জান্নাতুল কাওসার
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
শার্টেই বাজিমাত
আষাঢ়ের মেঘলা আকাশ, কখনও তপ্ত রোদ, আবার পরক্ষণেই ঝুম বৃষ্টি। প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণের মাঝেই বাংলাদেশের ফ্যাশন সচেতন তরুণ প্রজন্ম নিজেদের সাজিয়ে তুলছে নতুন রূপে। ২০২৬ সালের ফ্যাশন ট্রেন্ডে এখন একটাই মূলমন্ত্র, ‘কমফোর্ট ইজ দ্য নিউ স্টাইল’। অর্থাৎ, আরামের সঙ্গে কোনো আপস নয়, তবে স্টাইলে থাকা চাই ষোলো আনা আধুনিক। আর এই চিরন্তন সমীকরণে ফ্যাশনপ্রেমীদের আলমারিতে বরাবরের মতোই রাজত্ব করছে ‘শার্ট’।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় শার্ট মানে কেবলই চার দেয়ালের ভেতরের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা অফিসিয়াল পোশাক নয়। আজকের দিনে শার্ট শুধু পুরুষের একচেটিয়া পোশাকও নয়; আধুনিক নারীর ওয়ারড্রোবেও এটি এখন একটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও অপরিহার্য ফ্যাশন আইটেম। বরং সমসাময়িক ফ্যাশন দর্শনে শার্ট হয়ে ওঠেছে এমন একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা একইসঙ্গে একজন মানুষের ব্যক্তিগত আরাম, রুচিশীল ব্যক্তিত্ব এবং আধুনিক মনস্কতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর কাটিং, ফেব্রিক এবং পরিধানের ধরনে এসেছে আমূল পরিবর্তন- যা আমাদের প্রথাগত পোশাকের ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।

আরামের সঙ্গে স্টাইলের জুটি
চলতি ২০২৬ সালের ফ্যাশন ট্রেন্ডের মূল চাবিকাঠি হলো ‘ফাংশনাল মিনিমালিজম’ এবং ‘জেন্ডার-ফ্লুইডিটি’। অর্থাৎ পোশাকটি দেখতে যতটা না জমকালো হবে, তার চেয়ে বেশি হবে আরামদায়ক এবং বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী। আর শার্ট এখানে বিনা প্রতিযোগিতায় শতভাগ নম্বর পেয়ে জয়ী হওয়া পোশাক। ২০২৬ সালের ফ্যাশন ট্রেন্ডে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ‘রিল্যাক্সড ফিট’ বা ঢিলেঢালা কাটের শার্ট। ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনকার ক্রেতারা শুধু সুন্দর পোশাক নয়, আরামদায়ক পোশাকও খুঁজছেন। ফলে ওভারসাইজড, ড্রপ-শোল্ডার এবং বক্সি কাটের শার্ট নারী-পুরুষ উভয়ের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ফ্যাশন সচেতন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি ব্র্যান্ডের নাম আর্টেমিস। অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই তাদের পোশাক রয়েছে। আর্টেমিসে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্যই শার্ট পাওয়া যায়। আমাদের দেশের আবহাওয়ায় কী ধরনের ডিজাইন ও ফেব্রিক মানানসই হলে ভালো হয় সে সম্পর্কে জানতে চাইলে আর্টেমিসের কর্ণধার ফাইজা আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়। তাই আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে কটন, লিলেন, জর্জেট, সিল্ক ফেব্রিক ফ্যাশন বা স্টাইলে মানানসই। তার সঙ্গে এটাও বিবেচনায় রাখা জরুরি যে পোশাকটি কেমন পরিবেশ ও প্রোগ্রামে পরা হচ্ছে। তবে যেহেতু বাংলাদেশের আবহাওয়া বেশিরভাগ সময় গরম থাকে তাই স্বস্তি ও আরামে সুতি লিলেন ফেব্রিক পরতে কমফোর্টেবল হয়।
আর্টেমিসের শার্টগুলো কোন ফেব্রিকের এবং কোন বিষয়গুলো ভাবনায় রেখে করা হয়েছে জানতে চাইলে ফাইজা বলেন, আমাদের কাছে তরুণ-তরুণীদের জন্য দেশের আবহাওয়া উপযোগী শার্ট পেয়ে যাবেন। কটন ও মিক্সড কটন ফেব্রিকে আমরা শার্টগুলো তৈরি করেছি। আমাদের শার্টগুলো ট্র্যাভেল সিরিজের জন্য একদম পারফেক্ট। এগুলোতে ট্রপিকাল থিম রেখে মিক্সড কটন ফেব্রিক ডিজিটাল প্রিন্ট মাধ্যমে কাজগুলো করা হয়েছে।
আমাদের গরম আবহাওয়ার দেশে কটন, লিনেন ও কটন-ব্লেন্ড শার্টের চাহিদা বাড়ছে। হালকা কাপড়ের শার্ট একদিকে যেমন আরাম দেয়, অন্যদিকে স্মার্ট লুকও নিশ্চিত করে।
মেয়েদের শার্টে বহুমাত্রিক ফ্যাশন
মেয়েদের ফ্যাশনে শার্টের আগমন বহু আগে হলেও, এখন এটি আর কেবলই ‘ওয়েস্টার্ন আউটফিট’-এর অংশ নয়। বরং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব ফিউশন। বর্তমান সময়ের কর্মজীবী নারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের পোশাকের দিকে তাকালে শার্টের একটি রাজকীয় ও স্বাধীন রূপ চোখে পড়ে।

তরুণীদের বেশ পছন্দের আরও একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড ঈহা। ঈহাতেও মেয়েদের জন্য কয়েক ধরনের শার্ট রয়েছে। যারা ভিন্ন ধরনের শার্ট ক্যারি করতে চান, ফ্যাশন স্টেটমেন্টে চান নতুন ও ভিন্ন কিছু তাদের কাছে এই শার্টগুলো ইতোমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে। ঈহাতে যে শার্টগুলো মেয়েদের জন্য বানানো হয়েছে সেগুলোতে কোন কোন বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছেÑ এ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঈহা’র কর্ণধার মৌরী নাজনীন বলেন, ‘শার্টটা মূলত মেয়েরা দৈনন্দিন কাজে একটু আরাম, ক্যারি করতে সুবিধা- সেই হিসেবেই পরে। তাই ম্যাটেরিয়েল সিলেকশনেও আমরা আরাম ও ব্যবহার উপযোগিতাকেই প্রাধান্য দেই। সেক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব প্রিন্টের সিল্কের ডিজিটাল প্রিন্টের শার্টগুলোর চাহিদা ব্যাপক। এই সিল্কটা গরমেও আরামদায়ক, আবার আয়রনের ঝামেলা নেই। তাই স্টুডেন্ট থেকে কর্মজীবীÑ সব শ্রেণির মেয়েদের বেশ পছন্দ। এর পাশাপাশি হ্যান্ড পেইন্ট, এমব্রয়ডারি, ব্লক এই কাজগুলোর শার্টের আলাদা ক্রেতা রয়েছে। ভিন্নধর্মী উপস্থাপনার কারণে এই ধাঁচের শার্টগুলোর জনপ্রিয়তাও বেশ।’
বর্তমানে তরুণীরা জিন্স, পালাজ্জো, স্কার্ট কিংবা শাড়ির সঙ্গেও শার্ট স্টাইল করছেন। একটি সাদা ওভারসাইজড শার্ট কোমরে বেল্ট দিয়ে পরলে যেমন পাওয়া যায় ফিউশন লুক, তেমনি শাড়ির সঙ্গে নট বেঁধে পরলে তৈরি হয় সমসাময়িক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
ওভারসাইজড ‘অ্যান্ড্রোজিনাস’ লুক
মেয়েরা এখন ছেলেদের আলমারি থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি বড় সাইজের শার্ট পরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। তবে এর মধ্যে যোগ হয়েছে সূক্ষ্ম স্টাইলিং। ঢিলেঢালা শার্টের একপাশ ট্রাউজারের ভেতর গুঁজে দেওয়া (ফ্রেঞ্চ টাক) কিংবা কোমরে একটি স্লিম বেল্ট বেঁধে পুরো লুকটাকে বদলে দেওয়া এখনকার খুব চেনা দৃশ্য।

লেয়ারিং ও শ্রাগ স্টাইল
সরাসরি শার্ট বোতাম আটকে পরার চেয়ে মেয়েদের ফ্যাশনে এখন লেয়ারিং বেশি জনপ্রিয়। ভেতরে একটি সলিড সাদা বা কালো ক্রপ টপ অথবা ক্রু-নেক টি-শার্ট পরে, ওপর দিয়ে একটি হালকা সুতি বা রেয়ন কাপড়ের শার্ট বোতাম খোলা রেখে শ্রাগের মতো করে পরা হচ্ছে। এটি যেমন রোদ থেকে ত্বককে বাঁচায়, তেমনি লুকে আনে এক দারুণ ক্যাজুয়াল বোহো ভাইব।
প্রিন্ট ও প্যাটার্নের নতুন ধারা
ডিজিটাল প্রিন্টের চেয়ে মেয়েরা এখন বেশি ঝুঁকছেন স্ট্রাইপ এবং ক্লাসিক পোলকা ডটের দিকে। বিশেষ করে লম্বালম্বি চিকেন স্ট্রাইপের শার্টগুলো পরলে শরীরকে কিছুটা স্লিম ও লম্বা দেখায়, যা করপোরেট লুকে একধরনের প্রফেশনাল এলিগেন্স এনে দিচ্ছে।

ছেলেদের শার্টের নয়া রূপ
বিগত কয়েক দশকে ছেলেদের ফ্যাশনে শার্টের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, ২০২৬ সালের ট্রেন্ড ছেলেদের পোশাকের চেনা ছকটাকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে। ফর্মিং বা ফিটিং কাটের চেয়ে এখনকার ছেলেরা প্রাধান্য দিচ্ছে শরীরকে শ্বাস নিতে দেওয়া ঢিলেঢালা কাটিংকে।
কিউবান কলারের রাজত্ব
গত দুই বছর ধরে রাজত্ব করা কিউবান বা ক্যাম্প কলার (খোলা ছড়ানো গলার নকশা) ২০২৬ সালে এসে আরও বেশি রিফাইন্ড বা পরিমার্জিত হয়েছে। এখন আর শুধু সমুদ্র সৈকতে পরার বিচ-শার্ট হিসেবে নয়, বরং ক্যাফে আড্ডা থেকে শুরু করে সেমি-ফরমাল মিটিংয়েও কিউবান কলারের শার্টের সঙ্গে ব্লেজার বা লাইট জ্যাকেট লেয়ারিং করা হচ্ছে। শার্টের নিচের অংশ এখন আর খুব লম্বা রাখা হয় না, বরং কোমর বরাবর একটু ছড়ানো বা ‘বক্সি’ কাটের শার্ট এখন ইন-ট্রেন্ড।
ফেব্রিকের টেক্সচার গেম
এখনকার ছেলেরা শুধু একরঙা প্লেইন সুতি কাপড়ে আটকে নেই। ২০২৬ সালের বাজারে তুমুল জনপ্রিয় ‘ওয়াফল নিট’ এবং সিয়ারসাকার ফেব্রিক। এই কাপড়গুলোর নিজস্ব একটা ত্রিমাত্রিক টেক্সচার বা বুনন থাকে, যা ইস্ত্রি না করলেও চমৎকার দেখায়। এছাড়া শতভাগ প্রিমিয়াম লিনেন কাপড়ের কদর এখন আকাশচুম্বী, যা তীব্র গরমেও শরীরকে ঠান্ডা রাখে।
উজ্জ্বল রঙ থেকে মাটির কাছাকাছি
চড়া লাল, নীল বা নিয়ন রঙের দিন শেষ। এখনকার ছেলেদের পছন্দের কালার প্যালেটে জায়গা করে নিয়েছে ‘আর্থ টোন’ বা মাটির কাছাকাছি রঙ। অফ-হোয়াইট, টোস্টেড আমন্ড, হালকা অলিভ এবং ডাস্টি রোজ-এর মতো সফ্ট বা মিউটেড রঙগুলো এখনকার ছেলেদের প্রথম পছন্দ।
ইউনিসেক্স ফ্যাশনের উত্থান
ফ্যাশন বিশ্বে বর্তমানে জেন্ডার-নিউট্রাল বা ইউনিসেক্স পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। সেই ধারায় শার্ট অন্যতম প্রধান পোশাক। একই ডিজাইন, একই কাট এবং একই রঙের শার্ট নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে ওভারসাইজড অক্সফোর্ড শার্ট, লিনেন শার্ট এবং গ্রাফিক শার্ট এখন তরুণ প্রজন্মের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। ব্যক্তিত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবেও শার্ট নতুনভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
শার্ট গাইডের ইন অ্যান্ড আউট
ইন (যা এখন ট্রেন্ডি):
আউট (যা এখন ব্যাকডেটেড):
কোথায় পাবেন ট্রেন্ডি শার্ট?
চমৎকার ট্রেন্ডি শার্টগুলোর খোঁজে আপনি ঢুঁ মারতে পারেন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বেশ কিছু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের আউটলেটে। প্রিমিয়াম কোয়ালিটির লিনেন, কটন কিংবা টেক্সচার্ড ওয়াফল নিট শার্টের জন্য এই মুহূর্তে তরুণদের প্রথম পছন্দ ব্লুচিজ, ক্লাবহাউজ, সেইলর এবং ইয়েলো। আধুনিক ফিউশন ও মেয়েদের ওভারসাইজড শার্টের দারুণ কালেকশন পেয়ে যাবেন তাগা, আড়ং এবং আর্টিসান-এর আউটলেটগুলোতে। এছাড়া একটু কম বাজেটে চমৎকার সব ক্যাজুয়াল ও ড্রপ-শোল্ডার শার্টের জন্য ঢাকার নূরজাহান মার্কেট, যমুনা ফিউচার পার্ক ও বসুন্ধরা সিটির বিভিন্ন ট্রেন্ডি শপগুলো ঘুরে দেখতে পারেন। আর অনলাইনের যুগে ঘরে বসে কেনাকাটার জন্য পছন্দের ব্র্যান্ডগুলোর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজ তো রয়েছেই।