× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অযোধ্যার শেষ প্রান্তে

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬ ১০:৫৩ এএম

আমাদের দেশেও যে অযোধ্যা নামক একটি অঞ্চল রয়েছে তা অনেকের কাছেই অজানা

আমাদের দেশেও যে অযোধ্যা নামক একটি অঞ্চল রয়েছে তা অনেকের কাছেই অজানা

অযোধ্যা, এই নামটির সঙ্গে দেশের মানুষের পরিচিতি ভারতের বাবরি মসজিদের সুবাদে। অথচ আমাদের দেশেও যে অযোধ্যা নামক একটি অঞ্চল রয়েছে। যা এক নৈসর্গিক প্রকৃতির ভান্ডার। আশ্চর্য ব্যাপার সেটা গুগল ম্যাপে নেই। তবু আমরা খুঁজে খুঁজে বের করব দেশের ভেতর থাকা অচেনা-অজানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

সেই ভাবনা থেকেই ছুটে যাই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য লাগোয়া খাগড়াছড়ি জেলার তবলছড়ি। সারা রাত বাস জার্নি করে সকালে নেমে পড়ি ডাকবাংলো। সেখান থেকে যামিনীপাড়া গ্রামের পথে হাঁটি। সকালের সোনামাখা রোদে, পাহাড়ি গ্রামীণ পথ, গাছের পাতার ফাঁক গলে সূর্যের কিরণ, অচেনা পাখির কলতান- সব মিলিয়ে অসাধারণ বিশ/বাইশ মিনিট হেঁটে পরিপাটি এক মাটির ঘরের সামনে হাজির। পূর্ব পরিচিত শাহজাহানের সুবাদে আজকের রাতটা এখানেই কাটবে। তাই সঙ্গে থাকা ট্রাভেল ব্যাগগুলো ঘরের ভেতর গুছিয়ে রেখেই বড় খুমের পথে বেরিয়ে পড়ি। চৈতালী রোদে ইটের সলিংয়ের ওপর ঘণ্টাখানেক হেঁটে, টিপরা পল্লীর বড়পাড়া পৌঁছি। পাহাড়িদের জুমচাষের তরমুজ খেয়ে তৃষ্ণা মিটাই। এরপর তরতর করে সেগুন বনে ঢুকে পড়ি। ঢুকেই দেখি বিশাল অরণ্য।

দুর্গম পথ পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অভিযাত্রীরা

বৃক্ষরাজির মগডালে তাকালে, হৃদয়ে অদ্ভুত শিহরন জাগে। শিহরিত মন নিয়েই শুরু মূল হাইকিং-ট্র্যাকিং। কমবেশি প্রত্যেকের হাতে, কাঁধে ও মাথায় হাঁড়ি-পাতিলসমেত বাজার সদাই। দেখি কার শরীরে কত তেল আছে। হাঁটার সময় ঝরাপাতার মরমর শব্দ। পাতার স্তূপ জমে কোথাও কোথাও দুই-তিন ফিট উঁচু। সে এক ভিন্ন রকম অনুভূতি। সেগুনপাতা মাড়িয়ে যেতে যেতে পা পড়ল ঝিরির জলে। তারই মাঝ বরাবর ছোট-বড় পাথুরে সারি। নয়নাভিরাম ঝিরিপথ। দুপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। সেই পাহাড়ে পাতাবিহীন দিগন্তছোঁয়া শতসহস্র সেগুন বৃক্ষ। চোখেমুখে ঝিরির শীতল পানির ঝাপটা দিতেই ক্লান্তি উবে যায়। সামনেই খাড়া পাহাড়। আবার ট্র্যাকিং শুরু। প্রায় ঘণ্টা দুই হাইকিং-ট্র্যাকিং শেষে দেখা মিলে বড় খুম ঝরনার। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। চৈত্রের প্রচণ্ড খরার মাঝেও বড় খুম ঝরনার পানি প্রবহমান। রিমঝিম শব্দ তুলে অবিরাম ধারায়, ঝরনার পানি ছুটে চলে তার আপন গতিতে। পানি পড়তে পড়তে ঝরনার সামনে বিশালাকার বেসিনের মতো সৃষ্টি হয়েছে। সেই কারণেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ত্রিপুরা অধিবাসীরা এটাকে বড় খুম বলে। সকাল গড়িয়ে ভরদুপুর। যাই এবার গলাচিপা খুম।

পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেয়ে-দেয়ে এবার ছুটে চলা গলাচিপা খুমের পথে। পথ চলতে চলতে সূর্যটা কিঞ্চিৎ হেলে পড়েছে। তাই আরেকটু গতি বাড়িয়ে পা চলল। অবশেষে গলাচিপা খুমের প্রান্তরে। এই জীবনে বহু খুম দেখেছি। কিন্তু গলাচিপার আকৃতিটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকটা ইংরেজি ‘এস’-এর মতো। দেখতে যেমনি নান্দনিক, তেমনি ভয়ানক আকৃতি ধারণ করে আছে। গলাচিপার ওপর দিকে টানতে থাকলাম। কিন্তু পার হতে হবে বেশ কণ্টকাকীর্ণ পথ। সামান্য ভুল হলেই সোজা খুমের গহ্বরে। আদতে পাহাড় ভ্রমণে এ রকম সংকুল পরিবেশ পরিস্থিতির মুখোমুখি না হলে মনের মাঝে একটা উত্তেজনাপূর্ণ ভাব আসে না। এ রকম পরিস্থিতিই পাহাড়প্রেমীদের জন্য রোমঞ্চকর অনুভূতির জন্ম দেয়। পায়ের চাপে পাতা সরলেই দেখা যায় তলা ফাঁকা। সরু পথ। ধরার মতো তেমন শক্ত শেকড়-বাকড় নেই। তিন-চার ইঞ্চি পা এদিক-ওদিক হলেই গলাচিপার পেটে। প্রকৃতিই সাক্ষ্য দিচ্ছে এখনও সাধারণ পর্যটকদের, আগমন ঘটেনি গলাচিপা খুমের আপার স্ট্রিমে। লোভ সামলাতে না পেরে, ঝিরির শীতল পানিতে জলকেলিতে মেতে উঠি। আহ দেহ, মন ও চোখের প্রশান্তি। পাহাড়ে সন্ধ্যা নামে আগে, টনক নড়তেই চটজলদি ফিরতি পথ ধরি।

