আফসানা মিমি
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৬ ১৩:০২ পিএম
ত্বকে এক্সফোলিয়েশন
সুস্থ, পরিষ্কার ও উজ্জ্বল ত্বক পেতে শুধু ফেসওয়াশ বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রতিদিনের ধুলাবালি, দূষণ, রোদ, ঘাম এবং বিভিন্ন প্রসাধনীর কারণে ত্বকের উপরিভাগে জমতে থাকে ময়লা ও মৃত কোষ। সময়মতো এসব মৃত কোষ পরিষ্কার না করলে ত্বক ধীরে ধীরে রুক্ষ, অনুজ্জ্বল ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। আর ত্বকের এই মৃত কোষ পরিষ্কার করার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় এক্সফোলিয়েশন।
আমাদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই নতুন কোষ তৈরি করে এবং পুরনো কোষ ঝরে যায়। কিন্তু বয়স বৃদ্ধি, দূষণ, অনিয়মিত জীবনযাপন, পর্যাপ্ত পানি না পান করা, অতিরিক্ত রোদে থাকা কিংবা ভুল স্কিনকেয়ার ব্যবহারের কারণে এই প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে। ফলে মৃত কোষ ত্বকের ওপর জমে থাকে এবং ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে যায়। এ কারণে নিয়মিত ও সঠিকভাবে এক্সফোলিয়েশন করা প্রয়োজন।
এক্সফোলিয়েশন মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে- ফিজিক্যাল ও কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েশন। ফিজিক্যাল এক্সফোলিয়েশনে স্ক্রাব, ব্রাশ বা দানাদার উপাদান ব্যবহার করে ত্বকের উপরিভাগের মৃত কোষ পরিষ্কার করা হয়। অনেকে ঘরোয়া উপায়ে চিনি, কফি, চালের গুঁড়া কিংবা ওটস ব্যবহার করে স্ক্রাব তৈরি করেন। অন্যদিকে কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েশনে বিভিন্ন ধরনের মৃদু অ্যাসিড যেমনÑ এএইচএ (AHA), বিএইচএ (BHA) বা পিএইচএ (PHA) ব্যবহার করা হয়, যা ত্বকের গভীরে জমে থাকা মৃত কোষ দূর করতে সাহায্য করে। তবে যেকোনো এক্সফোলিয়েশন করার আগে নিজের ত্বকের ধরন সম্পর্কে জানা জরুরি।
নিয়মিত এক্সফোলিয়েশনের সবচেয়ে বড় উপকার হলো ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পাওয়া। মৃত কোষ জমে থাকলে ত্বক অনেক সময় মলিন ও ক্লান্ত দেখায়। এক্সফোলিয়েশন সেই মৃত স্তর সরিয়ে নতুন ও সতেজ ত্বককে প্রকাশ করে। ফলে মুখে স্বাভাবিক গ্লো ফিরে আসে এবং ত্বক আরও প্রাণবন্ত দেখায়।
এ ছাড়া এক্সফোলিয়েশন ত্বকের রোমছিদ্র বা পোরস পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত তেল, ধুলাবালি ও মৃত কোষ জমে পোরস বন্ধ হয়ে গেলে ব্রণ, ব্ল্যাকহেডস ও হোয়াইটহেডসের সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে তৈলাক্ত ত্বকের মানুষের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি হয়। নিয়মিত এক্সফোলিয়েশন করলে পোরস পরিষ্কার থাকে এবং ব্রণের প্রবণতা অনেকটাই কমে যায়।
ত্বকের টেক্সচার উন্নত করতেও এক্সফোলিয়েশন কার্যকর ভূমিকা রাখে। অনেকের ত্বক অসমান, খসখসে বা রুক্ষ দেখায়। এক্সফোলিয়েশন ত্বকের মৃত স্তর সরিয়ে ত্বককে নরম, কোমল ও মসৃণ করে তোলে। একই সঙ্গে এটি ত্বকের ছোটখাটো দাগ, রোদে পোড়া ভাব এবং ব্রণের দাগ হালকা করতেও সাহায্য করে। নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে ত্বকের রঙেও সমতা আসে।
এক্সফোলিয়েশন ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত অন্যান্য পণ্যের কার্যকারিতাও বাড়ায়। অনেকেই সিরাম, ময়েশ্চারাইজার বা ফেসপ্যাক ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পান না। কারণ ত্বকে জমে থাকা মৃত কোষের স্তর অনেক সময় স্কিনকেয়ার পণ্যের কার্যকর উপাদানকে ত্বকের গভীরে পৌঁছাতে বাধা দেয়। এক্সফোলিয়েশনের মাধ্যমে সেই বাধা দূর হয় এবং ত্বক সহজেই প্রয়োজনীয় উপাদান শোষণ করতে পারে।
বয়সের ছাপ কমাতেও এক্সফোলিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের কোষ পুনর্গঠনের গতি কমে যায়। ফলে ত্বকে বলিরেখা, নিস্তেজ ভাব এবং ক্লান্তি সহজেই চোখে পড়ে। নিয়মিত ও পরিমিত এক্সফোলিয়েশন নতুন কোষ তৈরিতে সহায়তা করে এবং ত্বককে তুলনামূলক তরুণ ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
তবে অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অনেকেই দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় প্রতিদিন স্ক্রাব ব্যবহার করেন, যা ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষা স্তর নষ্ট করে দিতে পারে। এতে ত্বকে জ্বালাপোড়া, লালচে ভাব, র্যাশ কিংবা অতিরিক্ত শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত সপ্তাহে এক থেকে দুবার এক্সফোলিয়েশন করাই যথেষ্ট। সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
এক্সফোলিয়েশনের পর ত্বকের যত্ন নেওয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় ত্বক কিছুটা সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই এক্সফোলিয়েশনের পর ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। পাশাপাশি দিনের বেলায় অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে। কারণ এক্সফোলিয়েশনের পর সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি ত্বকে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্বকের ধরন বুঝে সঠিক উপায়ে এক্সফোলিয়েশন করলে এটি হতে পারে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ত্বকের অন্যতম চাবিকাঠি। তবে যাদের ত্বকে অতিরিক্ত ব্রণ, এলার্জি, ইনফেকশন বা অন্য কোনো জটিল সমস্যা রয়েছে, তাদের বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই এক্সফোলিয়েশন করা উচিত। মনে রাখতে হবে, সুন্দর ত্বক রাতারাতি পাওয়া যায় না। নিয়মিত যত্ন, সঠিক পদ্ধতি এবং ধৈর্যই পারে ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ, পরিষ্কার ও উজ্জ্বল রাখতে।