× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ফুটবল বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ব্যবহার

খালিদ আহমেদ রাজা

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

ছবি: সংগৃহীত।

ছবি: সংগৃহীত।

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। কোটি কোটি মানুষ বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ উপভোগ করেন, নিজেদের প্রিয় দল ও খেলোয়াড়দের সমর্থন করেন। তবে খেলার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিরও দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। এক সময়ে রেফারির সিদ্ধান্তই ছিল চূড়ান্ত। কিন্তু মানবিক ভুলের কারণে অনেক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ম্যাচের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এসব সমস্যা দূর করতে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা ধীরে ধীরে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। গোললাইন প্রযুক্তি, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) এবং সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির পর এবার ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে আরও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটছে। বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়; এটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেরও একটি বড় মঞ্চ। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে খেলার ন্যায্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দর্শকদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছে ফিফা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বকাপ।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন এই প্রযুক্তি সমর্থক ও খেলোয়াড়দের হতাশা অনেকটাই কমাবে বলে আশা করছে ফিফা। অফসাইড সিদ্ধান্তকে আরও নির্ভুল ও স্বচ্ছ করতে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি খেলোয়াড়ের থ্রিডি অবতার তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে ৪৮টি দলের মোট ১,২৪৮ জন খেলোয়াড়কে ডিজিটালি স্ক্যান করা হবে। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের বাস্তবসম্মত ডিজিটাল অবতার তৈরি করা হবে। এসব এআই-ভিত্তিক অবতার অফসাইড বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং খেলোয়াড়দের অবস্থান আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। ফলে অফসাইড সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আগের তুলনায় আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।

সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির নতুন সংস্করণ

অফসাইডের সিদ্ধান্ত ফুটবলের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি। সামান্য কয়েক সেন্টিমিটারের পার্থক্যের কারণে একটি গোল বাতিল হতে পারে অথবা বৈধ ঘোষণা করা হতে পারে। অতীতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক হয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। সেই প্রযুক্তির উন্নত সংস্করণ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে দেখা যাবে। স্টেডিয়ামের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা একাধিক উচ্চগতির ক্যামেরা খেলোয়াড়দের শরীরের বিভিন্ন পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ করবে। একই সঙ্গে স্মার্ট বলের সেন্সর বল স্পর্শের সঠিক মুহূর্ত শনাক্ত করবে। এই তথ্যগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কম্পিউটার বিশ্লেষণ করবে এবং অফসাইড পরিস্থিতি তৈরি হলে ভিডিও রেফারিদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠাবে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় কমে যাবে এবং ভুলের সম্ভাবনাও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

থ্রিডি অবতার প্রযুক্তি

বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত নতুন সংযোজন হলো খেলোয়াড়দের ৩ডি অবতার। প্রতিটি খেলোয়াড়কে বিশেষ স্ক্যানিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটালভাবে ধারণ করা হবে। এরপর তাদের বাস্তবসম্মত ত্রিমাত্রিক অবতার তৈরি করা হবে। অফসাইড সিদ্ধান্ত প্রদর্শনের সময় এই থ্রিডি অবতার ব্যবহার করা হবে। দর্শকরা টেলিভিশন কিংবা স্টেডিয়ামের বড়পর্দায় স্পষ্টভাবে দেখতে পারবেন কোন খেলোয়াড়ের কোন অংশ অফসাইড লাইনের সামনে ছিল। এর ফলে অফসাইড সিদ্ধান্ত আরও সহজে বোঝা যাবে এবং দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি কমবে। একই সঙ্গে প্রযুক্তির প্রতি আস্থাও বাড়বে।

স্মার্ট বা কানেক্টেড বল

আধুনিক ফুটবলে বলও এখন প্রযুক্তির অংশ। বিশ্বকাপে ব্যবহৃত নতুন প্রজন্মের বলের ভেতরে অত্যাধুনিক সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে। এই সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে শত শতবার তথ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় সিস্টেমে পাঠায়। ফলে বল কখন, কোথায় এবং কীভাবে স্পর্শ করা হয়েছে তা নির্ভুলভাবে জানা যায়। অফসাইড নির্ধারণে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর। কারণ অফসাইডের ক্ষেত্রে বল পাস দেওয়ার সঠিক মুহূর্ত নির্ধারণ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্ট বল সেই কাজটি মানুষের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে করতে পারে। এ ছাড়া হ্যান্ডবল, গোললাইন সংক্রান্ত পরিস্থিতি এবং অন্যান্য বিতর্কিত ঘটনাও বিশ্লেষণে এই প্রযুক্তি সহায়তা করবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার

বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ফুটবলও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বকাপে ব্যবহৃত এআই সিস্টেম বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। ম্যাচ চলাকালে ক্যামেরা, সেন্সর এবং অন্যান্য প্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত তথ্য এআই তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্রিয়াকরণ করবে। ফলে ভিডিও রেফারিরা দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এ ছাড়া ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণেও এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফিফা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে অনলাইন অপব্যবহার ও ঘৃণামূলক মন্তব্য শনাক্ত করতেও এআই ব্যবহার করছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত লক্ষ লক্ষ পোস্ট বিশ্লেষণ করে ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

