ডা. তানভীর আসিফা
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬ ১৩:২১ পিএম
আদরে থাকুক পোষ্য ছবিতে সাম্বা
আমাদের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে ঘরের পোষা প্রাণী বা পেট শুধু শখের জিনিস নয় বরং তারা আমাদের পরিবারের একেকজন অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে আমাদের দেশে পেট প্যারেন্টিং বা পোষা প্রাণী ঘরে রাখার প্রবণতা আরও বেড়ে গেছে। তবে একটি প্রাণীকে ঘরে আনা মানে শুধু শখ পূরণ নয় বরং তাদের সুস্থ সুন্দর জীবনযাপনের জন্য সঠিক যত্ন, থাকার পরিবেশ, খাবার এবং অসুস্থ হলে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করাও আমাদের বড় দায়িত্ব।
একজন পেট প্র্যাকটিশনার হিসেবে প্রতিদিন আমাকে অসংখ্য পেট অ্যানিমেল বা পোষা প্রাণীর চিকিৎসাসেবা, যত্ন ও পরিচর্যা এবং তাদের ওয়েলফেয়ারের জন্য পরামর্শ প্রদান করতে হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আজ বলব ওদের সঠিক খাবার, সাধারণ যত্ন এবং এই তীব্র গরমে ওদের সুরক্ষিত রাখার কিছু জরুরি উপায়।
কেমন হবে পোষ্যদের রোজকার খাবার
পোষা প্রাণীর সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি হলো তাদের সুষম খাদ্যতালিকা। মানুষ ও প্রাণীর মেটাবলিজম প্রসেস ভিন্ন। তাই আমরা যা খাই ওরাও তাই খাবে এই ধারণাটি ভুল এবং অনেক সময় মারাত্মক বিপজ্জনক।

বিড়ালের পুষ্টি
বিড়াল স্বভাবগতভাবেই শতভাগ মাংসাশী প্রাণী (Obligate Carnivore)। ওদের শরীরের জন্য টোরিন (Taurine) নামক অ্যামাইনো অ্যাসিড অত্যন্ত জরুরি, যা কেবল প্রাণিজ আমিষ থেকেই পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে তাদের ঘরে তৈরি খাবার দিতে চাইলে, হাড় ছাড়া মুরগির মাংস, কলিজা (মাঝে মাঝে), কাটা ছাড়া সিদ্ধ মাছ এবং সাথে মিষ্টিকুমড়া, গাজর, মিষ্টি আলু এই ধরনের কিছু সবজি সামান্য পরিমাণে দিতে পারেন, যা মোট খাবারের ৫-১০% হতে পারে। আবার ভালো ব্র্যান্ডের ড্রাই বা ওয়েট ফুডও দিতে পারেন এগুলোতেও ওদের পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখে।
কুকুরের পুষ্টি
কুকুর হলো সর্বভুক প্রাণী (Omnivores)। তাই তাদের খাবারে প্রোটিনের পাশাপাশি কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার রাখার প্রয়োজন। কুকুরের খাবারে হাড় ছাড়া মাংসের সাথে ভাত, সিদ্ধ সবজি যেমন গাজর, পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া ইত্যাদি দিতে হবে। শক্ত ও সুচালো হাড় না দেওয়াই ভালো। কারণ এগুলো অনেক সময় ওদের ওরাল ক্যাভিটিতে ইনজুরিসহ গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল পারফোরেশনের কারণ হতে পারে।
খরগোশ ও পাখির পুষ্টি
পাখিকে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বীজ জাতীয় খাবার দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে শুধু কাউন বা চীনা না দিয়ে বিভিন্ন ধরনের বীজের মিশ্রণ (seed mix) এবং এর সাথে প্রতিদিন কিছু পরিমাণে তাজা শাকসবজি দেওয়া ভালো। খরগোশের ডাইজেস্টিভ সিস্টেমকে ভালো রাখতে ৮০%-এর মতো কাঁচা ঘাস বা Timothy Hey প্রয়োজন হয়, পাশাপাশি এটি তাদের দাঁত অতিরিক্ত বড় হওয়াও (malocclusion) রোধ করতে সাহায্যে করে।
কোন খাবারগুলো পোষা প্রাণীকে খাওয়ানো যাবে না