তবে সেটা ভিন্ন পথে। যা আরও রোমাঞ্চকর। কিছুটা সময় হাইকিং করেই মন্ত্রমুগ্ধ ঝিরির বাঁকে এসে, ট্র্যাকিং করে সোজা এক খাড়া পাহাড়েরর ওপর উঠে পড়ি। আনুমানিক হাজার-বারোশ ফিট উচ্চতা হবে। টর্চের আলোয় পাথুরে ঝিরিতে হাঁটি। ফিরতি পথে পাহাড়টার চূড়ায় না উঠলে হয়তো অচেনা-অজানা ঝিরিপথটার সৌন্দর্যই অদেখাই রয়ে যেত। রাতে যামিনীপাড়া ফিরেই পরের দিনের ভ্রমণসূচির প্রস্তুতি। বাঁকা চাঁদের মিঠা জোসনায় গভীর রাত অবধি ভরপুর আড্ডা মেরে, ঘুমের বাড়ি সবাই পাড়ি দিই। এক ঘুমেই মিষ্টি সকাল। নাশতা সারতে সারতেই মাহেন্দ্র এসে হাজির। গন্তব্য অযোধ্যা। তবে তার আগেই যাচ্ছি ঝরনা টিলা। উঁচু-নিচু ঢালু সড়ক পেরিয়ে খুব অল্প সময়ের মাঝেই পৌঁছে যাই গৌরাঙ্গপাড়া। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করি ঝরনাটিলা। এটি একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিচালিত পাহাড়চূড়া। যাই এবার নৈসর্গিক জনপদ পুরাতন তবলছড়ি। যেতে যেতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড়ের সারি দেখি। গাড়ি ব্রেক কষতেই দেখি সীমান্ত পিলার। শুধুমাত্র একটি সীমানা পিলার মানচিত্র ভাগ করে দিয়েছে। কিন্তু মন, সেটা ভাগ করার সাধ্য কার? তাই ত্রিপুরা রাজ্যে বিজিবি হাঁকডাক না দেওয়া পর্যন্ত হেঁটে বেড়াই। সীমান্ত প্রহরীকে সামান্য কৈফিয়ত দিয়েই সটকে পড়ি। 

পাহাড় থেকে সূর্যাস্তর সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অনন্য

গাড়ি স্টার্ট। ছুটলাম এবার অযোধ্যা। মাঝে রামশিরা এলাকায় ব্রেক দিয়ে বুড়ির টিলা বসে কলাপাতায় দুপুরের আহার সারলাম। যেতে যেতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ অযোধ্যা বিওপি পিলারের কাছে ব্রেক। অসাধারণ পরিবেশ। নয়নাভিরাম প্রকৃতির ভান্ডার। যতদূর চোখ যায় শুধু অবারিত প্রকৃতি। পাশেই পাহাড়ের ওপর গাছগাছালি ঘেরা অযোধ্যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। অযোধ্যা গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হতেই হবে। অথচ ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এখনও প্রকৃতির নিসর্গ অযোধ্যা গ্রামটি রয়েছে অচেনা। 

যাই এবার সদ্য নির্মীত অযোধ্যা সীমান্ত সড়কে। ঢুকে যাই, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০ ইসিবি কর্তৃক নির্মীত অযোধ্যা সীমান্ত সড়কে। প্রকৃতি, প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে যতদূর সম্ভব উঁচু উঁচু পাহাড় কেটে পিচঢালা সড়ক নির্মাণ করেছে। সীমান্ত সড়কটির একপাশে সিনা টান করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, জগদ্দল পাথরের মতো আমাদের পাহাড়। আরেক পাশে পাহাড়ের পাদদেশে সীমানা ভাগ করে দেওয়া ফেনী নদী। মায়াবী পথটির কোথাও কোথাও এতটাই উঁচু আর ঢালু যেন মাহেন্দ্র গাড়িতে নয়, রোলার কোস্টারেই বসেছিলাম। অযোধ্যা সীমান্ত সড়কটি পাড়ি দিতে দিতে পশ্চিমাকাশে সূর্যটা তেজ হারিয়ে নয়া বউয়ের মতো লাল টুকটুকে রূপ ধারণ করল। সেই রূপের ঝলক বর্ণনাতীত; যা শুধু দুই নয়নে দেখেই অনুভব করা যায়। এমনিতেই পাহাড় থেকে সূর্যাস্তর সৌন্দর্য হয়ে ওঠে অনন্য। পাহাড়ি সড়কে পথচলার একরাশ মুগ্ধতার রেশ কাটতে না কাটতেই অযোধ্যা সীমান্ত সড়কের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাই। 

ছবি : লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা