× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কাঠবিড়ালি বদলে দেবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণা

নিজামুল হক

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

কাঠবিড়ালি। ছবি: সংগৃহীত

কাঠবিড়ালি। ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা একজন হার্ট অ্যাটাকের রোগী, স্ট্রোকে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি কিংবা গুরুতর মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়া রোগীর চিকিৎসায় যদি চিকিৎসকেরা আরও কয়েক ঘণ্টা সময় পেতেন, তাহলে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। কিন্তু মানুষের শরীরের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া ও অক্সিজেনের চাহিদা সেই সুযোগ দেয় না। অথচ পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র স্তন্যপায়ী প্রাণী- আর্কটিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল (স্থল কাঠবিড়ালি) - মাসের পর মাস প্রায় মৃত্যুর মতো অবস্থায় থেকেও আবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে জেগে ওঠে। শরীরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে গেলেও তার মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ অক্ষত থাকে।

বিবিসি জানায়, এই বিস্ময়কর ক্ষমতার রহস্য উন্মোচনে কয়েক দশক ধরে গবেষণা করছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের আশা, এই প্রাণীর শীতনিদ্রার জৈবিক প্রক্রিয়া একদিন জরুরি চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ক্যানসারের চিকিৎসা, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ ভ্রমণেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

আগস্ট মাসে, যখন গ্রীষ্ম শেষের দিকে এবং দিন ছোট হতে শুরু করে, তখন একটি স্ত্রী আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালি বুঝতে পারে- শীতের জন্য শরীরে চর্বি জমানোর সময় এসেছে। তামাটে রঙের ছোট এই প্রাণীটি তুন্দ্রাজুড়ে ঘুরে ঘাস, সেজ (এক ধরনের জলজ ঘাস) ও গাছের পাতা খুঁজে খায়। 

এরপর সে তার গর্তে ফিরে যায় এবং দীর্ঘ শীতকালীন নিদ্রায় ডুবে যায়। মাটির প্রায় এক মিটার নিচে তার শরীর যেন ধীরগতির যন্ত্রে পরিণত হয়। প্রতি মিনিটে মাত্র কয়েকবার শ্বাস নেয় এবং হৃদস্পন্দনও অত্যন্ত ধীর হয়ে যায়। তাকে দেখে সহজেই মৃত বলে ভুল হতে পারে।

গর্তের উপরের মাটি যখন জমে শক্ত বরফে পরিণত হয় এবং তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়, তখন তার শরীরের তাপমাত্রাও আশ্চর্যজনকভাবে কমে যায়। তার মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নেমে আসে ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, উদরের তাপমাত্রা মাইনাস ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর পেছনের পায়ের তাপমাত্রা পৌঁছে যায় মাইনাস ২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে- যা জীবিত অবস্থায় কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন রেকর্ড।

সে টানা আট মাস খাদ্য বা পানি ছাড়াই এই অবস্থায় থাকে। মাঝেমধ্যে অল্প সময়ের জন্য জেগে উঠলেও, মাটি উষ্ণ না হওয়া পর্যন্ত সে আবার শীতনিদ্রায় ফিরে যায়। বসন্ত এলে সে আবার মাটির ওপরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। উত্তরাঞ্চলের অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীর মতো আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালিও কানাডা, আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার কঠোর শীতে টিকে থাকে শীতনিদ্রার মাধ্যমে।

তবে এদের বিশেষত্ব হলো- তারা অত্যন্ত দীর্ঘ সময় এই অবস্থায় থাকতে পারে এবং এত কম শরীরের তাপমাত্রায়ও বেঁচে থাকতে সক্ষম। এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যের কারণে আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালি এবং তাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি প্রজাতি বিজ্ঞানীদের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। গবেষকদের লক্ষ্য শুধু শীতনিদ্রার জৈবিক রহস্য উন্মোচন নয়, বরং একদিন সেই প্রক্রিয়া মানুষের চিকিৎসায়ও কাজে লাগানো।

মানুষের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) যদি নিরাপদভাবে ধীর করা যায়, তাহলে চিকিৎসকেরা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এবং মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতের রোগীদের চিকিৎসার জন্য আরও বেশি সময় পাবেন। পাশাপাশি শরীরকে উপকারীভাবে ঠান্ডা করে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। আর ভবিষ্যতে, এই গবেষণা হয়তো মহাকাশচারীদের দীর্ঘ মহাকাশযাত্রার সময় সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশন বা সাময়িক স্থগিত জীবনাবস্থায় রাখার পথও খুলে দিতে পারে।

‘যদি সত্যিই নিরাপদভাবে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিপাকক্রিয়া ধীর করা যায়, তাহলে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসার জন্য মূল্যবান সময় কেনা সম্ভব হবে’, বলেন আলাস্কা ইউনিভার্সিটি ফেয়ারব্যাঙ্কসের গবেষক সারা রাইস।

