হাবিব ওসমান, কালীগঞ্জ
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলীর স্ত্রী আফেলা বেগম
মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেটাকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি। কীসের মুক্তিযোদ্ধার কোটা! তদবির আর টাকা ছাড়া এখন চাকরি দেয় কে? অনেক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার সরকারি ঘর পেয়েছে, কিন্তু আমার কপালে আজও মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই জোটেনি। চোখে অশ্রু আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলীর স্ত্রী আফেলা বেগম। স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রাখা এক মুক্তিযোদ্ধার পরিবার আজ দারিদ্র্য, অবহেলা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।
২০০২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনসার আলীর মৃত্যুর পর গত দুই যুগ ধরে অসহায় জীবন কাটছে তার পরিবারের। বেকার ও মানসিক প্রতিবন্ধী এক ছেলেকে নিয়ে বিধবা আফেলা বেগম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অপর এক ছেলে কৃষি দিনমজুরের কাজ করে কোনোমতে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। কখনো খাবার জোটে, কখনো জোটে না। ভাঙাচোরা টিনের একটি ঘরই এখন তাদের শেষ আশ্রয়।
স্থানীয়রা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে অনেক অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে বসতবাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হলেও আনসার আলীর পরিবার সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যেও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
আফেলা বেগম বলেন, স্বামী বেঁচে থাকতে ড্রাইভারি করে কোনো রকমে সংসার চলত। ২০০২ সালে তার মৃত্যুর পর পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। বড় হতে থাকে সন্তানরা, বাড়তে থাকে সংসারের ব্যয়। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পেলেও সাত সদস্যের সংসারের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। তিন ছেলের মধ্যে একজন অসুস্থ, একজন মানসিক প্রতিবন্ধী এবং আরেকজন কৃষি দিনমজুর। চার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেলেও আর্থিক সংকটের কারণে কেউই তেমন সহযোগিতা করতে পারেন না।
তিনি বলেন, আমার শেষ ইচ্ছা, সরকার যদি একটি ঘর করে দিত, তাহলে অন্তত মাথা গোঁজার নিরাপদ একটি আশ্রয় পেতাম।
পারিবারিক সূত্র ও মুক্তিযোদ্ধা সনদ অনুযায়ী, কালীগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের মৃত ওমর আলীর ছেলে আনসার আলী ১৯৭১ সালে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট তালিকায় তার নাম ৭৭৭ নম্বরে রয়েছে। ৮ নম্বর সেক্টরের বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে অংশ নিয়ে তিনি দেশের স্বাধীনতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ২০০২ সালে মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চার মেয়ে ও তিন ছেলে রেখে যান।
সরেজমিন দেখা যায়, জরাজীর্ণ টিনের বেড়া দেওয়া ছোট্ট একটি ঘরেই কষ্টে দিন কাটছে আফেলা বেগমের। অর্থাভাবে সন্তানদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। ফলে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি পরিবারটি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার হয়েও তারা এখনও সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. সেকেন্দার আলী মোল্লা বলেন, পরিবারটির অসহায় অবস্থার কথা আমরা জানি। সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ঘর নির্মাণের সুযোগ রয়েছে। আফেলা বেগম লিখিত আবেদন করলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের জন্য সরকারি ঘরের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে। পরিবারটি দ্রুত আবেদন করলে যাচাই-বাছাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে গেলেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার পরিবার যদি মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষা করে, তবে সেটি শুধু একটি পরিবারের কষ্টের গল্প নয়, এটি আমাদের দায়বদ্ধতারও এক
নীরব প্রশ্ন।