। টিউকেও নিয়ে এসেছি ওর নানুমি বাড়ি থেকে।’
কথা শুনে খুশিতে তাথৈ ঘর ফাটানো একখানা চিৎকার দিল। আমার কোল থেকে নেমেই ছুটল টুই-টিউ-এর খাঁচার দিকে।