জারাদ ত্রিস্তান
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
‘খাচার ভিতর অচিন পাখি
ক্যামনে আসে যায়...
এমা খাঁচার ভিতর পাখি কই, পাখি তো চলিয়া গিয়েছে...’
কথাগুলো চেনা চেনা ঠেকছে? তাইতো। আরে এটা ‘মনের কথা’ পাপেট শোর প্রথম পর্বে বলেছিলেন বাউল। এমনই এক পাখি আমাদের নশ্বর পৃথিবীর খাঁচা থেকে উড়ে গেল।
আগে বলে নিই, ‘মনের কথা’ পাপেট শোর কথা। এই পাপেট শো প্রচার হতো বিটিভিতে। আজ আমরা যেমন মোবাইল ফোন কিংবা টিভিতে নানা রকম কার্টুন, অ্যানিমি, সিনেমা কিংবা ড্রামা দেখি তখন এমন ছিল না।
তখন আমাদের মা-বাবা, মামা-চাচা কিংবা খালা-ফুফিরা এমনকি দাদু নানুরাও অপেক্ষা করত বিটিভির এই পাপেট শোর জন্য। তাদের কাছে এই পাপেট শো ছিল অন্যতম বিনোদন।
এই পাপেট শোর সৃষ্টিকর্তা এবং বাংলাদেশের পাপেট জগতের অগ্রদূত ছিলেন আমাদের এই পাখিটি।
আমাদের এই বরণ্য পাখিটির জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘প্রার্থনা’ ও ‘বনভোজনের’ মতো কালজয়ী কবিতার লেখক গোলাম মোস্তফার কোলে। তিনি কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠ এবং নারায়ণগঞ্জের গভর্মেন্ট স্কুলে পড়ালেখা করেন। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান ছাত্র। কলকাতার চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ফাইন আর্টসে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় টেলিভিশন থেকে
‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিন-রাত অবিরাম’ গণসংগীতটি পরিচালনা করেন তিনি। গানটি উচ্চারিত হয়েছিল মাত্র দশজন শিল্পীর কণ্ঠে। কিন্তু এই পাখিটির অবদানে শ্রোতাদের কাছে মনে হচ্ছিল যেন শতসহস্র শিল্পীর কণ্ঠে গান শুনছে। এই গানটি বাঙালির মনে অসীম শক্তি জোগায়।
বহু বছর পর আবার শুরু হয়েছে জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুড়ি’। আমাদের এই মহান পাখিটি ছিলেন তার রূপকার। গ্রামবাংলার পুতুল নাচ ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। এই পুতুল নাচ দাগ কাটে এই পাখিটির মনে। এই পুতুল নাচকে কাহিনীর মাধ্যমে সংকলিত করে পাপেটের সৃষ্টি করেন তিনি।
তার বিখ্যাত পাপেটের চরিত্র ছিল বাউল, পারুল ও ষাঁড়।
একুশে ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা সকালে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি। তখন খেয়াল করি শহীদ মিনারের মাঝে সবচেয়ে বড় যে স্তম্ভটা অর্থাৎ মা স্তম্ভটির পেছনে একটি লাল বৃত্ত। উদয়মান সূর্য ও নতুন দিনের আলোর প্রতীক এই লাল বৃত্তটিও আমাদের এই পাখিটির তৈরি।
১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাসকট ‘মিশুক’-এর নামকরণ ও নকশাও করেন আমাদের এই পাখিটি।
এখন তো নিশ্চয় চেনা যাচ্ছে, এত সময়ে কোনো পাখিটির গল্প বলতে চাচ্ছি! হ্যাঁ, তিনি আর কেউ নন, পাপেটম্যান খ্যাত বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।
বাংলাদেশের পাপেট জগতে তার অবদান কি দুই এক পৃষ্ঠায় লিখে শেষ করা যাবে? আমাদের পূর্বসূরিদের কয়েক প্রজন্মের শৈশবকে যিনি রাঙিয়ে গেছেন রঙতুলি ও সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে। তিনি বাংলাদেশের গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচকে পাপেটে পরিণত করে বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরেছেন।
আমাদের এই প্রিয় পাখি গত ২৯ জুন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। আমরা হারিয়েছি সংস্কৃতির এক মহান আলোকবর্তিকাকে। তিনি যেখানেই থাকুন, থাকুন ভালো।
ষষ্ঠ শ্রেণি, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা