নারী পর্বতারোহণে নতুন ইতিহাস
মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে পর্বতারোহী নুরুননাহার নিম্নি ছবি: নিম্নি ও বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সৌজন্যে
পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট চূড়ায় লাল-সবুজের পতাকা ওড়ালেন পর্বতারোহী নুরুননাহার নিম্নি। দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশি কোনো নারী অভিযাত্রী এভারেস্ট জয় করলেন। অদম্য এই পর্বতারোহীকে নিয়ে লিখছেন গোলাম কিবরিয়া
পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন সূর্যের প্রথম আলো হিমালয়ের বরফঢাকা শৃঙ্গগুলোকে সোনালি রঙে রাঙিয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের নতুন একটি অধ্যায় লিখছিলেন বাংলাদেশের এক নারী। গত ২৭ মে, নেপাল সময় সকাল ৫টা ২৪ মিনিট। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখর মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় দাঁড়িয়ে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিলেন নুরুননাহার নিম্নি। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনিশ্চয়তা, প্রতিকূল আবহাওয়া আর অসীম ধৈর্যের এক অভিযাত্রার পর তিনি পৌঁছে গেলেন স্বপ্নের সেই উচ্চতায়।
বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণের ইতিহাসে এই সাফল্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরীনের এভারেস্ট জয়ের পর কেটে গেছে ১৪ বছর। সেই দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে আবারও বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে বাংলাদেশের একজন নারীর পদচিহ্ন আঁকলেন নিম্নি।

অপেক্ষার পর বিজয়ের সকাল
এভারেস্টে ওঠা কেবল শক্তি বা সাহসের পরীক্ষা নয়; এটি সময়, আবহাওয়া এবং মানসিক দৃঢ়তারও লড়াই। গত ১১ এপ্রিল ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশে যাত্রা করেন নিম্নি। কাঠমান্ডু থেকে লুকলা হয়ে পৌঁছান এভারেস্ট বেজক্যাম্পে। এরপর শুরু হয় উচ্চতাজনিত পরিবেশের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার কঠিন প্রক্রিয়া।
মে মাসের মাঝামাঝি সময়কে এভারেস্ট সামিটের সবচেয়ে উপযুক্ত সময় ধরা হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ১৭ মে বেজক্যাম্প ছেড়ে ওপরের ক্যাম্পগুলোর দিকে এগিয়ে যান তিনি। কিন্তু পর্বতের নিজস্ব নিয়ম আছে। ২২ মে ক্যাম্প-৪-এর উদ্দেশে রওনা হয়েও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাকে ফিরে আসতে হয়। কয়েক দিন ক্যাম্প-২-এ অপেক্ষা করতে হয় অনুকূল আবহাওয়ার জন্য।
এই অপেক্ষাই ছিল সবচেয়ে কঠিন। প্রতিদিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখা, ঝড়ের আশঙ্কা, অক্সিজেনের হিসাব, শরীরের সক্ষমতা- সবকিছু মিলিয়ে অনিশ্চয়তার এক সময় পার করতে হয়েছে তাকে। অবশেষে ২৫ মে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবার যাত্রা শুরু করেন। ২৬ মে পৌঁছান ক্যাম্প-৪-এ। সেখান থেকে রাতের অন্ধকারে শুরু হয় শেষ লড়াই। কয়েক ঘণ্টার টানা আরোহণের পর বিজয়ের মুহূর্ত আসে ২৭ মে ভোরে।

গল্পের শুরু যেখান থেকে
নুরুননাহার নিম্নির গল্প শুরু হয়েছিল কোনো পর্বতারোহণ কেন্দ্র থেকে নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষাসফর থেকে। রংপুরে বেড়ে ওঠা নিম্নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগে পড়াশোনা করেছেন। ২০০৬ সালে প্রথম বর্ষের ফিল্ডওয়ার্কে চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে গিয়ে পাহাড়ের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করেন। সেই আকর্ষণই ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভালোবাসায়।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে বান্দরবানের পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে। চাকরিজীবনে প্রবেশের পরও সেই টান কমেনি। ভুটান, ভারতের সিকিম এবং নেপালের বিভিন্ন ট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বুঝতে পারেন, পাহাড় কেবল তার শখ নয়, এটি তার জীবনের অংশ।
২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পে ট্রেকিং শেষে তার মনে জন্ম নেয় আরও উঁচুতে ওঠার স্বপ্ন। ২০২০ সালে এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক সেই স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। একই বছর যুক্ত হন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সঙ্গে। সেখান থেকেই শুরু হয় পেশাদার পর্বতারোহী হিসেবে তার নতুন পথচলা।

ব্যাংকারের ডেস্ক থেকে মৃত্যুঝুঁকির অভিযানে
পেশাগত পরিচয়ে নুরুননাহার নিম্নি একজন ব্যাংকার। পূবালী ব্যাংক পিএলসির জেনারেল ব্যাংকিং বিভাগে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে কর্মরত তিনি। সপ্তাহের কর্মদিবসে ব্যাংকের দায়িত্ব পালন আর ছুটির দিনে পাহাড়ের স্বপ্নÑ দুটি ভিন্ন জগতকে সমান দক্ষতায় সামলেছেন তিনি। এবারের এভারেস্ট অভিযানের স্পনসরও ছিল তার কর্মস্থল। ফলে এটি শুধু একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়; করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা ও ব্যক্তিগত স্বপ্নের সফল সমন্বয়েরও একটি উদাহরণ।

বাংলাদেশের এভারেস্ট অভিযাত্রার নতুন অধ্যায়
১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের হাত ধরে এভারেস্ট জয়ের যে ইতিহাস শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশ সেই ইতিহাসে নিজের নাম লেখায় ২০১০ সালে। মুসা ইব্রাহীমের সাফল্যের পর একে একে এমএ মুহিত, নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীন, সজল খালেদ, বাবর আলী ও ইকরামুল হাসান শাকিল দেশের পতাকা উড়িয়েছেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে।
সেই তালিকায় এবার যুক্ত হলো নুরুননাহার নিম্নির নাম। তবে তার অর্জনের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। তিনি শুধু এভারেস্ট জয় করেননি; দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নারী পর্বতারোহণে যে নীরবতা ছিল, তাতেও নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
স্বপ্ন দেখার সাহস
এভারেস্টে ওঠা মানে কেবল ৮,৮৪৮ মিটার উচ্চতায় পৌঁছানো নয়। এটি নিজের সীমাকে অতিক্রম করার গল্প। একজন তরুণী, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ডওয়ার্কে গিয়ে প্রথম পাহাড়ের প্রেমে পড়েছিলেন, তিনিই একদিন পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে দেশের পতাকা উড়িয়েছেন। নুরুননাহার নিম্নির এই সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বার্তা রেখে গেল- স্বপ্ন যদি যথেষ্ট বড় হয়, তবে পথ যত দুর্গমই হোক, শিখর একদিন ধরা দেয়। এভারেস্টের বরফঢাকা চূড়ায় তার সেই পদচিহ্ন শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের স্মারক নয়; এটি বাংলাদেশের নারী শক্তি, সাহস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তিরও এক উজ্জ্বল প্রতীক।
ছবি: নিম্নি ও বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবের সৌজন্যে