সাহিত্য জার্নাল
ইমতিয়ার শামীম
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০২৬ ১৪:৫৬ পিএম
আপডেট : ১৩ মিনিট আগে
ওরহান পামুক, জন্ম: ৭ জুন ১৯৫২
ওরহান পামুকের জন্মদিন চলে গেল এই তো সপ্তাহখানেক আগে। না প্রাচ্য, না প্রতীচ্য এমন এক দেশে জন্ম নেওয়ার পর যিনি এখনও খুঁজে ফিরছেন তার আত্মপরিচিতি, খুঁজে ফিরছেন অতীতের দ্বন্দ্বের সেই সব বহুরৈখিক চিহ্ন, যেসবের কারণে তাকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে এমন এক বর্তমানের। একটি-দুটি বইয়ের জন্যে নয়, একাধিক বইয়ের কারণেই তিনি আলোচিত-সমালোচিত শুধু নিজের দেশ তুরস্কে নয় পৃথিবীজুড়েও; তার জন্মদিন এখন কেবল পরিবার-স্বজন বা বন্ধুদের গণ্ডিতেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পড়ুয়াদের কাছেও উদযাপনের দিন।
তবে জন্মদিন উপলক্ষে নয় ওরহান পামুকের কথা মনে হওয়ার কারণ, সাহিত্যের রাষ্ট্রহীনতার তিনিও এক বড় উদাহরণ। তাকে বারবার, কারও কারও মতে সবচেয়ে বেশিবার যে প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়েছে যে প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে হয়েছে, সেটি হলো, লেখালেখি করেন কার জন্য? কেন লেখেন, এই প্রশ্নটি অবশ্য হুবহু এরকম নয়। কিন্তু দু’য়ের মধ্যে সম্পর্ক একেবারে যে নেই, সে কথাও বলা যায় না। দুটোকেই একসঙ্গে নিয়ে বলা চলে কার জন্য লেখালেখি, কেন এই লেখালেখি এই প্রশ্নগুলো কি লেখক, কি পাঠক সবার কাছেই চিরজিজ্ঞাস্য ধাঁধা। বারবার এই প্রশ্ন জাগে, কোনো না কোনো উত্তরও মেলে অবশ্য; কিন্তু তারপরও কি প্রশ্নকারী, কি উত্তরদাতা দুজনেই অতৃপ্ত থাকেন, মনে হয় প্রশ্নের উত্তর মিলল না পুরোপুরি, মনে হয় কিছু কথা অব্যক্তই রয়ে গেল উত্তর দিতে গিয়ে। তাই প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসতেই থাকে, প্রশ্নের উত্তরও ঘুরেফিরে বারবার রচিত ও ব্যক্ত হতে থাকে। তবে এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুব কমই অনুসন্ধান করা হয়, একজন মানুষ কী করে পাঠক হয়ে ওঠেন এবং চিরকাল কেবল পাঠকই থাকেন। যদিও প্রশ্নটি গুরুত্বহীন নয়, তবুও এটি খুব কমই জাগে। অথচ শুধু সাহিত্যের স্বার্থে নয়, বইয়ের স্বার্থে নয় আমাদের এই পৃথিবীটার বেঁচে থাকার সঙ্গেই এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের বিষয়টি জড়িয়ে আছে।

আমি নিজে কী করে ওরহান পামুকের পাঠক হয়ে উঠেছিলাম, এবার একটু এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখি।
আমার ওরহান পামুক পড়া শুরু হয়েছিল ‘স্নো’ নামের বইটি দিয়ে, বইটি পেপারব্যাকে ছাপা হওয়ার পরে ২০০৪ সালে। বইটি অবশ্য প্রকাশিত হয়েছিল আরও আগে ২০০২ সালে। তুষারাবৃত হয়ে পড়ছে একটি শহর, সেই শহরে দীর্ঘ এক যুগ পর এসেছেন এক নির্বাসিত কবি, শহরটিতে উত্থান ঘটছে ধর্মাচ্ছন্ন মানুষদের, হিজাব পরার স্বাধীনতা দাবি করছে মেয়েরা, ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তার মানুষদের সঙ্গে শুরু হয়েছে তাদের চিন্তাচেতনার দ্বন্দ্ব; বিশ্বপরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গেলেও বইটি প্রকাশের দুই দশক পরও কৌতূহলোদ্দীপক।
ততদিনে পামুক তার ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘মাই নেম ইজ রেড’ বইটির জন্যে সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। অনেকের মতে এবং আমার নিজেরও মনে হয় যে, কেবল আলোচিত হওয়ার অর্থেই নয়, সমস্ত দিক দিয়েই এটি তার সবচেয়ে ভালো বই। যাতে একই সঙ্গে বিজড়ন ঘটেছে দর্শনগত দ্বন্দ্বের, প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সাংস্কৃতিক সংঘাতের, তীব্র ধর্মীয় ও আদর্শিক সংকটের এবং জটিল মনস্তাত্ত্বিক প্রেমের। ১৫৯১ সালের অটোম্যান সাম্রাজ্যের এক সুলতানের শিল্পস্পৃহার সূত্রে এ উপন্যাসে যে বহুরৈখিক কাহিনী দানা বেঁধে ওঠে তা একই সঙ্গে চিন্তার সংঘাত ও রহস্যময় বাতাবরণকে বইয়ে নিয়ে গেছে একই স্রোততরঙ্গে। কেবল মানুষ নয় এ বইয়ে চরিত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে যায় মৃতদেহ, কুকুর, বৃক্ষ, শয়তান, স্বর্ণমুদ্রা ও লাল রঙ। এই বই নিয়ে মন খুলে আলোচনার জন্যে, কথা বলার জন্য স্বদেশ-সমাজ-সংসারে যতটুকু মুক্তচিন্তা চর্চার পরিসর থাকা প্রয়োজন, তা বাংলাদেশে বোধকরি এই মুহূর্তে আর নেই।
দীর্ঘ চার বছর পর ২০০২ সালে পামুক যেন ওই একই রকম দ্বন্দ্বমুখর বই-ই লেখেন, তবে একেবারে ভিন্ন সময়কে হাতের তালুতে নিয়ে। এ বইয়েও আমরা মুখোমুখি হই ধর্ম ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বের সংকটের, ও মূল্যবোধজনিত বিরোধের। আমরা দেখি, তুরস্কের মানুষ একদিকে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সংস্পর্শ পেতে কী ভীষণ মরিয়া, আবার অন্যদিকে প্রাচ্যের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারানোর ভয়েও কী ভয়ানক আতঙ্কিত! দীর্ঘ ১২ বছরের নির্বাসিত জীবনে ছেদ ঘটিয়ে তুর্কি কবি কা ইস্তাম্বুলে ফেরেন তার মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে। সেখানে তখন হিজাব পরার দাবিতে মেয়েরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে, শুরু হয়েছে তীব্র তুষারপাত, পুরনো প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা দেখা দিয়েছে কবি কা এর ভেতর। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে শহরটি সারা পৃথিবীতে আর তাতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন কবি। তিনি যে এই সব দ্বন্দ্বাত্মক পরিস্থিতিকে পেছনে ফেলে অন্য কোথাও চলে যাবেন, তারও কোনো উপায় নেই। পামুক যেন প্রকারান্তরে বলেন, এসবের মধ্যেই আমাদের বসবাস, এসবের মুখোমুখি হওয়ার মধ্যে দিয়েই আমাদের বসবাস করতে হবে আমাদের ভূমিতে। সামরিক অভ্যুত্থান এসে এই পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বটে। কিন্তু সেটা কি সমাধান হতে পারে?
এটি এই ‘স্নো’ সর্বার্থেই একটি সমকালীন উপন্যাস। তুরস্ককে উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখলেও এটিকে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে পৃথিবীর অনেক দেশেই। এরকম দেশে মানুষকে নিজের অজান্তেই কী তীব্র নিবিড় রাজনৈতিকতার মধ্যে দিয়েই জীবনযাপন করতে হয়, তারও বড় দৃষ্টান্ত এ উপন্যাস। লেখাই বাহুল্য, বইটি আমার ভালো লেগেছিল। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর বইটি নিয়ে এই কথাগুলো লিখতে লিখতে আমার মনে হচ্ছে বনফুল বেঁচে থাকলে তাকে আমি সাগ্রহে নিজেই জানাতাম, পাঠকের মৃত্যু ঘটেনি, কোনো কোনো বই আছে যেগুলোর পাঠকের মৃত্যু ঘটে না। তবে এমন অনুভূতি থাকার পরও বলতে চাই, পামুক সম্পর্কে আমি আসলে তীব্রভাবে আকৃষ্ট হয়েছি ‘স্নো’ পাঠেরও বেশ কয়েক বছর পরে তার ‘আদার কালার্স’ নামের বইটির একটি ছোট নোট পড়ে। ‘নাইন নোটস অন বুক কাভার্স’ নামের ওই নোটটি খুবই চিন্তাজাগানিয়া, কৌতূহলোদ্দীপক এবং বারবার পড়ার মতোও বটে। লেখাটির প্রথম নোটটিই ছিল এমন : ‘বইয়ের প্রচ্ছদ হবে তা নিয়ে কোনো স্বপ্ন না দেখেই যদি কোনো ঔপন্যাসিক সেটি লিখে শেষ করতে পারেন, তা হলে তিনি নিশ্চয়ই প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ ও আপাদমস্তক পরিপক্ব মানুষ; কিন্তু তিনি এমন একজনও বটে যিনি হারিয়ে ফেলেছেন তার আদিম সরলতা, যা তাকে একদিন করে তুলেছিল ঔপন্যাসিক।’
খুবই সাধারণ কটি কথা; আমরা তো এরকমই ভেবে থাকি প্রচ্ছদ ভালো না হলে বই কিনে সুখ আছে নাকি! কিন্তু আমাদের সেই প্রচল ভাবনার মধ্যে থেকেও পামুক আমাদের ভাবনাজগৎকে একেবারে আমূল পাল্টে ফেলেন মানুষের আদিম, সহজাত ও বুনো সরলতার প্রসঙ্গ টেনে এনে। আমি আমার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য পর্ব কাটিয়েছি এ দেশের একজন পথিকৃৎ প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষের সঙ্গে একই বাসায়, পাশাপাশি রুমে। সেটি ছিল এমন সময়, যখন সারা দেশের পাঠকরা উন্মুখ হয়ে থাকত, কবে কখন হুমায়ূন আহমেদের নতুন বই ছাপা হবে। অথচ কী আশ্চর্য, ছাপা হওয়ার আগেই এমনকি প্রচ্ছদও হওয়ার আগে হুমায়ূনের নিজের হাতের লেখাতেই সেই বই আমাদের পড়া হয়ে যেত কেননা তিনি উপন্যাস লিখতে না লিখতেই ফটোকপি করে প্রকাশকের পাশাপাশি ধ্রুব এষের কাছেও সেটির একটি ফটোকপি পাঠিয়ে দিতেন। যাতে ধ্রুব এষ সেটি পড়ে প্রচ্ছদের জন্য ভাবতে পারেন। এমনকি প্রচ্ছদ না করলেও নতুন অমুদ্রিত উপন্যাসটির ফটোকপি ধ্রুবর কাছে ঠিকই আসত। প্রচ্ছদশিল্পে ধ্রুব এষের প্রবেশ কী করে এ জগৎটিকে পাল্টে দিয়েছে, তার প্রচ্ছদ কী করে নির্মিত হয়েছে এবং তা তার পূর্ববর্তী প্রচ্ছদশিল্পীদের চেয়ে আলাদা হয়ে উঠেছে আর হুমায়ূন আহমেদের নিজের ভূমিকাই বা তাতে কতটুকু, সেসব নিয়ে আলাদা একটি পূর্ণাঙ্গ লেখাই হতে পারে। হুমায়ূন আহমেদ এ দেশের নতুন প্রজন্মের কোনো গল্পকার বা ঔপন্যাসিকের প্রকাশে ও বিকাশে সরাসরি কোনো ভূমিকা রেখেছেন কি না, তা জানি না; তবে বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ শিল্পকে শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে যে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে সেটি জোর গলাতেই বলতে পারি। পামুকের এই নোট হুমায়ূন আহমেদের পড়া ছিল কি না জানি না, কিন্তু বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে তার যে সবিশেষ আগ্রহ ছিল, তার ভিত্তিতে বলা যায়, লেখক হিসেবে মানুষটির মধ্যে রয়েছে গভীর ইনোসেন্স, যা কখনোই পরিমাপ করা সম্ভব নয়। পামুকের ওই নোট পড়ার পর আমি তার বইগুলোর প্রচ্ছদ ভালো করে দেখার চেষ্টা করেছি; তবে মনে