অনেক সময় আমরা আমাদের প্রিয় পোষ্যটিকে আদর করে এমন কিছু খেতে দিই, যা তাদের জন্য মারাত্মক টক্সিসিটির কারণ হতে পারে। এজন্যই জেনে রাখা ভালো কোন খাবারগুলো কখনোই আপনার পোষ্যকে দেবেন না।
চকলেট, চা-কফি
এগুলো মানুষের জন্য রিফ্রেশিং হলেও এগুলোতে থাকা থিওব্রোমিন ও ক্যাফেইন পোষা প্রাণীর হার্ট ও নার্ভাস সিস্টেম বিকল করে দিতে পারে।
পেঁয়াজ ও রসুন
এগুলো লোহিত রক্ত কণিকা ধ্বংস করে অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা তৈরি করে।
আঙ্গুর ও কিশমিশ
কুকুরের জন্য খাবারগুলো মারাত্মক বিপজ্জনক। এগুলো কুকুরের একিউট কিডনি ফেইলিউর হওয়ার অন্যতম কারণ।
গরুর দুধ
প্রাপ্তবয়স্ক কুকুর বা বিড়ালের ল্যাক্টোজ হজম করার জন্য এনজাইম থাকে না। ফলে গরুর দুধ দিলে তীব্র ডায়রিয়া, বমি ও ডিহাইড্রেশন হয়।
সামগ্রিক যত্ন ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা

Prevention is better than cure- এই কথা মাথায় রেখে পোষা প্রাণীর যত্নে আমাদের কিছু অবশ্য পালনীয় নিয়ম মেনে চলতে হবে। যেমন- সময়মতো এবং সঠিক সময়ে টিকা প্রদান। বিশেষ করে মানুষ ও প্রাণী উভয়ের নিরাপত্তার জন্য জলাতঙ্ক বা Rabies ভ্যাকসিন অত্যন্ত জরুরি।
পোষা প্রাণীর জন্মের পর প্রাথমিক অবস্থায় প্রতি মাসে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে প্রতি ৩ মাস অন্তর একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী ডিওর্মিং করানো বাধ্যতামূলক। এর পাশাপাশি অন্যান্য বহিঃপরজীবী যেমন- Tick, Flea ইত্যাদি থাকলে তার চিকিৎসা করানোও জরুরি।
তীব্র দাবদাহে পোষা প্রাণীর যত্ন
আপনার অনুপস্থিতিতে ওদের নিরাপদ আশ্রয়
অনেক সময় বিশেষ প্রয়োজনে বা ঈদের ছুটিতে আমাদের পোষা প্রাণীকে রেখে বাইরে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য পেট বোর্ডিং বা ফস্টার হোমে রাখা যেতে পারে।
ঢাকায় এখন বেশকিছু পেশাদার ও বিশ্বস্ত ফস্টার হোম গড়ে উঠেছে যেমন- Furryghor Mirpur & Gulshan Brach, PawVilla Boarding, সুজির বাড়ি।
পরিশেষে একজন পেট প্র্যাকটিশনার হিসেবে পেট প্যারেন্টের প্রতি আহ্বান থাকবে, ওরা যেহেতু কথা বলতে পারে না। তাই ওদের নীরব চোখের ভাষা এবং আচরণ দেখে বুঝতে হবে তারা সুস্থ কি না।
অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন গ্রুপের অপেশাদার পরামর্শে নিজের ইচ্ছেমতো পোষা প্রাণীকে ওষুধ খাইয়ে দেয় অনেকেই। মনে রাখবেন, মানুষের সামান্য একটি প্যারাসিটামল বা নাপা ট্যাবলেটও বিড়ালের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই আপনার আদরের পোষ্যর যেকোনো সমস্যায় চেষ্টা করবেন একজন রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারিয়ানের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে। ভালো থাকুক সবার আদরের পোষা প্রাণীরা।
লেখক : ভেটেরিনারি সার্জন, প্রাণিকুল অ্যানিমেল ওয়েলনেস ক্লিনিক, ঢাকা