রূপান্তর : নিজাম বিশ্বাস
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
অলংকরণ : মেহেরুন্নিসা, অষ্টম শ্রেণি, রানী নীহার দেবী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মানিকছড়ি, খাগড়াছড়ি
সবুজ বনের বুক চিরে বয়ে গেছে এক নদী। তার বুকে ছোট ছোট ঢেউ খেলে যায়। নদীর ধারে যখন সন্ধ্যা নামে, আকাশে সিঁদুররাঙা মেঘ লুকোচুরি করে তার জলে। কোথাও জলের ওপর তুলোর মতো ভেসে ওঠে কুয়াশা। সেই শান্ত নদীর গভীর জলে থাকে ইয়ারা।
লোকে বলে, ইয়ারা একসময় মানুষ ছিল। সে খুব সাহসী মেয়ে ছিল। গ্রামের আর সব মেয়ের চেয়ে একেবারে আলাদা ছিল। শুধু যে সাহসী তা নয়, একই সঙ্গে তার সে ছিল খুব শক্তিশালী, বুদ্ধিমতী, আর নিজের কাজের প্রতি দারুণ মনোযোগী। তার এ গুণের জন্যই তাকে বিপদে পড়তে হলো। লোকজন তাকে খুব হিংসে করতে শুরু করল। পাড়া-প্রতিবেশীর পাশাপাশি ঘরের মানুষজনও তাকে সহ্য করতে পারত না। একদিন সবাই মিলে তাকে জোর করে নদীতে ফেলে দেয়।
কিন্তু নদী তাকে ডুবিয়ে মারেনি। বরং তাকে মানুষ থেকে এক জলপরী বানিয়ে দেয়। সেই জলপরী ইয়ারার চুল লম্বা, চোখের গভীর চাহনি, আর তার দারুণ সুমধুর কণ্ঠ। নদীর পাড়ে গেলে অনেকেই তার সেই সুরেলা গান শুনতে পায়। সেই মায়াবী সুর শুনলে কেউ সহজে ঘরে ফিরে আসতে পারে না।
একদিন রাফায়েল নামের এক তরুণ সেই নদীর ধারে বসে ছিল। সেদিন রাফায়েলের মনটা খুব খারাপ ছিল। দেখতে দেখতে নদীর পাড়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। হঠাৎ সে শুনল একটা মিষ্টি গান কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে। সে চারপাশে তাকাল, কিন্তু কাউকে দেখল না। সুরটা যেন জলের ভেতর থেকে আসছে।
সে ধীরে ধীরে জলের দিকে এগোল। সেখানে দেখল একটি মুখ জলের ভেতর থেকে তাকিয়ে আছে। ভারী সুন্দর এক মেয়ের মুখ। এই সেই জলপরী ইয়ারা। লোকেরা যার কথা বলে। হঠাৎ গান থেমে গেল। জলের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো,
‘এসো।’
এতই মধুর সেই ডাক, যা শুনে রাফায়েলের মনে হলো, এই ডাকে তাকে সাড়া দিতেই হবে। সে আর এক পা সামনে এগোতে যাচ্ছিল, জলের ভেতর পা রাখবে ঠিক তখনই তার মায়ের কথা মনে পড়ল। মা বলেছিল, ‘রাতে নদীর ভেতর থেকে কেউ ডাকলে যাবে না।’
সে থেমে গেল। পিছিয়ে এলো। গানের সুর ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
পরদিন সে গ্রামের বুড়ো দাদুদের কাছে গেল। গত সন্ধ্যার ঘটনা শুনে তারা তাকে বলল,
‘তার নাম ইয়ারা। সে খারাপ নয়, কিন্তু তার কষ্ট। সে মানুষকে নদীর ভেতরে নিয়ে যায়। তার ডাকে কেউ যদি জলে নামে, তবে সেখান থেকে তার ফিরে আসা কঠিন।’
রাফায়েল আবার নদীর ধারে গেল। এবার সে দূরে দাঁড়িয়ে রইল। সন্ধ্যা হলো। আবার গানের এক মিষ্টি সুর ভেসে এলো। রাফায়েল জলের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘আমি তোমার গান শুনছি, কিন্তু তোমার কাছে যাব না।’
নদীর জল একটু নড়ে ওঠে। যেন জলের ভেতর থেকে কেউ সায় দিল।
সেই দিন থেকে রাফায়েল মাঝে মাঝে নদীর কাছে আসে। দূরে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে জলপরী ইয়ারার গান শোনে।