হয়েছে, বেশির ভাগ বইয়ের বা সংস্করণের প্রচ্ছদের সঙ্গেই তার বোধকরি সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। অবশ্য বইয়ের প্রচ্ছদ যেমনই হোক না কেন, সেটি মনে রাখার বা থাকার কার্যকারণ একেবারেই আলাদা। পামুক তার ওই নয়টি নোটের দ্বিতীয়টিতে লিখেছেন, যে বইগুলোকে আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেগুলোকে আমরা পুনরায় মনেই করতে পারি না বইটির প্রচ্ছদ ছাড়া। এ কথাটিতেও কোনো খাদ নেই। প্রচ্ছদ ভালো কিংবা মন্দ যাই হোক না কেন যে বইটি আমাদের ভালো লেগে যায়, সেটি মনে করতে গেলেই আমাদের চোখের সামনে প্রথমে ভেসে আসে বইটির প্রচ্ছদ।
এই মুহূর্তে যেমন আমার চোখের সামনে ভাসছে পেপারব্যাক সংস্করণের ‘স্নো’ বইটির প্রচ্ছদ যেটির জন্য আলোকচিত্র ধারণ করেছিলেন ওরহান পামুক নিজেই। ডিজাইন করেছিলেন শিল্পনির্দেশক চিপ কিড। ‘স্নো’ দিয়ে শুরু হওয়ার কারণেই কি না জানি না, মাঝে মাঝে মনে হয়, পামুকের যে পাঠকগোষ্ঠী আছে, আমার অস্তিত্ব তাদের মধ্যে অনেকটা আউটসাইডারের মতো। কারণ সারা জীবন পামুক যা লিখেছেন, ‘স্নো’ একা একাই যেন তার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী, কখনও মনে হয়, পামুকের সকল সাহিত্যকর্মের মধ্যে ‘স্নো’ এক অভিমন্যু, কখনও মনে হয় সে সংশপ্তক। এ কথা বলছি, কেননা কে না জানে, পামুকের প্রায় প্রতিটি উপন্যাসই হারিয়ে যাওয়া অতীতকে নানা আস্বাদে জাগ্রত করে তোলে, আমাদের তাদের অধিবাসীতে পরিণত করে। কিন্তু তার সেই বিস্তৃত সাম্রাজ্যের মধ্যে ‘স্নো’ পুরোপুরিই সমকালীন।
কাদের জন্য ওরহান পামুক লিখেছেন এইসব বই? তার নিজের বক্তব্য থেকেই এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা যাক। প্রথমত, তিনি ‘আপনি কাদের জন্যে লেখেন’ এই প্রশ্নটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এটি কোনো সৎ প্রশ্ন নয়, মানবিকও নয় এ রকমই মনে হয় তার কাছে। মনে হয়েছে, লেখককে বেকায়দায় ফেলতে, জব্দ করতেই যেন এ প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। তাই প্রশ্নটির উত্তর দিতে গিয়ে পাঠক-চরিত্রেরই তত্ত্বতালাশ করেছেন। তিনি দেখেছেন, উপন্যাসের উদ্ভব ঘটেছিল জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভবের সঙ্গে। উনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত সব উপন্যাসের শিল্পকলাতেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন জাতীয় শিল্পকলা। লিও তলস্তয়, ফিওদোর দস্তয়েভস্কি, চার্লস ডিকেন্স প্রমুখের নাম নিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, তারা লিখতেন একটি উত্থানরত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্যে। তখনকার সেই সব লেখকদের স্বরের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করেছেন একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিকের গভীর অস্বস্তির স্বর যার একান্ত স্বপ্ন-বাসনাই কি না দেশ যেন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু দিন পাল্টেছে, বদলে যাওয়া সেই দিনের দিকে তাকিয়ে তিনি এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন, উপন্যাস এখন এমন এক উচ্চ শিল্পকলার মর্যাদা পেয়েছে যে, তার লেখক আর এখন স্বদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য লেখেন না, ‘সাহিত্যিক উপন্যাসের’ বা ‘মননশীল উপন্যাসের’ এই লেখকরা এখন লেখেন সারা বিশ্বের পাঠকদের কথা মাথায় রেখে।
