ডা. চয়ন সিংহ
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৬ ১৭:৩১ পিএম
অতিরিক্ত নয়, মাংস খান বুঝেশুনে
ঈদুল আজহা আমাদের ত্যাগ, ভালোবাসা ও মানবিকতার উৎসব। কিন্তু বাস্তবতা হলোÑ এই আনন্দের সময়টিতে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে এমন এক পরিবর্তন আসে যা অনেক সময় শরীরের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। কোরবানির মাংস ঘিরে কয়েক দিন ধরে চলে এক ধরনের অতিরিক্ততার উৎসব। সকালবেলার ভুনা, দুপুরের ঝোল, রাতের কালাভুনার মাঝখানে কাবাব, নেহারি, তেহারি, বারবিকিউ। প্রতিটি খাবারের কেন্দ্রবিন্দুতে যেন শুধু মাংসই।
স্বাদে অতুলনীয় হলেও অতিরিক্ত গরুর মাংস শরীরের জন্য হতে পারে এক নীরব হুমকি। বিশেষ করে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও কিডনি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য ঈদের এই অতিভোজন অনেক সময় বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গরুর মাংসে উচ্চমাত্রার স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরল থাকে। অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা LDL বেড়ে যায়, যা ধীরে ধীরে রক্তনালির ভেতরে চর্বির স্তর তৈরি করে। এ সময় রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, বাড়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঈদের পরবর্তী কয়েক দিনে বুকব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে রোগীর চাপ অনেক সময় বেড়ে যায়। কারণ হঠাৎ অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও ভারী খাবার শরীরকে বড় বিপাকে ফেলে। অতিরিক্ত মাংস কেবল হার্ট নয়, কিডনির ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। গরুর মাংসে থাকা অতিরিক্ত প্রোটিন ভাঙতে কিডনিকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। যাদের আগে থেকেই কিডনি সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য এটি মারাত্মক হতে পারে। একইভাবে যাদের ইউরিক অ্যাসিড বেশি বা গাউটের সমস্যা রয়েছে তারা অতিরিক্ত মাংস খেলে হঠাৎ জয়েন্টে ব্যথা ও ফোলাভাবের শিকার হতে পারেন।
হরমোনজনিত সমস্যাও ঈদের অন্যতম সাধারণ বাস্তবতা
অতিরিক্ত তেল-মসলা, ভাজাপোড়া ও একসঙ্গে অনেক ধরনের মাংস খাওয়ার কারণে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, অ্যাসিডিটি, পেট ফাঁপা কিংবা ডায়রিয়া পর্যন্ত হতে পারে। আবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা মাংস থেকে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও কম নয়।
ডায়বেটিক রোগীদের জন্য অতিরিক্ত গরুর মাংস আরও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত ফ্যাট শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত লবণ ও মসলা উচ্চ রক্তচাপকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা জরুরি। শিশুদের পরিপাকতন্ত্র অনেক সময় অতিরিক্ত মাংস সহ্য করতে পারে না। অন্যদিকে বয়স্কদের হৃদযন্ত্র, কিডনি ও হজমতন্ত্রের সক্ষমতা তুলনামূলক কম থাকায় অতিরিক্ত মাংস তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তাহলে কি ঈদে মাংস খাওয়া বন্ধ করতে হবে? মোটেও না, বরং প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিমিতিবোধ। ঈদের আনন্দ যেন অসুস্থতার কারণ না হয়, সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কিছু সহজ অভ্যাস আমাদের এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। একবারে অতিরিক্ত না খেয়ে অল্প পরিমাণে খান। চর্বিযুক্ত অংশ এড়িয়ে চলুন। প্রতিদিন শুধু মাংস না খেয়ে সঙ্গে রাখুন শাকসবজি, সালাদ ও ফলমূল। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। কোমল পানীয়ের পরিবর্তে বেছে নিন লেবুর শরবত বা সাধারণ পানি। আর যাদের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি সমস্যা রয়েছে, তারা অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করবেন।
মনে রাখতে হবে, ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু খাবারের বাহার নয়, বরং সুস্থ শরীরে প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। কয়েক মুহূর্তের অতিরিক্ত খাদ্যের জন্য যদি দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ডেকে আনি, তবে সেই আনন্দের মূল্য অনেক বেশি হয়ে যায়।
তাই এবারের ঈদে বার্তাটি হোক সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ-গরুর মাংস হোক পরিমিত, ঈদের আনন্দ হোক সুস্থ ও নিরাপদ।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়