এই গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে, প্রাণিজগতের এমন চরম সহনশীল প্রাণীদের নিয়ে গবেষণা মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। 

গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আলাস্কা ইউনিভার্সিটি ফেয়ারব্যাঙ্কসের বিজ্ঞানীরা আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালি নিয়ে গবেষণা করছেন। তারা দেখেছেন, প্রাণীগুলোর শরীরে একটি অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি রয়েছে, যা দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে শীতনিদ্রার সময় নির্ধারণ করে। গবেষণাগারে বিশেষ শীতল পরিবেশে তাদের রেখে বিজ্ঞানীরা রক্ত, মস্তিষ্কের কার্যকলাপ এবং বিপাকক্রিয়ার নানা পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করেন।

এই গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল অ্যাডেনোসিন নামের একটি প্রাকৃতিক অণু। ২০১১ সালে বিজ্ঞানীরা অ্যাডেনোসিনের মতো গঠনের সিএইচএ নামের একটি যৌগ আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালির মস্তিষ্কে প্রয়োগ করে দেখেন, প্রাণীগুলো শীতনিদ্রার মতো অবস্থায় চলে যায়। তাদের বিপাকক্রিয়া ধীর হয়ে যায়, শরীর তাপ উৎপাদন বন্ধ করে দেয় এবং শরীর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে আসে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, একই অণু সাধারণ ইঁদুরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করে, যদিও তারা স্বাভাবিকভাবে কখনো শীতনিদ্রায় যায় না।

২০১৩ সালের গবেষণায় দেখা যায়, সিএইচএ প্রয়োগের পর ইঁদুরের শরীরের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে প্রায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ও হৃদস্পন্দনও শীতনিদ্রায় থাকা আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালির মতো হয়ে যায়।

তবে এই প্রযুক্তি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা এখনো সহজ নয়। মস্তিষ্কে সরাসরি ওষুধ প্রয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ, আর রক্তের মাধ্যমে অ্যাডেনোসিন দিলে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা বিকল্প পথ খুঁজছেন।

ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটি এবং ইতালির ইউনিভার্সিটি অফ বোলোনিয়ার স্নায়ু-শারীরবৃত্তবিদ ডোমেনিকো তুপোনের নেতৃত্বে গবেষকেরা ‘শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী বিশেষ স্নায়ুকোষ’ সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করার একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন।

এতে শরীর স্বাভাবিকভাবে ঠান্ডা হওয়ার চেষ্টা করে এবং বিপাকক্রিয়া, হৃদস্পন্দন ও শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে যায়। ভবিষ্যতে এই পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে মানুষের শরীরেও নিরাপদ শীতনিদ্রাসদৃশ অবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব হতে পারে বলে তাদের আশা।

গবেষকেরা আরও দেখেছেন, আর্কটিক স্থল কাঠবিড়ালি হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের পর রক্তপ্রবাহ ফিরে এলে যে অতিরিক্ত ক্ষতি হয়, তার বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী।

২০২০ সালের গবেষণায় দেখা যায়, শীতনিদ্রার সময় তাদের রক্তে আয়োডাইডের মাত্রা তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়, যা টিস্যু ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। সেই গবেষণার ভিত্তিতে মানুষের ওপরও আয়োডাইডভিত্তিক ওষুধের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং প্রাথমিক ফল আশাব্যঞ্জক। 

এছাড়া বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখছেন, কীভাবে এই প্রাণী আট মাস না নড়াচড়া করেও পেশিশক্তি ধরে রাখে এবং কীভাবে শীতনিদ্রার সময় সম্পূর্ণভাবে ক্ষুধা দমন করে। এসব গবেষণা ভবিষ্যতে পেশি ক্ষয় রোধ ও স্থূলতার চিকিৎসায় নতুন পথ দেখাতে পারে।

এই গবেষণার সম্ভাবনা শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ নয়। নাসার অর্থায়নে চলা কিছু গবেষণায় দেখা হচ্ছে, দীর্ঘ মহাকাশযাত্রায় মহাকাশচারীদের যদি নিয়ন্ত্রিত শীতনিদ্রাসদৃশ অবস্থায় রাখা যায়, তাহলে খাদ্যের প্রয়োজন, বর্জ্য উৎপাদন, পেশি ক্ষয় এবং মানসিক চাপ- সবই কমানো সম্ভব হতে পারে।

আর্কটিকের বরফাচ্ছাদিত মাটির গভীরে একটি ছোট্ট কাঠবিড়ালি নিশ্চিন্তে শীতনিদ্রায় ঘুমিয়ে থাকে। আর সেই ঘুমের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে আগামী দিনের চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন এক চাবিকাঠি, যা একদিন শুধু অসংখ্য মানুষের জীবনই বাঁচাবে না, মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের নতুন দিগন্তও উন্মোচন করবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা