× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আলব্যের কামু গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে কী শিখেছিলেন

ইকরাম কবীর

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

আলব্যের কামু

আলব্যের কামু

আমরা যারা আলব্যের কামুকে নিয়ে লিখি বা আলোচনা করি, সাধারণত তার দর্শন, সাহিত্য, অ্যাবসার্ডিজম, বিদ্রোহ এবং অস্তিত্ববাদী চিন্তাধারার কথাই বারবার বলি। তার লেখা ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’, ‘দ্য প্লেইগ’ ও অন্যান্য গল্প-উপন্যাস, নোবেল পুরস্কার পাওয়া এবং দুর্ঘটনায় তার অকালমৃত্যুর কথাই আমাদের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসে। আমরা সবসময় এমন একজন লেখকের প্রোফাইল তৈরি করি, যিনি লিখতে বসে মানবের অস্তিত্ব এবং মহাবিশ্বের নীরবতা নিয়েই শুধু ভাবতেন। কিন্তু কামু একজন প্রভাবশালী লেখক হয়ে ওঠার অনেক আগে তার একটি অন্যরকম জীবন ছিল যেখান থেকে তিনি তার প্রায় সব শিক্ষা গ্রহণ করছিলেন। 

জীবনের একটি সময় আর সব ছেলের মতো তিনি ফুটবল খেলতেন, গোলকিপারও হয়েছিলেন। মোরস্যোর উদাসীনতা গল্প আমাদের কাছে বলার অনেক আগে, কিংবা ডা. রিয়োকে মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখানোরও অনেক আগে, এই লেখক ফ্রান্সের কাছে দখল হয়ে যাওয়া আলজেরিয়ার ধুলোমাখা ফুটবল মাঠে দুই গোলপোস্টের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বল ঠেকাতেন।

কামু যখন একজন স্বনামধন্য লেখক-দার্শনিক হয়ে উঠেছেন, তখন তিনি ফুটবল নিয়ে একটি কথা বলেছিলেন, যা প্রায় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেছিলেন মানুষের নৈতিকতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা সম্পর্কে আমি যা কিছু জানি, তার সবই আমি ফুটবল থেকে শিখেছি।

এই কথাটি আমার কাছে অনেক ভালো লাগে। এর অর্থ বুঝতে হলে আমাদের জানতে হবে কামুর জীবনকে এবং যেতে হবে সেখানে, যেই পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। আলব্যের কামুর জন্ম হয়েছিল ১৯১৩ সালে আলজেরিয়ার মন্ডোভি শহরে। তখন আলজেরিয়া ছিল ফ্রান্সের এক উপনিবেশ। কামু যখন এক বছরের শিশু, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তার বাবা মারা যান। মা ছিলেন এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী। পড়াশোনা জানতেন না, কানে তেমন শুনতে পেতেন না, কানে শুনতেন না বলে তিনি কথাও কম বলতেন। মা আলব্যেরকে এবং তার বড় ভাই লুসিয়েনকে প্রচণ্ড কষ্টকর দারিদ্র্যের মধ্যে বড় করে তোলেন। তাদের বাড়িটি ছিল খুব ছোট যেখানে সবাই গাদাগাদি করে বসবাস করতেন। বাড়িটা ছিল অনেক নীরব কারণ কামুদের মা কথা না বলার কারণে দুই ভাই বাড়িতে কথা বলার কাউকে পেতেন না। আমি লুসিয়েন সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে পারিনি, তবে আলব্যের ছোটবেলায় তার চারপাশের পরিবেশ ও প্রকৃতির সাথে নিবিড় ও প্রাণবন্ত এক যোগ স্থাপন করতে পেরেছিলেন তা তার বায়োগ্রাফারদের লেখা পড়লে জানা যায়। আলজেরিয়ার রোদ, সমুদ্র, পথঘাট, মানুষের জীবন আর খেলাধুলা তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

তবে ঠিক কবে ও কখন তিনি ফুটবল খেলা শুরু করেছিলেন সেই তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি যখন আলজিয়ার্সের বেলকুর শহরে বড় হচ্ছিলেন, তখনই খেলা শুরু করেন। পরে কামু আলজেরিয়ার রেসিং ইউনিভার্সিতেয়ার দ’আলজের যুবদলে যোগ দেন। সেখানে কিছুদিন মধ্যমাঠে খেলতে গিয়ে তিনি দেখলেন যে মাঠের খেলা তিনি খেলতে পারছেন না। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে গোলকিপার হবেন। শুধু তাই নয়, গোলকিপারের কাজটা তার ভালো লেগে যায়। তবে ১৯৩০ সালে, ১৭ বছর বয়সে তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে তার ফুটবল খেলার সমাপ্তি ঘটে। 

