অরুপ রতন, বগুড়া
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬ ১৪:২৬ পিএম
আচার হাতে বগুড়ার আফসানা নীরা
একসময় সংসারের অভাব দূর করার জন্য সংগ্রাম করছিলেন বগুড়ার আফসানা নীরা। হাতে ছিল না বড় কোনো পুঁজি, ছিল না প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা। কিন্তু সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি আজ একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করা তার আচারের ব্যবসা এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের ১৯টি দেশে। নিজের স্বাবলম্বিতার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন আরও ১৫ জনের।
বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী এলাকার বাসিন্দা আফসানা নীরা বর্তমানে ‘আচারী ফুড’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গরুর মাংসের আচারসহ বিভিন্ন ধরনের আচার উৎপাদন ও বিক্রি করছেন। তার তৈরি মাংসের আচার, আম, রসুন, তেঁতুল, বরই, জলপাই, ইলিশ, চ্যাপা এবং মৌসুমি ফলের আচার দেশ-বিদেশে সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি জয়িতা সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কারও অর্জন করেছেন।
তবে তার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে বিউটিফিকেশন এবং পরে কাপড়ের ব্যবসা করেও প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি। তখন ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা থেকে শৈশবের একটি স্মৃতি মনে পড়ে। নানির তৈরি মাংসের আচারের স্বাদ তাকে নতুন উদ্যোগের সাহস জোগায়। স্বামীর পরামর্শে রান্নাবান্নাকে কেন্দ্র করেই ব্যবসার পরিকল্পনা শুরু করেন তিনি।
কিন্তু সেই সময় ব্যবসা শুরু করার মতো পুঁজিও ছিল না। শেষ পর্যন্ত নিজের শখের স্মার্টফোন বিক্রি করে দেন। ফোন বিক্রি করে পাওয়া সাড়ে চার হাজার টাকা এবং হাতে থাকা আরও ৫০০ টাকা মিলিয়ে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবনের যাত্রা।
শুরুর দিকে আচারের বিক্রি খুব বেশি ছিল না। সামাজিক মাধ্যমে ‘আচারী ফুড’ নামে একটি পেজ খুলে প্রচারণা শুরু করেন। ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অর্ডার আসতে থাকে। ২০১৮ সালে ব্যবসা শুরু হলেও করোনাকালে অনলাইন ভিত্তিক কেনাবেচা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আচারের পরিচিতিও ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
প্রথমে এক কেজি, পরে পাঁচ কেজি, ১০ কেজি করে বিক্রি হলেও বর্তমানে প্রতি মাসে এক হাজার কেজির বেশি আচার উৎপাদন ও বিক্রি করেন আফসানা। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার কাছ থেকে পাইকারিভাবে আচার কিনে থাকে। মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার আচার বিক্রি হয় তার প্রতিষ্ঠানে।
মাংসের আচার তৈরির ক্ষেত্রেও তিনি মান ও নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রাণিসম্পদ বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী প্রথমে সুস্থ ও নিরাপদ গরুর মাংস সংগ্রহ করা হয়। এরপর মাংস পরিষ্কার করে বিভিন্ন মসলায় মেরিনেট করা হয়। চুলায় রান্না শেষে পানি শুকিয়ে এলে কড়াইয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভেজে তৈরি করা হয় আচার। ভালো মানের মাংস থেকে হাড় ও অতিরিক্ত চর্বি আলাদা করা হয়। খাঁটি সরিষার তেল ও বিভিন্ন মসলার সমন্বয়ে আচারে আনা হয় স্বতন্ত্র স্বাদ।
ব্যবসার প্রসারে তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, বিসিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন জয়িতা সম্মাননা ও জাতীয় যুব দিবসের পুরস্কার। সম্প্রতি বগুড়ায় একটি সেমিনারে তার উদ্যোগের প্রশংসা করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। আফসানা নীরা বলেন, শুরুতে সব কাজ একাই করতেন। ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন কাজ করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন নারীও রয়েছেন, যারা এই কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
-6a1fe51403e13.jpg)
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের সব জেলায় তার প্রতিষ্ঠানের আচার সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বের ১৯টি দেশেও নিয়মিত যাচ্ছে মাংসের আচার। বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা পরিচিতজনদের মাধ্যমে এসব আচার সংগ্রহ করছেন। আফসানা নীরা বলেন, শুরুতে অনেক কষ্ট ছিল। পুঁজি ছিল না, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল। মানুষের ভালোবাসা আর আস্থার কারণেই আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কারখানা গড়ে বিদেশে রপ্তানি বাড়াতে চাই।
মাত্র পাঁচ হাজার টাকার পুঁজি থেকে শুরু হওয়া আফসানা নীরার এই যাত্রা আজ অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। অধ্যবসায়, সাহস ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সীমিত সামর্থ্য নিয়েও যে বড় স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব, তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ তিনি।