রেফারির বডি ক্যামেরা

ফুটবল ম্যাচে রেফারির সিদ্ধান্ত অনেক সময় বিতর্কের জন্ম দেয়। দর্শকরা প্রায়ই জানতে চান মাঠে আসলে কী ঘটেছিল। এই কারণেই রেফারিদের শরীরে বিশেষ বডি ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই ক্যামেরা রেফারির দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো ম্যাচ ধারণ করবে। দর্শকরা টেলিভিশন সম্প্রচারের সময় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো রেফারির চোখে দেখতে পারবেন। এর ফলে ম্যাচ আরও আকর্ষণীয় হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রেক্ষাপট বোঝা সহজ হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রযুক্তি ফুটবল সম্প্রচারে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

উন্নত ভিএআর ব্যবস্থা

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর ইতোমধ্যে ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে ভিএআর নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। অনেক সময় সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা খেলার গতি নষ্ট করে। নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে ভিএআর আরও দ্রুত এবং কার্যকর হবে। উন্নত সফটওয়্যার ও এআই বিশ্লেষণের কারণে রিভিউয়ের সময় কমে আসবে। একই সঙ্গে মাঠের রেফারি ও ভিডিও রেফারিদের মধ্যে যোগাযোগ আরও উন্নত করা হবে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হবে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য।

উন্নত সম্প্রচার প্রযুক্তি

বিশ্বকাপের দর্শকসংখ্যা কয়েকশ কোটি। তাই সম্প্রচার প্রযুক্তির উন্নয়নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আরও বেশি আল্ট্রা-এইচডি (ইউএইচডি) ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। উন্নত স্লো-মোশন প্রযুক্তি দর্শকদের খেলার সূক্ষ্ম মুহূর্তগুলো স্পষ্টভাবে দেখার সুযোগ দেবে। ড্রোন ক্যামেরা, তারের ওপর চলমান ক্যামেরা এবং বিভিন্ন বিশেষ অ্যাঙ্গেলের ক্যামেরা সম্প্রচারকে আরও জীবন্ত করে তুলবে। এ ছাড়া অগমেন্টেড রিয়েলিটি (এআর) গ্রাফিক্স ব্যবহার করে ম্যাচ চলাকালে মাঠের ওপর বিভিন্ন তথ্য প্রদর্শন করা হবে। দর্শকরা খেলোয়াড়দের গতি, বলের গতিপথ এবং কৌশলগত বিশ্লেষণ আরও সহজে বুঝতে পারবেন।

ডেটা অ্যানালিটিক্সের বিপ্লব

আধুনিক ফুটবলে তথ্য বিশ্লেষণের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বকাপে প্রতিটি খেলোয়াড়ের দৌড়, গতি, অবস্থান, পাসের সংখ্যা এবং অন্যান্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হবে। এই তথ্য কোচ ও বিশ্লেষকদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। তারা ম্যাচের কৌশল নির্ধারণ এবং খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে এসব তথ্য ব্যবহার করতে পারবেন। দর্শকরাও বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্মে রিয়েল-টাইম পরিসংখ্যান দেখতে পারবেন, যা ম্যাচ উপভোগের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।

প্রযুক্তি ও ন্যায্য খেলা

ফিফার মূল লক্ষ্য হলো খেলার ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। প্রযুক্তি কখনোই রেফারির বিকল্প নয়; বরং এটি রেফারিকে সহায়তা করার একটি মাধ্যম। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে মানবিক ভুল কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সংখ্যা হ্রাস পাবে। এতে খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা এবং দর্শকÑ সবার মধ্যে আস্থা বাড়বে। তবে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, খেলার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে প্রযুক্তির ব্যবহার হতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ।

ভবিষ্যতের ফুটবলের দিকে এক ধাপ

ফুটবল তার দীর্ঘ ইতিহাসে অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। একসময় যেখানে রেফারির চোখই ছিল একমাত্র ভরসা, সেখানে এখন ক্যামেরা, সেন্সর, এআই এবং উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ প্রমাণ করবে যে প্রযুক্তি এবং ফুটবল একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। প্রযুক্তি খেলার সৌন্দর্য নষ্ট না করে বরং তাকে আরও ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

ফিফা বিশ্বকাপ-২০২৬ শুধু ফুটবলের মহাযজ্ঞ নয়, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেরও এক অনন্য প্রদর্শনী হতে যাচ্ছে। উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, থ্রিডি অবতার, স্মার্ট বল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রেফারির বডি ক্যামেরা, উন্নত ভিএআর এবং আধুনিক সম্প্রচার প্রযুক্তি বিশ্বকাপকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা ফুটবলকে আরও নির্ভুল, স্বচ্ছ ও দর্শকবান্ধব করে তুলবে। ফলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু মাঠের লড়াইয়ের জন্য নয়, প্রযুক্তির অসাধারণ ব্যবহারের কারণেও ইতিহাসে বিশেষ স্থান করে নেবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা