মো. নাঈম ইসলাম, শেরপুর
প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬ ১৪:২২ পিএম
স্বেচ্ছাশ্রম স্কুলে পড়াচ্ছে শিক্ষক দম্পতি
সীমান্তবর্তী গারো পাহাড় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এক জনপদ। টিলা, ঝিরিঝিরি ঝর্ণাধারা, আর সবুজ বনভূমির মাঝে প্রতিদিন নতুন করে জীবন জেগে ওঠে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই রয়েছে আরেক বাস্তবতা; পিছিয়ে পড়া কিছু শিশুর অপূর্ণ শিক্ষাজীবন। আর সেই অন্ধকারেই ছোট্ট একটি প্রদীপ জ্বালিয়েছেন দুই শিক্ষক।
২০১৮ সাল থেকে নালিতাবাড়ি উপজেলার বারোমারী মিশনের বিপরীতে, দোকান ভাড়ার ছোট একটি কক্ষে প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বসে এক ব্যতিক্রমী পাঠশালা। বিদ্যালয়ের কোনো নাম নেই, নেই সাইনবোর্ড। তবু এখানে জড়ো হয় ২০-৩০ জন শিশু; কারও হাতে ছেঁড়া বই, কারও খাতা পুরনো, কারও পায়ে জুতা নেই। কিন্তু সবার চোখে একটাই স্বপ্ন- শেখা।
এই পাঠশালার উদ্যোক্তা দম্পতি শিক্ষক প্রদীপ ম্রং (৬৬) ও লিপি নেংমিঞ্জা (৫৮)। দুজনেই ক্যাথলিক মিশন ভিত্তিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। নিয়মিত দায়িত্ব শেষ করে বিকেলের অবসর সময়টুকু তারা উৎসর্গ করেছেন এই শিশুদের জন্য।
শিক্ষক প্রদীপ ম্রং জানান, ২০১৮ সালের শেষ দিকে মাত্র পাঁচজন শিশুকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ। সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে আগ্রহ, বাড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বর্তমানে প্রতিদিন ২৫ জনের বেশি শিশু এখানে নিয়মিত পড়তে আসে।
তিনি আরও বলেন, ওদের অনেকেই দারিদ্র্যের কারণে স্কুলে যেতে পারে না। কেউ কাজ করে, কেউ পরিবারের দায়িত্ব নেয়। আমরা চাই অন্তত মৌলিক শিক্ষাটা যেন ওরা পায়। ছোট্ট কক্ষটি ভাড়া নিতে হয়েছে নিজ উদ্যোগেই। ১০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে মাসে ৬০০ টাকায় নেওয়া এই ঘরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। দিনের আলোই ভরসা। মাটিতে পাটি পেতে বসে চলে পাঠদান। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দিনমজুর বা নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান। অনেকেই এখনও আনুষ্ঠানিক স্কুলে যায়নি। এই পাঠশালাই তাদের প্রথম শেখার জায়গা। পাঠদানের পদ্ধতিতেও আছে ভিন্নতা। বইয়ের পাশাপাশি গান, কবিতা, গল্প আর খেলাধুলার মাধ্যমে শেখানো হয়। যাতে শেখা হয় আনন্দের, চাপের নয়।
স্থানীয়ভাবে এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। শুরুতে কেউ গুরুত্ব না দিলেও এখন অনেক অভিভাবকই সন্তানদের পাঠশালায় পাঠাতে আগ্রহী।
স্কুল শিক্ষক ও অভিভাবক গীতি হাগিদক বলেন, আমি নিজেই একজন শিক্ষক, কিন্তু নিজের বাচ্চার যথেষ্ট দেখভাল করা হয়ে ওঠে না। একদিন এই পাঠশালায় আসতে চায় এবং নিয়ে আসি। কারণ এখানে সে ওর মতো মজা করে পড়া শিখতে পারছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক কাঞ্চন মিস্টার মারাক বলেন, বিদ্যালয়টি পরিচালনায় চ্যালেঞ্জও কম নয়। জায়গার সংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, উপকরণের অভাব; সবকিছু নিয়েই চলছে লড়াই। নেই শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ড, যেখানে বোর্ডে লিখে দিলে সব শিশুর বুঝতে সহজ হয়। দিন শেষে যখন সূর্য ডুবে যায় গারো পাহাড়ের আড়ালে, তখন এই ছোট্ট কক্ষটিতে জ্বলে ওঠে অন্যরকম এক আলো; শিক্ষার আলো, আশার আলো। ব্ল্যাকবোর্ড না থাকায় প্রতিজন ছাত্র-ছাত্রীর খাতায় গিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে আসতে হয়।
শিক্ষক দম্পতি জানান, সমাজের বিত্তবান বা কোনো সংগঠন যদি পাশে দাঁড়ায় তাহলে আরও অনেক শিশুর সময় দেওয়ার সুযোগ হবে। পরিবেশগত উন্নয়ন করা গেলে আরও সুন্দরভাবে শিশুদের গড়ে তোলা সম্ভব।
মানবাধিকার সংস্থা ও এনজিও সৃষ্টি হিউম্যান রাইটস সোসাইটির চেয়ারম্যান আনোয়ার-ই-তাসলিমা বলেন, গারো পাহাড়ে একসময় আমাদের স্কুল ছিল। আর সেখানে প্রদীপ ম্রং ও লিপি নেংমিঞ্জা যে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছে, সেটি অত্যন্ত চমৎকার উদ্যোগ। আমরা তাদের পাশে থাকব। আর সারা দেশে বিভিন্ন জেলায়-উপজেলায় আমাদের বিনামূল্যে শিক্ষা কার্যক্রম ‘আলোর মিছিল স্কুল’ ছিল। পতিত সরকার আমাদের স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়। তবে এখন থেকে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অগ্রসর করতে ফের স্কুলগুলো ধারাবাহিকভাবে চালু করা হবে।