পামুকের এই ভাবনার উপসংহারের সঙ্গে অবশ্য আমার ধারণা টায়-টায় মেলে না। এটি ঠিক, লেখকদের অনেকের মধ্যেই এখন নিজের ভাষার বাইরে গিয়ে অন্য ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু এই কারণে তাকে উনবিংশ শতাব্দীর পাঠকদের থেকে আলাদা করে ফেলার মতো শক্তি আমি খুঁজে পাই না। কারণ জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশের সময় উপন্যাসের জন্ম হলেও এর সৃষ্টির প্রধান তো ওই ব্যক্তিরই উত্থান, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতারই উত্থান। পাঠকের পাঠরুচির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে ওই ব্যক্তিচেতনার উত্থান। কিন্তু এই ব্যক্তিবোধ ও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতা থাকার পরও মানুষের কিন্তু একটি শ্রেণিবোধ আর শ্রেণি অবস্থানও দাঁড়িয়ে যায়; আর সেই বিষয়টি এত শক্তিশালী যে, ব্যক্তিমালিকানা ও স্বাতন্ত্র্যতায় বিশ্বাসী বুর্জোয়া চিন্তার মানুষরাও একজোট হয়ে থাকে; আর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, অন্যান্য শ্রেণির চেয়ে বরং তারাই অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে। সমাজে শ্রেণিসমূহের এই প্রবহমানতার মধ্যে একমাত্র যে শ্রেণিটির মানুষ সব সময় পরিবর্তনের মধ্যে থাকে, বিবর্তনের মধ্যে থাকে, সেটি এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যাদের আমরা পাঠক বলে থাকি, তারাও মূলত এই শ্রেণির। সমাজ-রাষ্ট্রে যে পরিবর্তন ঘটে বা ঘটতে থাকে, তাতে সবচেয়ে ক্রিয়াশীল হয়ে সম্পৃক্তও থাকে এই শ্রেণিটি। লেখক কার জন্য লিখলেন, সেই ধারণার তোয়াক্কা না করে তার সৃষ্টিকর্মের জন্য অপেক্ষাও করেন মূলত এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই শ্রেণির মধ্যেও একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিকের অস্বস্তিকর স্বর আছে, আবার এই শ্রেণির মধ্যেই অভিবাসনের তীব্র খাপছাড়া অস্থির তাড়না আছে। ভিনদেশে বসবাস করে মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার যে তাড়না, তার সঙ্গে পামুকের ওই সারা বিশ্বের পাঠকদের কথা মাথায় রেখে লেখার ভাবনাটি ঠিকমতো মেলে না।
নিশ্চয়ই বলা যায়, জন আপডাইক যাকে অনেক আগেই ইতালো ক্যানভিনো, হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো লেখকদের পাশাপাশি ঠাঁই দিয়েছেন; সেই ওরহান পামুক নিজের লেখালেখিকে দেশপ্রেমিকের অস্বস্তিকর স্বরমুক্ত রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু সাহিত্যের কোনো দেশ না থাকুক, কোনো না কোনো উৎস তো থাকে; না হলে সে তার দূরযাত্রার নানা চিহ্ন নির্মাণ করবে কোথা থেকে কেমন করে! কিন্তু মুক্ত আকাশে ছড়িয়ে পড়ার পরও উৎসের সঙ্গে তার এই সম্পৃক্তি তাকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনে। পামুক নিজে রাষ্ট্রহীনতার বড় উদাহরণ, কিন্তু সারা বিশ্বের পাঠকদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছতে নিজের রাষ্ট্রের কথাই শোনাতে হয়েছে আমাদের। এই যে অনিবার্যতা, তা থেকে মুক্তি পেতেই বোধকরি তিনি বেছে নিয়েছেন, বাস্তবের থেকে বরং কল্পনার পাঠককে। বাস্তবে যে পাঠক নেই, তিনি তার অস্তিত্ব নির্মাণ করেছেন। হোক সে পাঠক কল্পনার, কিন্তু তিনিই তার আদর্শ পাঠক। একের পর এক বই লিখে গেছেন পামুক কল্পিত, মনের মধ্যকার আদর্শ সেই পাঠকের জন্য। লিখেছেন লেখালেখির যাবতীয় সততা নিয়ে, অকৃত্রিমতা নিয়ে, মোহমুক্ত দৃষ্টি নিয়ে। বাস্তবে সেই আদর্শ পাঠক না থাকুক, তার নিজের কাছে তো আছে; তাকে তিনি অর্ঘ্য দিয়েছেন উজাড় করে। বাস্তবের পাঠকের চোখ আটকেছে তাতে, আটকেছে হৃদয়। এমন অর্ঘ্য তারা ফিরিয়ে দেয় কী করে! দুই হাতে সেই মণিমানিক্য তুলে নিয়েছে তারা। আদর্শ পাঠক খুঁজতে খুঁজতে ওরহান পামুক পৌঁছে গেছেন বাস্তবের, ধরার ধুলার সব পাঠকের কাছে।
২ আষাঢ় ১৪৩৩ মঙ্গলবার