রেজাউল বাহার
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬ ১৪:৫০ পিএম
আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬ ১৪:৫১ পিএম
ব্রাজিলের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফুটবল, সাম্বা আর হলুদ-সবুজের উন্মাদনা। রিওতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, পৃথিবীর দুই প্রান্তে থেকেও কিছু শহরের হৃদস্পন্দন একই রকম। ফুটবলের দেশ ব্রাজিলে পাঁচ দিনের এই সফরে আমি খুঁজে পেয়েছি শুধু একটি শহর নয়, বরং জীবনের নানা রঙ আর কিছু অমূল্য উপলব্ধি। লিখেছেন রেজাউল বাহার
ছোটবেলায় বইতে পেলের গল্প ছিল। মাঝে মাঝে মনে হয় ফুটবলই জীবন, ফুটবলই সব। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ ব্রাজিল ফুটবলের ভক্ত, এদেশের খেলা নিয়ে মারামারি-কাটাকাটি হয় বিশ্বকাপের সময়।

কিন্তু শুধু ফুটবল নয়, ব্রাজিলের রিও শহরে গিয়ে দেখলাম কোথায় যেন বাংলাদেশের সঙ্গে অনেক মিল। পুরনো ঢাকার রাস্তাঘাট, মানুষের আড্ডা, দোকানপাট, যানজট, সব কেমন যেন ঢাকা শহরের মতো। রিওতে আমাদের ৫ দিনের ভ্রমণ, বেশিরভাগ সময় কাটানো হয়েছে রিওর কোপাকাবানা বিচের আশপাশে। শহরের এই অংশটা ট্যুরিস্টদের জন্য নিরাপদ। রিওতে বিচ মানেই মানুষ আর মানুষ। সারা শহরজুড়ে ছোট-বড় পাহাড়, ঘন জনবসতি, পাহাড়ের ওপরই রিওর মূল আকর্ষণ যিশুখ্রিস্টের মূর্তি। মুভি বা ডকুমেন্টরিতে যিশুর এই মূর্তি যতটা বড় মনে হয়, ঠিক ততটা বড় সামনাসামনি মনে হয় না। সন্ধ্যায় সূর্যাস্তে পাহাড় থেকে সমুদ্রঘেঁষা রিও শহর এক অদ্ভুত শিল্পীর আঁকা ছবি মনে হয়।
আমাদের ভ্রমণ নিউইয়র্ক থেকে রিওতে। অর্ধেক সময় পাহাড়ের ওপর এক অ্যাপার্টমেন্টে আর বাকিটা সময় হোটেলে। এয়ারপোর্ট থেকে উবার বা ট্যাক্সি, আমাদের আগে থেকেই ট্রান্সপোর্টেশন ঠিক করা ছিল। ইংরেজি খুব কম মানুষেই বলে বা বোঝে, কাজেই কিছুটা প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া ভালো।

মাদার তেরেসা- সন্ত নাকি বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব? এ প্রশ্নের উত্তর আজও একমুখী নয়। একদিকে তিনি দরিদ্র, অসুস্থ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের সেবার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। তার প্রতিষ্ঠিত মিশনারিজ অব চ্যারিটি অসংখ্য অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন এবং পরে ক্যাথলিক চার্চ তাকে ‘সেন্ট’ বা সন্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অন্যদিকে তার কর্মকাণ্ড ও মতাদর্শ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। সমালোচকদের মতে, তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণের চেয়ে দারিদ্র্যকে আধ্যাত্মিকভাবে মহিমান্বিত করেছেন। বিশেষ করে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও গর্ভপাতের বিরোধিতার কারণে তাকে নারীর অধিকার ও প্রজনন স্বাস্থ্যের পথে বাধা হিসেবে দেখেন অনেকেই। তাদের যুক্তি হলো, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অসংখ্য দরিদ্র নারী অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া কিছু গবেষক ও লেখক তাকে ধর্মীয় মৌলবাদী, উগ্র মতাদর্শের অনুসারী কিংবা দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার অভিযোগেও অভিযুক্ত করেছেন। যদিও তার সমর্থকরা এসব অভিযোগের অনেকগুলোকেই অতিরঞ্জিত বা রাজনৈতিক ও আদর্শগত বিরোধ থেকে উৎসারিত বলে মনে করেন।
ফলে মাদার তেরেসার উত্তরাধিকার একদিকে মানবসেবার প্রতীক, অন্যদিকে বিতর্ক ও সমালোচনার বিষয়। তিনি নিঃসন্দেহে ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব, তবে তার কর্মকাণ্ড ও বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্নও কম নয়।ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে দাঁড়িয়ে থাকা মাদার তেরেসার এই ভাস্কর্য যেন সেই দ্বৈত বাস্তবতারই প্রতীক- কারও কাছে তিনি করুণা ও মানবতার মূর্ত প্রতীক, আবার কারও কাছে ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে বিতর্কিত এক ঐতিহাসিক চরিত্র।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর প্রাণচঞ্চল ও বিশ্ববিখ্যাত সমুদ্রসৈকত- Copacabana Beach-এ দেখা পেলাম এক গৃহহীন মানুষের। মনের মাঝে কিছু প্রশ্ন এলো- আপনি আসলে কিসের পেছনে ছুটছেন। এই গৃহহীন মানুষটির দিকে তাকালেই অনুভব করা সম্ভব। তার সমস্ত সম্বল পড়ে আছে পাশে আর পেছনে। তবু সে জীবনকে উপভোগ করছে নিজের মতো করে। শহরের কোনো অন্ধকার গলিতে শুয়ে না থেকে সে তার জীবনকে নিয়ে এসেছে সমুদ্রের কাছে। কারও ফেলে দেওয়া সিগারেটের শেষ টুকরো টানছে, হাতে পুরনো একটি সংবাদপত্র, সামনে রোদের উষ্ণতা আর অসীম সমুদ্র। গতকাল কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই মুহূর্ত- একটি সংবাদপত্র পড়া, সূর্যের আলো উপভোগ করা, আর সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে নিজের সুখ খুঁজে নেওয়া। জীবন আসলে কী আছে, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে আমরা প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে অনুভব করি তার ওপর।
তাহলে বলুন, আপনি আপনার সুখের জন্য কিসের পেছনে ছুটছেন? এটি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নৈসর্গিক সমুদ্রসৈকত নয়, কিন্তু নিঃসন্দেহে সবচেয়ে প্রাণবন্ত সৈকতগুলোর একটি। জীবনের নানা শ্রেণি-পেশা, বয়স ও সংস্কৃতির মানুষ এখানে একটু অবসর, আনন্দ আর স্বস্তির খোঁজে এসে থামে। সকাল থেকে গভীর সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের পদচারণা, হাসি, গল্প, খেলাধুলা আর সমুদ্রের ছন্দে মুখর থাকে পুরো এলাকা। এখানে প্রতিটি মুহূর্ত যেন জীবনের একেকটি রঙিন গল্প। কেউ সূর্যস্নান করছেন, কেউ হাঁটছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মগ্ন, আবার কেউ শুধু বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখছেন। এই বৈচিত্র্য আর প্রাণচাঞ্চল্যই স্থানটিকে করে তুলেছে অনন্য। কোপাকাবানায় আমাদের একটি দিন- স্মৃতি, আনন্দ আর জীবনের স্পন্দনে ভরা কিছু মুহূর্ত।

ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনিরোর কোপাকাবানা সৈকতটি ইংরেজি নববর্ষ বরণের জন্য বিখ্যাত। এ সৈকতে ১ জানুয়ারি লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। চার কিলোমিটার বিস্তীর্ণ এ সৈকত লাইফগার্ডের ২ নম্বর ওয়াচ টাওয়ার থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে এক নম্বর টাওয়ারে। এখানে কয়েকটি ঐতিহাসিক দুর্গ আছে। এর মধ্যে সৈকতের দক্ষিণ প্রান্তের ফোর্ট কোপাকাবানা নামের দুর্গটি তৈরি হয়েছিল ১৯১৪ সালে। আর উত্তর প্রান্তের ফোর্ট ডুগিউ ডি ক্যাসিয়াস তৈরি হয়েছিল ১৭৭৯ সালে। এ সৈকত তথা এ এলাকার নাম কিন্তু আগে কোপাকাবানা (Copacabana) ছিল না। ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর নাম ছিল সাকোপিনাপা। বলিভিয়ার দেবী কোপাকাবানার আকৃতিতে ১৮৯২ সালে মূর্তি ও গির্জা নির্মাণ করা হয়। সেই থেকে এই শহরের নাম হয়ে যায় কোপাকাবানা।

এ ছাড়া কোপাকাবানা সি বিচ ফিফা বিচ ফুটবল বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ভেন্যু হিসেবে নির্ধারিত। রিওর স্থানীয়রা এই সমুদ্রসৈকতটিকে বলে ‘কারিওকাস’। চার কিলোমিটার লম্বা এই সৈকতে সব সময়ই ফুটবল বা ভলিবল খেলা চলতেই থাকে। মানুষও সময় কাটাতে এই সৈকতে আসে। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এখানে খাবার বিক্রি করে। তাই সব সময় মানুষের ভিড়ে জমজমাট থাকে এই সমুদ্রসৈকত। সৈকতের শেষপ্রান্তে রয়েছে একটি সামরিক জাদুঘর।

কোপাকাবানার সাইকেল-চালকদের নিরাপদ রাখতে সাইকেল লেন রয়েছে। রিওতে বাইসাইকেল ভাড়া করার প্রায় ৬০টি নির্দিষ্ট জায়গা রয়েছে, যেখান থেকে সারা দিনের জন্য সাইকেল ভাড়া করে আপনি সি বিচ এবং শহরের ইতিহাস সমৃদ্ধ জায়গাগুলোতে বেশ আরাম করেই ঘুরে বেড়াতে পারবেন। রিও ডি জেনিরো শহরে আরও একটি সৈকত রয়েছে- ইপানিমা।
সুপার লোফ পর্বতমালার ছোট ছোট অনুকরণ কেনার পাশাপাশি সমুদ্রসৈকতের ধারে শহরের দক্ষ কারিগরদের তৈরি জিনিস নিয়ে বসা বাজার, দোকান বা বালুর ওপরে বসে থাকা বিক্রেতাদের পণ্যগুলো ঘুরে ঘুরে দেখুন। এগুলো বেশ জনপ্রিয় এবং নানা আকার ও নকশায় বিক্রি হয়- যেমন কোপাকাবানা সৈকতের বিখ্যাত হাঁটাপথ, ব্রাজিলের জাতীয় পতাকা এবং যিশুখ্রিস্টের মূর্তি পর্যটকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে।
পৃথিবীর যে প্রান্তেই যান না কেন, ভ্রমণ আপনার, শহর আপনার, পরিবেশ আপনার, অন্য কেউ তা পরিষ্কার করবে কেন? দায়িত্বশীল ট্রাভেল অনেক গুরুত্বপূর্ণ, পরিষ্কার-পরিছন্নতা ভ্রমণেরই অংশ।