গোলকিপারের ভূমিকায় খেলে কামু বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছিলেন। গভীর মনোযোগ, সাহস ও দায়িত্ববোধ। তার বায়োগ্রাফার অলিভিয়ে টড এবং অন্যান্য অনেক গবেষকের আলোচনায় আমরা এই বিষয়টি দেখতে পাই। গোলকিপারের অবস্থানটি খুব অদ্ভুত। তিনি দলের অংশ, তবে আবার কিছুটা দলের বাইরেও। তাকে তার টিমমেইটদের ওপর নির্ভর করতে হয়, কিন্তু বিপদ সামনে এলে শেষ পর্যন্ত তাকে একাই দাঁড়াতে হয়। গোল ঠেকাতে হয় একাই।

টডের লেখা থেকে জানা যায়, তরুণ বয়সে কামুর মন ফুটবল নিয়ে আচ্ছন্ন থাকত। তিনি ম্যাচ দেখতে যেতেন, খেলার কৌশল নিয়ে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করতেন, দক্ষ খেলোয়াড়দের পছন্দ ও প্রশংসা করতেন এবং নিজের অবসরের একটি বড় সময় ফুটবলের জন্য ব্যয় করতেন। উপনিবেশে বেড়ে ওঠা এক তরুণের কাছে ফুটবল শুধু বিনোদন ছিল না; ফুটবল একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানও ছিল। খেলার মাঠে নামলে সাময়িকভাবে শ্রেণিবিভাজনগুলো থাকত না। শ্রমিকের ছেলে, দোকানদারের ছেলেÑ সবাই একসাথে খেলতে পারত। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে আসা মানুষ কিন্তু খেলার সময় তারা একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে রেখে খেলত। কামু বুঝেছিলেন ফুটবল খেলতে টাকা-পয়সা প্রয়োজন হতো না, সামাজিক মর্যাদা প্রয়োজন হতো না, পারিবারিক প্রভাবেরও প্রয়োজন ছিল না। একটি বল আর একটি মাঠই যথেষ্ট ছিল।

মানুষে-মানুষে সংহতির প্রথম অভিজ্ঞতাগুলোর একটি কামু পেয়েছিলেন ফুটবলের মাঠেই। পরবর্তীকালে এই ধারণাই তার নৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় উপাদান হয়ে উঠেছিল তা আমরা জানি। আমরা অনেকেই আমাদের নৈতিক চিন্তার ভিত্তি গড়ে তুলি বই পড়ে, কিন্তু কামু তার জীবনের অনেক মৌলিক শিক্ষা পেয়েছিলেন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। ফুটবল মাঠই হয়ে উঠেছিল তার প্রথম ক্লাসরুম। 

এই খেলা তাকে শিখিয়েছিল যে মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একজন গোলকিপার হয়তো অসাধারণ খেলতে পারেন। কিন্তু যদি দলের রক্ষণভাগ ব্যর্থ হয়, তাহলে তার করার তেমন কিছু থাকে না। আবার রক্ষণভাগের খেলোয়াড়রা খেলার পুরো সময় প্রাণপণ লড়াই করতে পারেন, কিন্তু গোলকিপারের একটি ভুল পুরো দলের সব পরিশ্রমকে এক মুহূর্তে ব্যর্থ করে দিতে পারে। ফুটবল কামুকে দেখিয়েছিল কেউ একা জেতে না, কেউ পুরোপুরি একা ব্যর্থও হয় না। 

কামু যখন তার উপন্যাস, গল্প, নাটক এবং রচনা লিখছেন, তখন তিনি তার এই শিক্ষার প্রতিফলন দেখিয়েছেন পরতে পরতে। উদাহরণ হিসেবে ‘দ্য প্লেইগ’ উপন্যাসের কথা বলা যায়। এই গল্পে ডা. রিয়ো বুঝতে শেখেন যে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কেউ একা কোনো মহামারিকে পরাজিত করতে পারে না। অনিশ্চয়তা, ভয় এবং যন্ত্রণার মধ্যেও মানুষদের একসাথে কাজ করতে হয়। ফুটবলেও একই নীতি কাজ করে। দলের গুরুত্ব ব্যক্তির চেয়ে অনেক বড়।

রজে গ্রেনিয়ে ছিলেন কামুর প্রথম জীবনের শিক্ষক এবং পরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ক্রিটিক। তিনি লিখে গেছেন কামু সাধারণ মানুষের ভদ্রতা, সততা ও মানবিকতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কামু অনেক বিখ্যাত মতাদর্শ ও তত্ত্বকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে নৈতিকতার জন্ম হয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই।

ফুটবল খেলা তার এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল। একজন টিমমেট দলে না থাকলে পুরো দলকে তার মূল্য দিতে হয়। খেলোয়াড়দের যদি একে অপরের প্রতি বিশ্বাস না থাকে, তাহলে দল হেরে যায়। ফুটবল কামুকে ন্যায্যতার শিক্ষাও দিয়েছিল, নিয়ম শিখিয়েছিল, যেই নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। নিয়ম না থাকলে খেলা আর খেলা থাকে না। আর দলের সবার সমান দায়বদ্ধতা না থাকলে কোনো দল গড়ে ওঠে না।

পরবর্তীতে এই উপলব্ধি কামুর রাজনৈতিক চিন্তাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সারা জীবন তিনি বাম ও ডান দুই দিকের সর্বগ্রাসী মতাদর্শের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এসব মতবাদ প্রায়ই ভবিষ্যতের কোনো ইয়া-বড় লক্ষ্য অর্জনের নাম করে অন্যায়কে বৈধতা দেয়। তাই তিনি বিশ্বাস করতেন অন্যায়ের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ফুটবলের মাঠে এই সত্যটি খুব সহজেই বোঝা যায়।

ফুটবল খেলায় অনেক অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে ভালো দল সব সময় জিততে পারে না। বলের প্রতি মনোযোগ হারালেই খেলার ফলাফল বদলে যায়। এক মুহূর্তের অসাবধানতা নব্বই মিনিটের অসাধারণ পারফরম্যান্সকে ধ্বংস করে দিতে পারে। কামুর কাছে এই অনিশ্চয়তা ছিল জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। জীবন কখনও কোনো নিশ্চয়তা দেয় না। পরিশ্রম সব সময় সাফল্য নিশ্চিত করে না। সৎ ও নৈতিক হলেও পুরস্কারের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। মানুষকে কাজ করতে হয় নিশ্চিত কোনো উত্তর ছাড়াই।

এই পর্যবেক্ষণই পরে কামুর অ্যাবসার্ড বা অযৌক্তিকতার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে ফুটবল। মানুষের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার অমিল থেকেই জন্ম নেয় অ্যাবসার্ডিজম। ফুটবলের মাঠে খেলোয়াড়রা উদ্দীপনা নিয়ে প্রস্তুতি নেয়। বুদ্ধিমত্তার সাথে কৌশল সাজায়। তবুও শেষ ফলাফল অনিশ্চিত থেকে যায়। তারপরও তারা খেলে।

অনিশ্চয়তার মাঝেও খেলে যাওয়ার এই মানসিকতাই পরে কামুর ভাষায় একধরনের ‘বিদ্রোহ’ হয়ে ওঠে। মানুষ কাজ করে, চাকরি করে এই চিন্তা করে নয় যে সাফল্য আসবেই; বরং কাজটির মধ্যেই একটি মূল্য নিহিত আছে বলেই কাজ করে।

আমরা পাঠকেরা কামুকে অ্যাবসার্ডিজমের চিন্তক হিসেবে মনে রেখেছি। কিন্তু তার ফুটবল খেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, তিনি এক জীবনমুখী প্রকৃতিমুখী দার্শনিকও ছিলেন। তিনি সূর্য, বন্ধুত্ব, শরীরচর্চা, হাসি এবং মানুষের সঙ্গ ভালোবাসতেন। তার দর্শনে হতাশা ছিল না; বরং তিনি অনিশ্চয়তার মাঝেও জীবনকে পূর্ণভাবে বাঁচার আহ্বান জানিয়ে গেছেন।

ফুটবল তার এই চেতনাকে সুন্দর করে ধারণ করে। বাইশ জন মানুষ একটি বলের পেছনে ছুটে চলে, যদিও তারা জানে বিজয় নাও আসতে পারে। তারপরও তারা খেলে। খেলার অর্থ তৈরি হয় খেলার মধ্য দিয়েই। কামুর দর্শনেও আমরা এই একই ধারণার ধ্বনি শুনতে পাই। কামু বলেন, জীবন কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা