আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
মডেল : প্রিয়সী পল, দোলা রাজন পল ছবি : অভিজিৎ নন্দী
বর্ষা শুধু মন ভালো করার জন্যই আসে না, কখনও কখনও হয়ে ওঠে প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে ভালো থাকার উপলক্ষ। এই বৃষ্টি-বর্ষা নিয়ে কত কবি লেখক কতশত লেখা লিখেছেন তার হিসাব নেই। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে তাই প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে আনন্দের।
তোমার প্রিয় ঋতু বর্ষা তাই, সারা বছর ধরে মেঘ জমাই, যদিও ইচ্ছেরা সাদাসিধে, সারা বছর থাক না রেইনি ডে- উপল সেনগুপ্ত ও নীলাঞ্জনের গাওয়া এই গান শুনে বর্ষাকে ভালো না বেসে কি থাকা যায়? ভালোবাসার মানুষদের সঙ্গে থাকলে এই বর্ষা মৌসুম যেন আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে।
আমরা যারা শহরে থাকি তাদের কাছে বৃষ্টি এক ভোগান্তির নাম। খুব সকালে উঠে ঘরের কাজ সেরে যাদের কাজের খাতিরে বাইরে যেতে হয় তারা কখনোই বৃষ্টিকে মন ভরে উপভোগ করতে পারেন না। সেই সঙ্গে বাচ্চাদের স্কুল, ইউনিভার্সিটির ক্লাস, দরকারি কাজে বাইরে যাওয়াসহ নানা কাজ থাকে বলে বৃষ্টিকে ভোগান্তির তালিকাতেই ফেলতে হয়। অথচ এই বৃষ্টির মুহূর্ত কিন্তু খুব বেশি দিন থাকে না। যে কটা দিন থাকে, ভালোবেসে আলগোছে আপন করে নিলে খুব একটা মন্দ হয় না।

বৃষ্টিকে যেভাবে ভালোবাসতে পারেন
বৃষ্টিকে আবার ভালোবাসা যায় কীভাবে? কি অদ্ভুদ প্রশ্ন! মজার ব্যাপার হচ্ছেÑ বৃষ্টির পানিকে আপনি হাত দিয়ে যখনই ছুঁয়ে দেবেন, তখনই অদ্ভুত এক শিহরন জাগবে মনের মাঝে। খুব ইচ্ছা করবে কাছের মানুষ, প্রিয় মানুষ একটু পাশে থাকুক। এই যে ভালো লাগার অনুভূতিটুকু এটাই বৃষ্টিকে ভালোবাসতে শেখায়। ব্যস্ত নগরীতে সব কাজকে পাশে রেখে দুদণ্ড দুজনে পাশাপাশি বসে বৃষ্টিকে উপভোগ করতে পারেন।
বৃষ্টির দিনগুলোতে যা যা করতে পারেন
একসঙ্গে রান্না
সম্পর্কের ভালো লাগা শুধু সংসারের একঘেয়ে দায়িত্ব পালনের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে না। কখনও কখনও দায়িত্বের বাইরে গিয়ে একসঙ্গে মিলে কিছু সময় কাটানোর বন্দোবস্ত করতে হয়। বৃষ্টি নামলে এমনিতে খিচুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। দুজনে মিলে একসঙ্গে রান্না করতে পারেন খিচুড়ি। সেই প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য দুজনে মিলে কাজ ভাগ করে নিতে পারেন। চাল-ডাল ধোয়া, পেঁয়াজ কাটা, মসলা তৈরি করা, মাংস কষানোÑ সবকিছু দুজনে মিলে করুন। এতে সময় তো ভালো কাটবেই, রান্নার আনন্দও দ্বিগুণ হয়ে যাবে।
সিনেমা দেখা
পুরো সপ্তাহ ধরে একটা সিনেমা দেখার সময় পান না? অথবা বেশ কয়েক মাস হলো একা সিনেমা দেখতে বসলেই বিরক্ত লাগে? তাহলে বৃষ্টির দিনকেই উপলক্ষ বানিয়ে ফেলুন। দুজনে মিলে পছন্দের সিনেমা বেছে নিন। পপকর্ন, কোক, ডেজার্ট আইটেম, নাচোসের মতো স্ন্যাকস সঙ্গে নিয়ে বসে পড়ুন। রোমান্টিক, থ্রিলার বা ক্ল্যাসিক যেকোনো ধরনের সিনেমা দেখতেই ভালো লাগবে এমন দিনে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি আর সঙ্গে পছন্দের মানুষ- বৃষ্টির দিনে এই মুহূর্তগুলো হয়ে ওঠে বেশ উপভোগ্য।

কফি ডেট
বৃষ্টির দিনে বাইরে যাওয়া হচ্ছে না? মন খারাপ না করে দুজনে মিলে ঘরেই করে ফেলুন কফি ডেট। জানালার পাশে দুটো চেয়ার টেনে কফি টেবিলে কাপ রেখে গল্প জুড়ে দিন দুজনে। চাইলে ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে দিতে পারেন। এতে বেশ সুন্দর মোমেন্ট তৈরি হবে। এবার দুজনে বসে পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করুন, দেখুন ভালো লাগার আবেশ কেমন পরশ বুলিয়ে যাবে।
ইনডোর গেম
বৃষ্টির দিনে দুজনেই বাসায় রয়েছেন? বাইরে যাওয়াও হচ্ছে না, আবার ঘরেও বোর লাগছে? তাহলে ঘরোয়া খেলাতেই দারুণ সময় উপভোগ করতে পারেন। বাসায় লুডু, দাবা, ক্যারম, তাস বা মনোপলি যেই খেলাই থাকুক না কেন, সেটা নিয়েই দুজনে বসে যান। খেলার আগে অবশ্য ছোটখাটো শর্ত জুড়ে দিতে পারেন। যেমনÑ আজকে যে হারবে বিকালের নাশতা বানাবে। এতে পরিবেশ আরও মজার হবে। খেলার প্রতি উৎসাহ বাড়বে। সঙ্গে প্রিয়জনের সঙ্গে উপভোগ্য সময়ের ব্যাপার তো রইলই।
প্লে-লিস্ট শেয়ারিং
হেডফোনের এক পাশ নিজের কানে আর অন্য পাশ সঙ্গীর কানে দিয়ে দুজনে মিলে পছন্দের গান শুনতে পারেন। চাইলে ঘরের মাঝেই হালকা চালে একটু কাপল ড্যান্সও করে নিতে পারেন। বৃষ্টির দিনে দুজনে মিলে যদি বারান্দায় বসেন, তবে ব্যাকগ্রাউন্ডে খুব হালকা ভলিউমে মিউজিক বা ইনস্ট্রুমেন্টাল বাঁশির সুর ছেড়ে রাখতে পারেন। এটি চারপাশের পরিবেশকে নিমেষেই প্রশান্তিময় করে তুলবে।
হোম স্পা
দুজনে মিলে একে অপরকে একটু প্যাম্পার করতে পারেন। চুলে তেল ম্যাসাজ করে দেওয়া, হালকা হেড ম্যাসাজ বা ফুট স্পা করে দেওয়া; এতে শারীরিক ও মানসিক দুই ক্লান্তিই দূর হবে এবং পরস্পরের প্রতি যত্নশীলতা বাড়বে।
লিভিং রুমে ক্যাম্পিং
ঘরের সোফার কুশন, চাদর আর কোলবালিশ দিয়ে লিভিং রুমের মেঝেতেই একটা ছোট্ট তাঁবু বা বসার জায়গা বানিয়ে ফেলুন। মেঝেতে কুশন ছড়িয়ে দুজনে শুয়ে-বসে গল্প করুন। ঘরের মেইন লাইট নিভিয়ে ফেইরি লাইট জ্বালিয়ে দিলে পরিবেশটা ম্যাজিক্যাল দেখাবে।
ঘর রি-অ্যারেঞ্জ করা
অলসভাবে বসে না থেকে দুজনে মিলে ঘরের আসবাবপত্রের জায়গা একটু অদলবদল করতে পারেন। খাটের পজিশন বদলানো বা সোফাটা জানালার পাশে নিয়ে আসাÑ একসঙ্গে ঘর গোছালে যেমন ক্রিয়েটিভ কাজ হয়, তেমনি ঘরের লুকেও একটা নতুনত্ব আসে।
বই পড়ে শোনানো
একজন বিছানায় আরাম করে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকবেন, আর অন্যজন পছন্দের কোনো গল্প বা কবিতা চমৎকার কণ্ঠে পড়ে শোনাবেন। এই অভ্যাসটি সম্পর্কের মাঝে দারুণ রোমান্টিকতা তৈরি করে।
কুইজ বা কাপল গেমস
অনলাইনে প্রচুর ‘কাপল কুইজ’ বা ‘Relatshonship Questions’ পাওয়া যায়। সেগুলো বের করে একে অপরকে ধরুন। যেমন : ‘আমার সবচেয়ে প্রিয় পোশাক কোনটা?’ বা ‘আমাদের প্রথম ডেটে আমি কী রঙের জামা পরেছিলাম?’ ভুল উত্তরের জন্য মজার কোনো মজার শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে পারেন।
ডিজিটাল ডিটক্স ও স্ক্র্যাপবুকিং
অন্তত ৩ ঘণ্টার জন্য দুজনের ফোন একদম সাইলেন্ট করে অন্য ঘরে রেখে দিন। এরপর প্রিন্ট করা পুরনো ছবি, রেস্তোরাঁ বা সিনেমার বিলের কপি (যদি জমানো থাকে) দিয়ে দুজনে মিলে একটা মেমোরি বুক বা স্ক্র্যাপবুক তৈরি করা শুরু করুন। পুরনো স্মৃতি মনে করার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দর সময়ও কাটবে।
ইউটিউব দেখে ম্যাসাজ বা ইয়োগা
দুজনে মিলে ইউটিউবে কোনো কাপল ইয়োগা বা রিল্যাক্সিং ম্যাসাজ টেকনিকের টিউটোরিয়াল দেখে তা একে অপরের ওপর ট্রাই করতে পারেন।
ভার্চুয়াল ট্রাভেলিং
বড় স্ক্রিনে বিশ্বের সুন্দর কোনো শহরের (যেমন কিয়োটোর বৃষ্টি বা প্যারিসের রাস্তা) ‘4K Walking Tour’ ছেড়ে দিন। ঘরের আলো নিভিয়ে, হাতে কফির মগ নিয়ে মনে মনে দুজনে হারিয়ে যান সুদূর কোনো দেশে।
রিকশায় ঘোরা
ভালোবাসার মানুষটি বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসে? এই সুযোগ কি তাহলে হেলায় হারানো ঠিক হবে? তার পছন্দের পোশাক পরে তাকে নিয়ে বের হয়ে পড়ুন রিকশায় ঘুরতে। কিছুক্ষণ রিকশায় ঘুরে তার পছন্দের ফুল কিনে দিন, পছন্দের খাবার খান। দেখবেন মনে রাখার মতো দিন তৈরি হয়ে গেছে।
আপনি কি একজন প্লুভিওফাইল
প্লুভিওফাইল(Pluviophile) শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেঘলা আকাশ, জানালার কাচে জলের ফোঁটা আর মাটির সোঁদা গন্ধ। সহজ কথায়, যারা বৃষ্টি ভালোবাসেন, বৃষ্টির দিনে এক অদ্ভুত মানসিক শান্তি খুঁজে পান, তাদের ‘প্লুভিওফাইল’ বলা হয়।

শব্দটি এসেছে দুটি ল্যাটিন ও গ্রিক শব্দ থেকে— Pluvial : যার অর্থ বৃষ্টি বা বর্ষণ। Phile : যার অর্থ প্রেমী বা ভালোবাসার মানুষ।
এরা সাধারণত ইন্ট্রোভার্ট, সৃজনশীল ও সংবেদনশীল হন। এরা বৃষ্টিকে বিভিন্ন কারণে ভালোবাসেন, যেমন বৃষ্টি পড়ার সময় এর প্রশান্তিদায়ক শব্দ বা ভারী বর্ষণের পর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ। এ ছাড়া প্লুভিওফাইলরা বৃষ্টির দিনে প্রকৃতিকে উপভোগ করেন, একাকিত্ব উপভোগ করেন। তারা বুঁদ হয়ে বিষণ্ন আকাশ দেখেন এবং মেঘের গর্জন শুনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এমন মানুষগুলো জীবন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতে সময় ব্যয় করেন। এই কারণেই যারা বৃষ্টি ভালোবাসেন, তারা খুব চিন্তাশীল ও জ্ঞানীও হন।
শুধু বৃষ্টিতে ভেজা নয়, একজন প্লুভিওফাইলের বৃষ্টির সঙ্গে এক ধরনের মানসিক ও আত্মিক যোগাযোগ থাকে। চলুন দেখে নেওয়া যাক আপনি নিজে একজন প্লুভিওফাইল কি না, তা বোঝার কিছু লক্ষণ :
ইন্ট্রোভার্ট
আপনি কি জানেন, বৃষ্টি হলেই কেঁচো বাইরে বেরিয়ে আসে। বৃষ্টিপ্রেমীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বৃষ্টি হলেই তারা তাদের কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসেন। তারা নিজেদের রিল্যাক্স মুডে রাখেন এবং নিঃশব্দে তাদের চারপাশের সঙ্গ উপভোগ করেন। যদিও বৃষ্টিপ্রেমীরা সাধারণত একা সময় কাটাতে পছন্দ করেন এবং খুব কম সময়ই তারা অন্যের কাছে নিজেকে প্রকাশ করেন। খুব সাধারণভাবেই তাদের প্রিয় পানীয় চা বা কফি।
বৃষ্টির শব্দে পরম শান্তি
অনেকের কাছে বৃষ্টির শব্দ কোলাহল মনে হলেও একজন প্লুভিওফাইলের কাছে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সুর (White Noise)। এই শব্দ তাদের স্ট্রেস বা মানসিক চাপ নিমেষেই কমিয়ে দেয়। রাতে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে তারা খুব দ্রুত ও শান্তিময় ঘুমে তলিয়ে যেতে পারেন।
মাটির সোঁদা গন্ধের মায়া
শুকনো মাটিতে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লে যে অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ বের হয় (যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘পেট্রিকোর’/ Petrichor বলা হয়), তার প্রেমে মগ্ন থাকেন প্লুভিওফাইলরা। এই গন্ধ তাদের মনে এক ধরনের নস্টালজিয়া বা সুখের অনুভূতি তৈরি করে।
মেঘলা আকাশেই মন ভালো
সাধারণত মানুষ রৌদ্রোজ্জ্বল দিন পছন্দ করে, কিন্তু প্লুভিওফাইলদের মন ভালো হয়ে যায় আকাশ মেঘলা করলে। ধূসর আকাশ, মেঘের ডাক আর ঝিরিঝিরি বাতাস তাদের ভেতরের সৃজনশীলতাকে জাগিয়ে তোলে। এই আবহাওয়ায় তারা সবচেয়ে বেশি ফ্রেশ অনুভব করেন।
জানালা আর কফির কাপ
বৃষ্টির দিনে ঘরের কোণে জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকা এদের অন্যতম প্রিয় কাজ। হাতে এক কাপ চা বা কফি আর ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা কোনো গানÑ ব্যস, এদের আর কিছুই চাই না।
সৃজনশীল
প্লুভিওফাইলরা বৃষ্টি সম্পর্কে পড়তে, শুনতে, লিখতে এবং আঁকতে পছন্দ করেন অর্থাৎ কবিতা, গল্প, গান তাদের পছন্দের বিষয়। বৃষ্টির দিনগুলো এ ধরনের মানুষের ওপর একটি শান্ত প্রভাব এনে দেয়। তাই তারা বৃষ্টিতে হাঁটা, বৃষ্টিতে ভেজার মতো কাজগুলো উপভোগ করেন।